খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ থেকে অনৈতিকভাবে অর্থ আদায়, কেবিন ও বেড বাণিজ্য, সরকারি ওষুধ ক্রয়ে দুর্নীতি, আউট সোর্সিং নিয়োগ বাণিজ্যসহ এমন কোনো অনিয়ম নেই যেখানে ডা. শীতল চৌধুরীর নাম নেই। পুরো হাসপাতালে দুর্নীতির জাল বিছিয়ে রেখেছেন তিনি, গড়ে তুলেছেন শক্তিশালী চক্র।
হাসপাতালের সঠিক ব্যবস্থাপনার চেয়ে আর্থিক বিষয়েই ডা. শীতলের বেশি আগ্রহ। কোথাও আর্থিক ফায়দা দেখলেই চকচকে লোলুপ দৃষ্টিতে সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি। আর পরিচালকের এই অর্থলোভের কারণে দিনদিন ধ্বংস হচ্ছে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থা।
.png)
অনৈতিকভাবে অর্থ আদায়
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন (প্রোফাইল সংযুক্ত-১) ডা. শীতল চৌধুরী। যোগদানের পর থেকেই তিনি হাসপাতালের হিসাব বিভাগ, প্যাথলজি, রেডিওলজি, আইসিইউ ও কেবিনসহ বিভিন্ন বিভাগ থেকে প্রতি মাসে অনৈতিকভাবে অর্থ আদায় করে যাচ্ছেন। প্যাথলজি ও রেডিওলজি বিভাগ থেকে ৩০-৪০ হাজার টাকাসহ ও অন্যান্য বিভাগ থেকে প্রতি মাসে প্রায় দেড় লাখ টাকা নেন করেন ডা. শীতল চৌধুরী।
ক্লিয়ারেন্সের বিনিময়ে টাকা
জানা গেছে, হাসপাতালের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী অবসরের যাওয়ার সময় ক্লিয়ারেন্স নিতে গেলে তার কাছ থেকেও টাকা নেন ডা. শীতল। হাসপাতালের জন্য স্থানীয়ভাবে কোনো কিছু কেনার ক্ষেত্রে কয়েকগুণ বেশি দাম ধরে বিল তৈরি করার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে সেখান থেকে অবশিষ্ট অর্থ তিনি নিয়ে যান।
রাজস্ব আত্মসাৎ
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেডিওলজি ও ইমেজিং, আল্ট্রাসনো, এক্সরে, প্যাথলজি, ইসিজি ও অন্যান্য বিভাগের মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা রাজস্ব হিসেবে আদায়কৃত বিপুল অংকের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। হাসপাতালে পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি থাকলেও তারা রোগীদের নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার সরঞ্জামাদি বাইরে থেকে ক্রয় করেন এবং পরীক্ষার রিপোর্টও সেসব সরঞ্জাম দিয়েই দেখেন। ফলে আদায়কৃত অর্থ রাজস্ব খাতে জমা হয় না। এভাবে মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। আর এই চক্রের নেতৃত্ব দিচ্ছেন হাসপাতালের পরিচালক ডা. শীতল চৌধুরী।
কেবিন ও বেড বাণিজ্য
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ’তে মোট ৮টি বেড রয়েছে। প্রতিটি বেডের ভাড়া ৫০০ টাকা। এই টাকা সরকারি রাজস্ব খাতে তো যায়ই না, উল্টো পকেটস্থ করেন পরিচালক ও সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া হাসপাতালটিতে মোট ৪০টি কেবিন রয়েছে, প্রতিটি কেবিনের ভাড়া ৪০০ টাকা, যার মধ্যে ২টি কেবিন বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ফ্রি করা হয়েছে। কেবিনগুলোতে প্রতিদিনই রোগী ভর্তি থাকে। কেবিনের দায়িত্বে আছেন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার ও হেলথ এডুকেটর মো. মুরাদ হোসেন। তিনি কেবিনে ভর্তি রোগীদের অনুপস্থিত দেখিয়ে বাড়তি ভাড়া আত্মসাৎ করছেন। এছাড়া কেবিনে থেকে কোনো রোগীর অপারেশন করা হলে অতিরিক্ত ১০০০-২,০০০ টাকা করে আদায় করা হয়।
সরকারি ওষুধ ক্রয়ে দুর্নীতি
ডা. শীতল চৌধুরীর বিরুদ্ধে সরকারি ওষুধ ক্রয়ে ৭ কোটি টাকা আত্মসাৎসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলতি বছরের ১০ মার্চ ভুক্তভোগীসহ স্থানীয় জনগণ সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেন। এছাড়া গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জন্য ইউডিসিএল বহির্ভূত ওষুধ, চিকিৎসার সরঞ্জামাদি ক্রয়ে ৬ কোটি টাকার টেন্ডার অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে ডা শীতল চৌধুরীর বিরুদ্ধে।
আউটসোর্সিং নিয়োগ বাণিজ্য
ঠিকাদার কোম্পানি পিমা অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যোগাযোগ করে আউটসোর্সিং নিয়োগ নিয়ে বাণিজ্য করছেন সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. শীতল চৌধুরী ও হিসাবরক্ষক মোস্তাজুল ইসলাম। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আউটসোর্সিংয়ে কর্মরত ছিল ৭৬ জন। সেখান থেকে ১২ জনকে রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত করায় বর্তমানে আউটসোর্সিংয়ে কর্মরত রয়েছে ৬৪ জন। মন্ত্রণালয় থেকে বারবার আরো অতিরিক্ত ২৬ জনসহ মোট ৯০ জনকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য চিঠি পাঠানো হলেও হাসপাতালের পরিচালক ও হিসাবরক্ষক বিভিন্ন অজুহাতে দীর্ঘদিন সেটি আটকে রেখেছেন।
