জাপানিজ কোবে বিফ সবচেয়ে দামী গরুর গোশত
পৃথিবীর সবচেয়ে দামী গরুর গোশত হচ্ছে জাপানিজ কোবে বিফ। এক পাউন্ডের দাম ৩৫০-৫০০ ডলার, মানে গড়ে কেজি প্রায় ৯০০ ডলার/৭৫ হাজার টাকা।
খাবারের জগতে আভিজাত্যের এক অনন্য উদাহরণ এই কোবে বিফ। বিশ্বজুড়ে ভোজনরসিকদের কাছে এটি যেন স্বপ্নের খাবার। জাপানে উৎপাদিত এই বিশেষ গরুর মাংসের প্রতি কেজির দাম বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২৪ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। তবে শুধু দাম নয়, এর উৎপাদন পদ্ধতি এবং কঠোর আইনি নিয়ন্ত্রণও মানুষকে বিস্মিত করে।
.png)
কোবে বিফ নিয়ে অনেক মুখরোচক গল্প প্রচলিত আছে। যেমন- গরুকে বিয়ার খাওয়ানো হয় বা ক্লাসিক্যাল মিউজিক শোনানো হয়। আধুনিক খামারিরা বলছেন, বিষয়টি সবসময় বাধ্যতামূলক নয়। তবে গরুর ক্ষুধা বাড়ানোর জন্য বা হজমে সহায়তার জন্য কখনও কখনও বিয়ার দেওয়া হয়। আর শীতকালে রক্ত সঞ্চালন ঠিক রাখতে বিশেষ ব্রাশ দিয়ে ম্যাসাজ করা হয়, যাতে মাংসের মার্বলিং ঠিকভাবে তৈরি হয়।

কোবে বিফ হলো জাপানের অন্যতম ওয়াগিউ বিফের একটি সুপরিচিত ধরন। অন্য মাংসের চেয়ে এ মাংসের দাম অনেক বেশি। উৎপাদনগত কারণেই এ মাংসের এত দাম।
এসব গরুর আলাদাভাবে যত্ন নেওয়া হয় এবং আপেল ও অন্যান্য ফল দিয়ে তৈরি উচ্চমানের খাবার খাওয়ানো হয়। এমনকি বিয়ারও খাওয়ানো হয়। এদের জন্য চিকিৎসাব্যবস্থাও খুব উন্নত। এদের মাংসও বেশ নরম। এসব কারণে এ গরুর মাংস স্বাদ ও গন্ধে অতুলনীয়।
দামি গরুর মাংসের আরেকটি হলো জাপানের মাতসুসাকা বিফ। দেশটির মাতসুসাকা অঞ্চলে এ জাতের গরু দেখা যায়। এটি মূলত কুমারী স্ত্রী গরুর মাংস। এ মাংসগুলোও বেশ নরম হয়ে থাকে। স্বাদেও অনন্য। উচ্চ চর্বিযুক্ত হওয়ায় খুব সহজেই এ মাংস গলে যায়।
কোবে বিফের দিকে তাকালে দেখা যায় লাল মাংসের ভেতরে সাদা চর্বির সূক্ষ্ম জালের মতো রেখা। একে বলা হয় মার্বেলিং। সাধারণ গরুর মাংসে চর্বি থাকে আলাদা স্তরে, কিন্তু কোবে বিফে চর্বি মাংসের কোষের ভেতরেই মিশে থাকে।
এই চর্বির গলনাঙ্ক মানুষের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়েও কম। ফলে মুখে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মাংসটি মাখনের মতো গলে যেতে শুরু করে। এটিই কোবে বিফের প্রধান বিশেষত্ব, যার কারণে একে বলা হয় মেল্টিং ইন মাউথ বা মুখে গলে যাওয়া অভিজ্ঞতা।

কোবে বিফের এত দাম কেন?
কারন জাপানিরা তাদের গরুগুলিকে খুব যত্ন নিয়ে পালে, যেন গোশতগুলো ধীরে ধীরে শক্ত হয়, গরুর পেশীগুলো পাল্লায় পাল্লায় জমে ওঠে। এই গরুগুলোকে বেশিরভাগ সময় ঘাস খাওয়ানো হয় জীবনের শুরুর দিকে।
তখন এদের শরীরে তেমন মেদ থাকে না। জবাই করার কয়েক মাস আগে থেকে শুরু হয় গরুকে ভুট্টা, গম ও সয়াবিন খাওয়ানো। গম, ভুট্টা ও সয়াবিন খেলে ধীরে ধীরে গরুর লিভার ফ্যাট তৈরি করা বাড়িয়ে দেয় এবং ফ্যাটগুলোকে প্রথমে চামড়ার নিচে এবং তারপর মাংসের মধ্যে জমাতে শুরু করে। মাংসের মধ্যে এই যে সাদা সাদা ফ্যাটের লেয়ার দেখছেন, এগুলিকে বলে মার্বেলিং।
গরু যারা পালে তারা ভাল করেই জানে, গম-ভুট্টা আর সয়াবিনের পরিমান খাবারে বাড়িয়ে দিলে মাসলের মধ্যে ফ্যাট জমতে শুরু করে। তারপর যখন এই বিফ দিয়ে স্টেক বানানো হয়, এদের জমাট গোশতগুলো ভেতরে থাকা ফ্যাট থেকে তৈরি হওয়া বাড়তি উত্তাপে গলে নরম নরম হয়ে যায়, আর খাওয়ার সময় গোশতের মাঝখানে থাকা চর্বি গোশতটাকে পিচ্ছিল করে মুখটা রসে ভরিয়ে দেয়...আহ!!!!

শুধু জাপানেই কেন আসল কোবে বিফ পাওয়া যায়?
কোবে বিফ বলতে যে কোনো গরুর মাংসকে বোঝায় না। এর মান ও স্বকীয়তা বজায় রাখতে জাপানে রয়েছে অত্যন্ত কঠোর আইন। এই বিশেষ মাংস শুধু জাপানের হিয়োগো (Hyogo) অঞ্চলে উৎপাদিত গরু থেকেই সংগ্রহ করা যায়। জাপানের বাইরে অন্য কোথাও এই মাংস উৎপাদন আইনত অনুমোদিত নয়। এমনকি কোবে নামটির স্বত্বও জাপানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
তবে আমেরিকাতেও কোবে বিফের আদলে এক ধরনের মাংস পাওয়া যায়, যাকে বলা হয় আমেরিকান ওয়াগ্যু। ১৯৭৬ সালে জাপান থেকে তাজিমা জাতের চারটি গরু আমেরিকায় নেওয়া হয়েছিল।
পরে সেই গরুগুলোর বংশধর থেকেই সেখানে বিশেষ পদ্ধতিতে এই মাংস উৎপাদন শুরু হয়। জাপানের আসল কোবে বিফের তুলনায় এর দাম কিছুটা কম। সাধারণত প্রতি কেজির দাম প্রায় ২০০ ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১৬ হাজার টাকার কাছাকাছি।