ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা রতন। চোখে-মুখে ক্লান্তি। নিজের নাম সম্পর্কিত ভুলটি সংশোধনের জন্য দুইদিন ধরে ঘুরছেন আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসে। কিন্তু কিছুতেই মিলছে না সমাধান। শুধু রতনই নন, তার মতো এমন অনেক মানুষই প্রতিদিন পাসপোর্ট সংক্রান্ত নানা কাজে এখানে আসেন। নিয়ম করে সারিবদ্ধভাবে লাইনে দাঁড়ান। নির্ধারিত ফরম জমা দেন। এসব নিয়ম অনুসরণ করতে গিয়েও অনেকে নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হন। আবার কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সময়মতো ঐসব সমস্যার সমাধান করাও অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। দালাল চক্র মূলত এ সুযোগটিই নেয়। গ্রাহকরা নিয়ম মেনে কর্মকর্তাদের মাধ্যমে যে কাজটি করাতে ব্যর্থ হন, সেই কাজটি গ্যারান্টিসহ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় ঐ চক্রের সদস্যরা। তারা পাসপোর্ট অফিসেও বেশ ক্ষমতাধর। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এ ধরনের সমস্যা সমাধানে তারা নানা উদ্যোগ নিয়েছেন।
রাজধানীবাসীকে নির্বিঘ্নে পাসপোর্ট সেবা দিতে ১০ বছর মেয়াদি মেগা প্রকল্পের মধ্যে ২০১৮ সালে চালু হয় ই-পাসপোর্ট প্রকল্প। এ প্রকল্পের মাধ্যমেই পাসপোর্ট অধিদফতরসহ পাঁচটি আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে সেবা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সেবা কার্যক্রম আরো সহজ করতে চালু হয়েছে কল সেন্টার। তবুও জনমানুষের পিছু হটেনি নানা ধরনের হয়রানিসহ দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য। যদিও এসব অফিসে কিছুটা জনবল সংকটও রয়েছে। সবমিলে পাসপোর্ট সেবাগ্রহীতারা স্বস্তির চেয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন বেশি। আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসসহ রাজধানীর আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোতেও এসব সমস্যা বিরাজমান। গত তিন রাজধানীর একাধিক পাসপোর্ট অফিস ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
.png)
২০১৮ সালে চালু হয় ই-পাসপোর্ট প্রকল্প। পাসপোর্ট সেবা কার্যক্রম আরো সহজ করতে চালু হয়েছে কল সেন্টার। তবুও জনমানুষের পিছু হটেনি নানা ধরনের হয়রানিসহ দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য। যদিও এসব অফিসে কিছুটা জনবল সংকটও রয়েছে। সবমিলে পাসপোর্ট সেবাগ্রহীতারা স্বস্তির চেয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন বেশি।
নিয়মমতো কাজ হয় না, টাকা দিলে দালালরা সব করে দেয়:
গত ১৩ ফেব্রুয়ারি সরেজমিন দেখা গেছে, আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসে দালালের আনাগোনা। সুযোগ বুঝে সরব হন তারা। যাদের পাসপোর্টে বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে, সেসব সমাধান করতে গিয়েই তারা দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে যান। ভুক্তভোগীরা বলছেন, নিয়মতান্ত্রিকভাবে এখানে কাজ করা কঠিন। সব কাগজপত্র ও ফি ঠিকমতো জমা দিলেও দিনের পর দিন ঘুরতে হয়। কাজ হয় না। কিন্তু দালালদের বাড়তি কিছু টাকা দিলে সব কঠিন সহজ হয়ে যায়।
ঘটনা-১:
গত ১৩ ফেব্রুয়ারি দিনভর পাসপোর্টে দেখা গেছে, যথারীথি দায়িত্ব পালন করছেন পুলিশ সদস্যরা। মূল ফটকের বাইরে কিছু লোক ঘোরাঘুরি করছেন। মূল ভবনে কাউকে ঢুকতে দেখলেই তাদের সঙ্গে কথা বলে নানা বিষয়ে জানতে চাইছেন তারা। পরিচয় গোপন করে কথা হয় আকবর, রহিম, মারুফসহ বেশ কয়েকজন দালালের সঙ্গে।
পাসপোর্টে নাম সম্পর্কিত সংশোধন করে দিতে পারবেন কিনা? এমন প্রশ্নে মারুফ জানান, নিয়ম মেনে এ কাজ করতে হলে আপনাকে দিনের পর দিন ঘুরতে হবে। আর আমরা অল্প দিনেই কাজটি করে দিতে পারব। সেক্ষেত্রে আপনাকে ১০ হাজার টাকা খরচ করতে হবে। কিন্তু পরবর্তীতে যোগাযোগের জন্য মোবাইল নম্বর চাইলে তিনি দিতে নারাজ হন। মেন রোডের ওপারের একটি খাবারের হোটেল দেখিয়ে বলেন, ওখানে গেলেই আমার খোঁজ পাবেন। মারুফের সঙ্গে এ পর্যন্ত কথা শেষ হয়। পরে পাসপোর্ট অফিসের ভেতরে ঢুকতেই সিঁড়ির সামনে পরিচয় হয় ভুক্তভোগী ইমনের সঙ্গে।
