ঢাকা,  সোমবার   ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩

[ জাতীয় ]

১০ দলের নেতৃত্বে পরিবারতন্ত্র, সিদ্ধান্ত ব্যক্তিনির্ভর: টিআইবি

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৬:৫৩, ২ নভেম্বর ২০২৬
১০ দলের নেতৃত্বে পরিবারতন্ত্র, সিদ্ধান্ত ব্যক্তিনির্ভর: টিআইবি
ছবি সংগৃহীত

বাংলাদেশের ১০টি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব পরিবারকেন্দ্রিক। অধিকাংশ দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণেও প্রাধান্য পাচ্ছে একক ব্যক্তির মতামত। নেতৃত্ব নির্বাচনে সাংগঠনিক দক্ষতার চেয়ে পরিবার, অর্থ ও তারকাখ্যাতিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে অনিয়মিত কাউন্সিল, গোপন ভোটের অভাব, আর্থিক অস্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রকে দুর্বল করছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গত রোববার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সংস্থাটির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। গবেষণায় ৪২টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তথ্য পাওয়া গেছে ৩২টির। ২০০৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দলগুলোর কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হয়েছে; ক্ষেত্রবিশেষে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত তথ্য নেওয়া হয়েছে।

টিআইবির তথ্য অনুযায়ী, পরিবারকেন্দ্রিক নেতৃত্বের চর্চা রয়েছে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জাকের পার্টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাপ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও বাংলাদেশ জাস্টিস পার্টিতে। আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সভাপতি শেখ হাসিনা দীর্ঘতম সময় ধরে নেতৃত্বে রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ১২টি দলের প্রধান অন্তত ১০ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ছাড়া অন্য কোনো দলের গঠনতন্ত্রে একজন ব্যক্তি কত মেয়াদে দলীয় প্রধান থাকতে পারবেন, তা নির্দিষ্ট করা নেই।

দলগুলোর সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফোরাম হিসেবে জাতীয় কাউন্সিল বা সম্মেলনের কথা গঠনতন্ত্রে থাকলেও বাস্তবে ১৬টি দলের কাউন্সিল অনিয়মিত। এসব কাউন্সিলে অনেক ক্ষেত্রে আগে থেকে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়। নেতৃত্ব নির্বাচনে অধিকাংশ দল গোপন ব্যালটের পরিবর্তে কণ্ঠভোটের ওপর নির্ভর করে। শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচনে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেখা গেছে কেবল সিপিবি ও আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টিতে। এতে ভিন্নমত প্রকাশ এবং তৃণমূলের অংশগ্রহণ সীমিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে পর্যবেক্ষণ করেছে টিআইবি।

প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রেও স্থানীয় কমিটির প্রস্তাব উপেক্ষা করে দলীয় প্রধানের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। বড় দলগুলোয় অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাব এবং বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে মনোনয়ন-বাণিজ্যের অভিযোগের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। 

নারীর অংশগ্রহণেও রয়েছে বড় ঘাটতি। মাত্র দুটি দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারী সদস্যের হার ৩৩ শতাংশ বা তার বেশি। জামায়াতে ইসলামী ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারী সদস্য নেই। পাশাপাশি নেতা-কর্মীদের জন্য স্বতন্ত্র আচরণবিধি, নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ তদন্ত ও আপিলের সুস্পষ্ট প্রক্রিয়ার অভাব রয়েছে।

আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি। দলগুলোর নির্দিষ্ট আর্থিক নীতিমালা ও বার্ষিক বাজেট না থাকা এবং নিরীক্ষা প্রতিবেদনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্রও উদ্বেগজনক। টিআইবির গবেষণায় উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৪ হাজার ২৮০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৭৪৬ জন নিহত এবং ৪৬ হাজার ৩৫১ জন আহত হয়েছেন।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনপ্রক্রিয়া সহজ করা, নিয়মিত কাউন্সিল আয়োজন, গোপন ব্যালটে নেতৃত্ব নির্বাচন, নেতৃত্বের মেয়াদসীমা নির্ধারণ, তৃণমূলের ভোটে প্রার্থী প্যানেল তৈরি এবং আর্থিক হিসাব প্রকাশ ও স্বাধীন নিরীক্ষার সুপারিশ করেছে টিআইবি। দলগুলোকে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় আনা, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং অপরাধে জড়িত নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।

টিআইবির মতে, গণতন্ত্রকে কার্যকর করতে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে গণতান্ত্রিক চর্চা প্রতিষ্ঠা না হলে দলগুলোর সাংগঠনিক সংস্কার এবং জনআস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসআই
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!