শুধু তা-ই নয়, আণবিক বোমা যে মর্মান্তিক পরিণতি নাগরিক জীবনে নিয়ে এসেছিল, সেসব কাহিনির বর্ণনায়ও হিরোশিমা অনেক বেশি উপস্থিত। এর প্রধান কারণ অবশ্যই নাগাসাকির চেয়ে মাত্র তিন দিন আগে (৬ আগস্ট ১৯৪৫) বিশ্বের প্রথম শহর হিসেবে হিরোশিমার আণবিক বোমা হামলার পরিণতি সহ্য করা। তাই বলে নাগাসাকির ক্ষয়ক্ষতি এবং ধ্বংসের বিস্তৃতি কিন্তু হিরোশিমার চেয়ে কোনো অংশেই কম ছিল না।
বোমা বিস্ফোরণের ক্ষতি শুধু তাৎক্ষণিক প্রাণহানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বিস্ফোরণের তীব্র তাপ, শকওয়েভ এবং তেজস্ক্রিয় বিকিরণ মানুষের শরীর ও পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছিল। তেজস্ক্রিয় ধূলিকণা ও ছাই মিশ্রিত তথাকথিত ‘কালো বৃষ্টি’ আক্রান্ত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। যারা এই বিপর্যয় থেকে বেঁচে যান, তাদের জাপানি ভাষায় বলা হয় হিবাকুশা। তাঁদের অনেকেই পরবর্তী জীবনে ক্যানসার, লিউকেমিয়া এবং অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্ত হন। পাশাপাশি মানসিক আঘাত, সামাজিক বৈষম্য এবং দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা তাঁদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
.png)
আজ ৯ আগস্ট, নাগাসাকি দিবস। হিরোশিমায় বোমা হামলার ৮১ বছর আজ। মানবসভ্যতার ইতিহাসে দিনটি এক গভীর বেদনা ও সতর্কতার প্রতীক। ১৯৪৫ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একেবারে শেষের দিকে মার্কিন বাহিনী ৬ আগস্ট জাপানের হিরোশিমায় প্রথম পারমাণবিক বোমা হামলা চালায়। এই হামলার পর ঠিক তিন দিনের মাথায় দ্বিতীয় দফায় ৯ আগস্ট আবারও নারকীয় হামলায় মেতে ওঠে মার্কিন সেনাবাহিনী। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ তিনিয়ানের এক বিমানঘাঁটি থেকে
ইউনাইটেড স্টেটস আর্মি এয়ার ফোর্সেস বি-২৯ (বোকস্কার) নামের বিমানটি দ্বিতীয় দফায় পারমাণবিক বোমা হামলা করতে জাপানের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। তাদের এই মিশনের নাম দেয়া হয় ‘অপারেশন সেন্টার বোর্ড টু’। প্রতিবছর ঐ ঘটনাকে স্মরণ করে বিশ্বব্যাপী পালিত হয় হিরোশিমা ও নাগাসাকি দিবস। হিরোশিমা-নাগাসাকি দিবস উপলক্ষে একটাই প্রত্যাশা-পৃথিবী থেকে সকল পারমাণবিক বোমা ধ্বংস করা হোক। নিশ্চিত হোক বারুদের গন্ধমুক্ত সুন্দর পৃথিবী, যেখানে নতুন প্রজন্মের জন্য থাকবে নিশ্চিত নিঃশ্বাস এবং সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার অধিকার।
এই হত্যাযজ্ঞে নিহত হয় বেসামরিক লাখ লাখ নিরীহ ঘুমন্ত নারী, পুরুষ ও শিশু। ওই হামলায় যারা মারা যাননি, তারা বরণ করে নিয়েছে চিরপঙ্গুত্ব। মৃত্যুপুরীতে পরিণত হওয়া জাপানের হিরোশিমা শহরটির পাশাপাশি নাগাসাকি শহরের পরিবেশও সুস্থভাবে বেঁচে থাকার প্রতিকূল।
নাগাসাকি দিবস আমাদের শুধু অতীতের এক ট্র্যাজেডির কথা স্মরণ করিয়ে দেয় না; এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও বহন করে। ধ্বংসের মধ্য থেকেও পুনর্গঠন সম্ভব, ঘৃণার মধ্য থেকেও সহমর্মিতা জন্ম নিতে পারে, এবং যুদ্ধের স্মৃতি থেকেও শান্তির আন্দোলন গড়ে উঠতে পারে। নাগাসাকির ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসা এই শিক্ষা আজও সমগ্র বিশ্বের জন্য সমান প্রাসঙ্গিক।
নাগাসাকির ইতিহাস শুধু ধ্বংস ও মৃত্যুর নয়; এটি মানুষের অসাধারণ পুনর্গঠন ক্ষমতারও উদাহরণ। যুদ্ধের পর ধ্বংসস্তূপ থেকে শহরটি ধীরে ধীরে পুনর্গঠিত হয়। চিকিৎসা, গবেষণা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও সামাজিক পুনর্বাসনের মাধ্যমে নাগাসাকি আবার একটি আধুনিক নগরীতে পরিণত হয়েছে।
আজকের নাগাসাকি একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী ও পর্যটনকেন্দ্র। পাহাড়, সমুদ্র, ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং আধুনিক নগরজীবনের পাশাপাশি শহরটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হলো—এটি শান্তির বার্তাবাহক।
নাগাসাকি আজ কেবল আধুনিক অবকাঠামো, সমুদ্রবন্দর ও পাহাড়ি সৌন্দর্যের এক মনোরম আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্যই নয়, বরং বিশ্বের অন্যতম এক গুরুত্বপূর্ণ শান্তির প্রতীক, যেখানে প্রতি বছর ৯ আগস্ট সকাল ১১টা ২ মিনিটে- ঠিক পারমাণবিক বিস্ফোরণের সেই নির্মম মুহূর্তে—এক মিনিট নীরবতা পালন, নাগাসাকি পিস পার্ক ও অ্যাটমিক বোমা মিউজিয়ামে বিশেষ শ্রদ্ধা নিবেদন এবং বিশ্বশান্তির জোরালো আহ্বানের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের সেই ভয়াবহ অধ্যায় থেকে শিক্ষা নেওয়ার তাগিদে বিশ্ববাসী একত্রিত হয়।