উল্লেখ্য, আউটসোর্সিংয়ে কর্মরত কর্মচারীরা ২-৩ মাস পর পর বেতন পায়। বেতন উত্তোলনের সময় হিসাবরক্ষক মুস্তাজুল তাদের বেতন থেকে ৫ হাজার টাকা (হিসাব নম্বরে টাকা ডেসপাসের পূর্বেই) কেটে নেন বলে জানা গেছে। এছাড়া আউটসোর্সিংয়ে নতুন টেন্ডার হওয়ার ভয় দেখিয়ে বর্তমান ঠিকাদারের কাছ থেকেও মোটা অংকের টাকা নিতেন তিনি।
আছে আরো অনিয়ম
চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ৯ মার্চ পর্যন্ত সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অডিটে যান ৪ জন অডিট সদস্য। এ সময় নানা অনিয়ম ধরা পড়ায় পরিচালক ডা. শীতল চৌধুরী তাদের ম্যানেজ করার জন্য সুন্দরবনসহ বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করান ও থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা করেন। এছাড়া তাদের ১০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছেন বলেও একটি সূত্রে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, ২০২১-২২ অর্থবছরের অডিটেও কেবিনের বেড ভাড়া সংক্রান্ত ২৮ লাখ টাকার অনিয়ম ধরা পড়ে। পরবর্তীতে অডিট কর্তৃপক্ষকে ৫ লাখ টাকা দিয়ে বিষয়টির সুরাহা করা হয় বলে জানা গেছে।
হাসপাতাল পরিচালনায় অদক্ষতা
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক হিসেবে অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন ডা. শীতল চৌধুরী। হাসপাতালের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নষ্ট অবস্থায় পড়ে থাকলেও সেগুলো মেরামত বা নতুন কেনার উদ্যোগ নেননি তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ হাসপাতালের ডায়ালাইসিস বিভাগের ১৯টি ডায়ালাইসিস মেশিনের মধ্যে ১৫টিই নষ্ট। এছাড়া ৩টি পানি রিফাইনিং মেশিনের মধ্যে ২টিই অচল অবস্থায় পড়ে আছে। এ কারণে রোগীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বর্তমানে হাসপাতালে সপ্তাহে দুই দিনের পরিবর্তে একদিন কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস করা হচ্ছে। ডা. শীতল চৌধুরীর গাফিলতির কারণে গত তিন মাসে ৫ জন কিডনি রোগীর শরীরে পটাশিয়াম বেড়ে মারা গেছেন বলে জানা গেছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি) থেকে ডায়ালাইসিসের চিকিৎসা সরঞ্জাম (ফ্লুইড, হেপারিন ইনজেকশন, ডায়ালাইজার, ব্লাডলাইন, সিরিঞ্জ ইত্যাদি) দেওয়া হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে রোগীরা ডায়ালাইসিস সামগ্রী বাইরে থেকে অতিরিক্ত টাকা খরচ করে কিনেছেন।
আরো জানা গেছে, ডায়ালাইসিস মেশিন মেরামতের জন্য সিনকার ও আয়েরা নামে দুটি কোম্পানিকে টেন্ডার দেওয়া হলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। এমনকি এ বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালককেও কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করতে দেখা যায়নি।
জনবল ও মেডিকেল ইকুইপমেন্ট ঘাটতি
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অ্যানাসথেসিয়া মেশিন ১৬টির মধ্যে ১০টি, সি আর্ম ৩টির মধ্যে ২টি, ডিফিব্রিলিটেটর ৬টির মধ্যে ১টি, ডায়াথার্মি ১৯টির মধ্যে ৩টি, ইসিজি ১০টির মধ্যে ২টি, মাইক্রোস্কোপ ২টির মধ্যে ১টি ও আল্ট্রাসনোগ্রাম ৩টার মধ্যে ১টি নষ্ট অবস্থায় পড়ে আছে। এছাড়া প্রয়োজনীয় জনবলও নেই। ৯৮ জন ডাক্তারের বিপরীতে আছেন ৫১ জন, ১৫০ জন আউটসোর্সিং জনবলের বিপরীতে আছেন ৭৬ জন এবং ১৯ জন টেকনিশিয়ানের বিপরীতে আছেন ৫ জন।
চিকিৎসকদের প্রাইভেট চেম্বারের প্রবণতা
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধিকাংশ চিকিৎসক রোগীদের যথাযথ সেবা না দিয়ে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে চেম্বার করেন। এছাড়া বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালের রিপ্রেজেনটেটিভরা চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগসাজশ করে রোগীদের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা নেয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। আগে খুলনা ও যশোরের রোগীরাও এখানে চিকিৎসা নিতে আসতেন। কিন্তু বর্তমানে জনবল সংকট, চিকিৎসা সরঞ্জাম নষ্ট, চিকিৎসকদের উদাসীনতাসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে রোগীরা বেসরকারি ক্লিনিকের দিকে ঝুঁকছেন।