নিয়মতান্ত্রিকভাবে এখানে কাজ করা কঠিন। সব কাগজপত্র ও ফি ঠিকমতো জমা দিলেও দিনের পর দিন ঘুরতে হয়। কাজ হয় না। কিন্তু দালালদের বাড়তি কিছু টাকা দিলে সব কঠিন সহজ হয়ে যায়।
ইমন জানান, পাসপোর্টে তার যে নাম, জাতীয় পরিচয়পত্রে তা একটু ভিন্ন। পাসপোর্ট অফিসে নামটি সংশোধন করতে এসেছি। এ নিয়ে ১০৩ নম্বর কাউন্টারে কথা বলে হতাশ হন তিনি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাকে বলেন, স্থায়ী ঠিকানা লক্ষ্মীপুর হওয়ায় কাজটি এখানে হবে না। এভাবে এ অফিস ও অফিস ঘুরতে ঘুরতে আগারগাঁও অফিসে পরিচয় হয় দালাল মান্নানের সঙ্গে। ৫ হাজার টাকায় চুক্তিও হয়। এবার কোনো ঝামেলা ছাড়াই তাকে সঙ্গে নিয়ে ১০৩ নম্বর কাউন্টারে ফরম জমা দেন মান্নান। ফরমে আবেদিত লেখা সিল দিয়ে পাঠানো হয় তৃতীয় তলার ৩০৫ নম্বর কাউন্টারে। অবশেষে রিসিভ কপিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার স্বাক্ষরে ভোগান্তি থেকে মুক্তি মেলে।
ঘটনা-২:
আরেক ভুক্তভোগী উজ্জ্বল জানান, ঝামেলা এড়াতে এই অফিসেরই একজনের সঙ্গে ১৫ হাজার টাকায় মৌখিক চুক্তি হয়। পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ছাড়াই এক সপ্তাহের মধ্যে পাসপোর্ট করিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। সে হিসেবে আজই (১৩ ফেব্রুয়ারি) পাসপোর্ট দেওয়ার কথা। কিন্তু এখন সে বলছে, ফাইলই খুঁজে পাচ্ছে না। কোনো কূলকিনারা না পেয়ে তিনি ছুটে যান পরিচালকের রুমে। কথা বলা ব্যক্তির রেফারেন্সে গেলে সঙ্গে সঙ্গেই ফাইল খুঁজে পান কর্মকর্তা। কিন্তু তাতেও কাজ হলো না, চেপে বসে নতুন ভূত। ঐ কর্মকর্তা বলেন, পুলিশ ভেরিফিকেশনের জন্য পরে আসেন। অথচ মৌখিক চুক্তির সময় পুলিশ ভেরিফিকেশনের কোনো কথা ছিল না।
সরেজমিন দেখা যায়, পাসপোর্ট অধিদফতরের আঞ্চলিক অফিসের পরিসর বেড়েছে। বাড়তি চাপও পড়ছে কর্মকর্তাদের ওপর। তবে অধিদফতর দায়ী করছে জনবল সংকটকে। আর জনবল সংকটের কারণে কাজে গতি কমে গেছে। ফলে সেবাগ্রহীতারা পড়ছেন ভোগান্তিতে।
পাসপোর্ট অধিদফতরের আঞ্চলিক অফিসের পরিসর বেড়েছে। বাড়তি চাপও পড়ছে কর্মকর্তাদের ওপর। তবে অধিদফতর দায়ী করছে জনবল সংকটকে। আর জনবল সংকটের কারণে কাজে গতি কমে গেছে। ফলে সেবাগ্রহীতারা পড়ছেন ভোগান্তিতে।

ঘটনা-৩:
গত ১২ ফেব্রুয়ারি কেরাণীগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে সুসমিত সাহা নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আজই তার দুই ভাগনের পাসপোর্ট পাওয়ার কথা। আনোয়ার নামে এক আনসার সদস্যর সঙ্গে ১৫ হাজার টাকায় চুক্তি হয়। দুই ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকায় পর অফিসের পাসপোর্ট বিতরণ শাখা থেকে তাকে বলা হয়, পাসপোর্ট এখনো তৈরি হয়নি।
কুমিল্লার জাহিদ। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত একটি কলেজে ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা করেন। এক মাসের মধ্যে পাসপোর্ট করিয়ে দেওয়ার কথা বলে পাসপোর্ট অফিসের জামান নামে এক দালাল তার কাছ থেকে ৮ হাজার টাকা নেন। ১৫ দিন আগে তার পাসপোর্ট দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখনো তিনি পাসপোর্ট পাননি।
অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, কেরাণীগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে আনসার সদস্য আনোয়ারের মতো আরো শক্তিশালী দালাল চক্র রয়েছে। যারা সুসমিতের মতো অনেক ভুক্তভোগীর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করছে।
সুসমিত আর জাহিদের মতো পাসপোর্ট নিতে আসা আরো অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুধু দালাল চক্রই নয়, ভেরিফিকেশনের দায়িত্বে থাকা প্রত্যেক পুলিশ সদস্যকেও ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা করে দিতে হয়।
