মাদ্রাসায় ৯ মাসে ১০৯ শিশু নির্যাতনের শিকার
নৈতিক শিক্ষা ও নিরাপদ পরিবেশের আশায় সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠান অভিভাবকেরা। তবে বিভিন্ন মাদ্রাসায় ছেলে শিশুদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উদ্বেগ তৈরি করছে।
মানবাধিকার সংস্থা জাস্টিস মেকার্স বাংলাদেশ ফ্রান্সের (জেএমবিএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় ৭২টি ঘটনায় অন্তত ১০৯ শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এসব ঘটনায় মামলা হলেও বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি ও শিশুদের আইনি সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
চলতি বছরের মে মাসে রাজধানীর বনশ্রীর একটি মাদ্রাসা থেকে ১০ বছর বয়সী শিক্ষার্থী আবদুল্লাহর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। যৌন নির্যাতন ও আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে তার মা মামলা করেন। এ ঘটনায় একই মাদ্রাসার এক জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় সাত মাস পেরিয়ে গেলেও মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
জেএমবিএফের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ছেলে শিশুদের ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার অন্তত ১৩১টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় ভুক্তভোগীর সংখ্যা ১৭১। তাদের মধ্যে ১৬১ জন ধর্ষণের শিকার এবং ১০ জন ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নথিভুক্ত ঘটনাগুলোর বড় অংশ মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে ঘটেছে বলে সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ছেলে শিশুদের যৌন নির্যাতনের ঘটনায় বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রমাণ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান বলেন, এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে শিশুর শারীরিক পরীক্ষা, নমুনা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ এবং ফরেনসিক পরীক্ষার ফল প্রস্তুতের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট মানসম্মত কার্যপদ্ধতি বা এসওপি না থাকায় জটিলতা তৈরি হতে পারে।
তাঁর মতে, মেডিকেল ও ডিএনএ পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ যথাযথভাবে সংগ্রহ ও আদালতে উপস্থাপন করা না গেলে অপরাধ প্রমাণ এবং দোষী ব্যক্তির শাস্তি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এদিকে সামাজিক লজ্জা ও লোকসমাজের ভয়ে ছেলে শিশুদের ওপর সংঘটিত অনেক নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এতে ভুক্তভোগী শিশুরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা থেকেও বঞ্চিত হতে পারে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অধিকারকর্মীরা। মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট ফাওজিয়া করিম বলেন, মাদ্রাসাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের ‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’ সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষক ও অভিভাবকদের প্রশিক্ষণ এবং পেশাদার কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, যাতে শিশুরা ভয় বা দ্বিধা ছাড়াই নির্যাতনের কথা জানাতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতিমালা, অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা এবং অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁদের মতে, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, যথাযথ আইনি ব্যবস্থা এবং ভুক্তভোগীদের জন্য চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা একসঙ্গে নিশ্চিত করা জরুরি।