ঢাকা,  শনিবার   ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩

[ জাতীয় ]

২৬ অক্টোবর জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী, হতে পারে একাধিক চুক্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৩২, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
২৬ অক্টোবর জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী, হতে পারে একাধিক চুক্তি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান- ফাইল ছবি

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফরে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে চারটির বেশি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হতে পারে। পাশাপাশি দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা, কৌশলগত অংশীদারত্ব ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে আগামী ২৬ অক্টোবর চার দিনের সরকারি সফরে জাপান যাওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। সফর সামনে রেখে দুই দেশের মধ্যে আটটি দলিল চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। তবে আলোচনা শেষে কতটি দলিল সই হবে, তা নির্ধারিত হবে।

প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকগুলোতে কৃষি, মৎস্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসামরিক বিমান চলাচল, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয় রয়েছে।

পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম গণমাধ্যমকে বলেন, সফরকালে প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকগুলোর বেশ কয়েকটি সই হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া সফর শেষে প্রকাশিতব্য যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের আলোচনার ফলাফল এবং বাংলাদেশ-জাপান কৌশলগত অংশীদারত্ব এগিয়ে নেওয়ার অগ্রাধিকারগুলো তুলে ধরা হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, প্রস্তাবিত চুক্তিগুলো বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে জাপানের শিল্প অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার সমন্বয় ঘটাতে পারে। এতে দুই দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এ সফর বাংলাদেশ-জাপান অংশীদারত্বে নতুন গতি আনার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। বিশেষ করে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও মানুষের জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত খাতগুলোতে সহযোগিতার ভিত্তি আরও শক্তিশালী হতে পারে।

কৃষি ও মৎস্য খাতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ এবং মান নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিগুলো নিয়োগদাতাদের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার ওপর জোর দেন।

সাবেক এই উপাচার্য বলেন, ভাষা শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। এতে একদিকে বিদেশে উন্নত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে দেশের শিল্প খাতের জন্য দক্ষ জনশক্তি গড়ে উঠবে।

জাপানি বিনিয়োগে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, বড় বিনিয়োগের পাশাপাশি জাপানের মাঝারি আকারের কোম্পানি ও বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের মধ্যে অংশীদারত্ব গড়ে উঠলে দেশীয় সরবরাহকারী এবং ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো উপকৃত হবে।

২৭ অক্টোবর দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক

ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, আগামী ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে দুই নেতা নিজ নিজ দেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন। এদিন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করবেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী।

সফরে জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের কথা রয়েছে তারেক রহমানের। পাশাপাশি জাপানের ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা ও বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা করবেন তিনি।

সম্ভাব্য কর্মসূচিতে জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লীগের প্রতিনিধি এবং জাপান-বাংলাদেশ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা কমিটির চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক রয়েছে।

এ ছাড়া জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (জেবিআইসি) গভর্নর এবং জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে। সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টিও বিবেচনাধীন।

সফরসূচিতে জাপানের চিবা অঞ্চলের একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং নাগোয়ার একটি টয়োটা কারখানা পরিদর্শনের কর্মসূচিও রাখা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, মন্ত্রী, উপদেষ্টা, জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা এবং প্রতিনিধিদলের অন্য সদস্যদের থাকার কথা রয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে প্রতিনিধিদল জাপান যাবে।

বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে গুরুত্ব

সমঝোতা স্মারক সইয়ের পাশাপাশি চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাস্তবায়ন এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি সফরে গুরুত্ব পাবে।

পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম জানান, চুক্তি বাস্তবায়ন, জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক যোগাযোগ শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা হবে।

এ ছাড়া অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থায়নের শর্ত নিয়েও আলোচনা হতে পারে।

ঢাকার এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের ব্যয় ৮৩ শতাংশ এবং এমআরটি লাইন-৫ প্রকল্পের ব্যয় ১১৩ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে জাপানি ঋণের সুদের হার ও অর্থায়নসংক্রান্ত বিষয়গুলো আলোচনায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

এ বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়নে অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা চেয়েছে। দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে এসব বিষয় আলোচনা হবে। তবে আলোচনা শুধু মেট্রোরেল প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ সব দেশের কাছ থেকেই কম সুদে ঋণ পেতে আগ্রহী। তবে বৈশ্বিক অর্থায়ন পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট দেশের বিভিন্ন বিষয় আলোচনার ফলাফলে প্রভাব ফেলবে।

জাপান বর্তমানে বাংলাদেশের মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী অবকাঠামো উন্নয়নসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে সহায়তা করছে।

এ ছাড়া ২০১৪ সালে চালু হওয়া ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ বা ‘বিগ-বি’ উদ্যোগের মাধ্যমে অবকাঠামো, শিল্পায়ন ও আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নে দুই দেশ সহযোগিতা করছে।

প্রধানমন্ত্রীর সফরে দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলোর পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি, স্থিতিশীলতা, জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই ও শান্তিপূর্ণ সমাধান নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এ সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে এবং বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন সহযোগিতায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এআর
Durga Puja
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!