শুধু দালাল চক্রই নয়, ভেরিফিকেশনের দায়িত্বে থাকা প্রত্যেক পুলিশ সদস্যকেও ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা করে দিতে হয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ থেকে জানা যায়, আনসার সদস্য আনোয়ার, হামিদসহ আরো চারজন এই অফিসে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন, যারা পাসপোর্ট করিয়ে দেওয়ার নামে টাকা নিয়ে থাকেন।
এ বিষয়ে পাসপোর্ট অধিদফতরের পরিচালক (বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিস) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, এখানে কোনো অনিয়ম দেখতে চাই না। ব্যক্তিগতভাবে আমি সবাইকে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করি। অনিয়মের যেকোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তিনি আরো বলেন, এমআরপি ও ই-পাসপোর্টের কারণে পাসপোর্ট আবেদন প্রক্রিয়ার সময় বেড়েছে। পাসপোর্ট করার হারও বেড়েছে। তাই নির্বিঘ্নে পাসপোর্ট সেবা দিতে রাজধানীতে পাঁচটি আঞ্চলিক অফিসে সেবা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। কিন্তু ঐ হারে লোকবল বাড়েনি। ফলে কাজে ধীরগতি হওয়ায় সেবা গ্রহীতাদের কিছুটা ভোগান্তি হচ্ছে।
কেরাণীগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপসহকারী পরিচালক আবদুর রশীদ ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, দালাল চক্র ঠেকাতে নিরাপত্তারক্ষীরা তৎপর থাকেন। তারপরও তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। আর আনসার সদস্যদের মধ্যে কেউ দালাল হিসেবে কাজ করছেন কি না, তা আমি জানি না।
তিনি আরো বলেন, আমরা জনবল সংকটের মধ্য দিয়ে কাজ করছি। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক নতুন ও ভুল সংশোধনের আবেদন জমা পড়ে। এসব আবেদন সঠিক সময়ের মধ্যে সমাধান করে সেবা দিতে চাইলে জনবল বৃদ্ধিসহ ঢাকায় আরো ১০টি অফিস দরকার।
এমআরপি ও ই-পাসপোর্টের কারণে পাসপোর্ট আবেদন প্রক্রিয়ার সময় বেড়েছে। পাসপোর্ট করার হারও বেড়েছে। তাই নির্বিঘ্নে পাসপোর্ট সেবা দিতে রাজধানীতে পাঁচটি আঞ্চলিক অফিসে সেবা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। কিন্তু ঐ হারে লোকবল বাড়েনি। ফলে কাজে ধীরগতি হওয়ায় সেবা গ্রহীতাদের কিছুটা ভোগান্তি হচ্ছে।
পাসপোর্টে নানা ভুলে ভোগান্তি:
জানা গেছে, নতুন পাসপোর্ট আবেদনকারীদের মধ্যে গড়ে ৮৫ শতাংশ আবেদনে ভুল পাওয়া যায়। সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয় পুরনো পাসপোর্টধারীদের ভুল তথ্য সংশোধনের ক্ষেত্রে। এর বাইরে দেশ-বিদেশ থেকে দিনে প্রায় ৫০০টি আবেদন আসে নানা ভুল সংশোধন চেয়ে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আবেদন আসে নাম, বয়স ও ঠিকানা পরিবর্তনের। এসব ভুল সংশোধনের জন্য বায়োমেট্রিক করতে হয়। একেকটি বায়োমেট্রিকের জন্য ৫ থেকে ১৫ মিনিট করে সময় লাগে। আবার অনেক সময় আবেদনকারী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে আনেন না। এ কারণে তাদের ফেরত পাঠানো হয়। আর সকল কাগজপত্র সঙ্গে থাকলে পুলিশ ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে আবেদনপত্রটি ভিসা ও পাসপোর্ট অধিদফতরের বোর্ডে পাঠানো হয়। এসব প্রক্রিয়া শেষ করতে অনেক লম্বা সময় লেগে যায়।
পাসপোর্ট সংক্রান্ত দুর্নীতি নিয়ে টিআইবির তথ্য:
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) তথ্যানুসারে, গত বছর (২০২৩ সালে) পাসপোর্ট করতে গিয়ে সেবাগ্রহীতারা সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি ও হয়রানির শিকার হন পুলিশি ছাড়পত্রের (ভেরিফিকেশন) ক্ষেত্রে। পুলিশি তদন্তে সেবাগ্রহীতাদের ৭৬ দশমিক ২ শতাংশ অনিয়ম ও দুর্নীতির শিকার হয়েছেন এবং ৭০ দশমিক ৩ শতাংশ সেবাগ্রহীতাকে পুলিশকে ঘুষ বা নিয়মবহির্ভূত অর্থ দিতে হয়েছে।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এখন যাদের স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র রয়েছে, তাদের পাসপোর্ট করার জন্য পুলিশের কোনো ভেরিফিকেশনের দরকার নেই। যাদের স্মার্টকার্ড নেই, তাদের জন্মসনদ নিয়ে পাসপোর্ট করে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে দুর্নীতি অনেকাংশে কমে যাবে।