ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ খবর ]

জ্ঞানের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক-‘অ্যান্টি লাইব্রেরি’

ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:১৭, ১৫ আগস্ট ২০২৬
জ্ঞানের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক-‘অ্যান্টি লাইব্রেরি’
এই অসম্ভব ধাঁধার সমাধান লুকিয়ে ছিল স্পেনের এক লাইব্রেরির ধুলোমাখা এক কোণায় পড়ে থাকা অবহেলিত একটি বইয়ে! ষোড়শ শতাব্দীতে এক স্প্যানিশ ব্যক্তি, ডিয়েগো ডি ল্যান্ডা মায়া সভ্যতার ওপর একটি বই লিখেছিলেন। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় বইটি স্পেনের রয়্যাল অ্যাকাডেমির আর্ক

আমরা জ্ঞানকে অলংকারের মতো ব্যবহার করি, যা সামাজিক অবস্থান বাড়ায়। অথচ একোর লাইব্রেরির মূল শিক্ষা হলো, অজানা বিষয়গুলোই আসল সম্পদ। সেই অজানাই আমাদের পড়তে বাধ্য করে, শেখাতে থাকে, আর এক ধরনের বৌদ্ধিক বিনয় জাগিয়ে তুলে।

ইতালিতে একজন বিখ্যাত দার্শনিক ছিলেন। নাম উমবের্তো ইকো। তাঁর ঘরে ছিল প্রায় ৩০ হাজার বইয়ের বিশাল এক লাইব্রেরি। 
বাড়িতে কোনো অতিথি এলেই বইয়ের পাহাড় দেখে চোখ কপালে তুলতেন। আর কমন একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতেন, "বাহ! এত বই! আপনি কি এর সবগুলোই পড়েছেন?"

Advertisement

এই প্রশ্ন শুনলে ইকোর মেজাজ চরম খারাপ হয়ে যেত। কারণ, ওই অতিথিরা লাইব্রেরির আসল ফিলোসফিটাই বুঝত না।
ইকোর এই বিশাল কালেকশনের বড় একটা অংশ তার পড়া হয়নি। তিনি বিশ্বাস করতেন, পড়া বইয়ের চেয়ে 'না-পড়া' বইয়ের দাম অনেক বেশি।

বিখ্যাত চিন্তাবিদ নাসিম নিকোলাস তালেব এ ধরনের বইয়ের কালেকশনকে নাম দিয়েছিলেন 'অ্যান্টি-লাইব্রেরি'। এই ধারণা তিনি প্রথম বিশ্লেষণ করেন তার বিখ্যাত বই ‘The Black Swan’-এ। তালেব সেখানে উমবের্তো একোর কথা টানেন—যার ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে ছিল প্রায় ত্রিশ হাজার বই। অতিথিরা চমকে যেতেন তাকের পর তাক বই দেখে, ধরে নিতেন একোর বিশাল জ্ঞান সঞ্চয়। কিন্তু বুদ্ধিমানরা বুঝতে পারতেন বইয়ের প্রাচুর্য আসলে তার অজানা বিষয়গুলির প্রতি আকাঙ্ক্ষারই বহিঃপ্রকাশ। 

একো নিজেও হিসাব কষে দেখেছিলেন—যদি দিনে একটা করে বই পড়া যায়, তবুও আশি বছরে সর্বোচ্চ পঁচিশ হাজার বইয়ের বেশি পড়া সম্ভব নয়। অথচ যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিতেই রয়েছে অন্তত এক মিলিয়ন বই। তালেব বলেন, পড়া বই নয়, না-পড়া বই-ই বেশি মূল্যবান। আমাদের নিজেদের লাইব্রেরি যতটা সম্ভব আমাদের অজ্ঞতার প্রতিফলন হওয়া উচিত। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞানের ভান্ডার বাড়বে, কিন্তু তাক ভর্তি অপঠিত বই আমাদের প্রতি মুহূর্তে মনে করিয়ে দেবে কতটা অজানা রয়ে গেছে।

মজার বিষয় হলো, ইকোর মৃত্যুর পর সেই লাইব্রেরি ধুলোয় হারিয়ে যায়নি। আজও তা আগামী প্রজন্মের জন্য জ্ঞানের অফুরন্ত খনি হয়ে বেঁচে আছে। ইকো ৮৪ বছর বয়সে ক্যান্সারে মারা যান । তাঁর মৃত্যুর দশ বছর পর বোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয় ‘বিবলিওটেকা ইকো’ নামে একটি পাবলিক লাইব্রেরি চালু করে, যেখানে লেখকের বিশাল বইয়ের সংগ্রহ রাখা হয়েছে। লাইব্রেরিটিতে ৩২,০০০-এরও বেশি বই রয়েছে এবং এর মধ্যে ইকোর রচনার ২,০০০-এরও বেশি সংস্করণ ও অনুবাদ অন্তর্ভুক্ত; বইগুলো তাঁর পরিবার দান করেছিল। 

উল্লেখযোগ্যভাবে, তাকগুলো বিষয়ভিত্তিক ভাবে সাজানো হয়েছে, যা মিলানে ইকোর বাড়ি ও পড়ার ঘরে তাঁর নিজের তাক সাজানো এবং গোছানোর পদ্ধতিরই অনুকরণ। এর উদ্দেশ্য ছিল ইকোর মূল বিন্যাসটি সংরক্ষণ করা, যাতে গবেষকরা তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক যাত্রা, গবেষণার পদ্ধতি এবং জ্ঞানের বিভিন্ন উৎস ও ক্ষেত্রের মধ্যে তাঁর স্থাপিত সংযোগ সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারেন।

আসলে একটা ভালো বই হলো টাইম মেশিনের মতো। যত পুরাতন বই, তত শক্তিশালী টাইম মেশিন। ইতিহাস ঘাঁটলে এমন ঘটনাও পাওয়া যায়, যেখানে লাইব্রেরির বুকশেলফে অযত্নে পড়ে থাকা পুরোনো কোনো বই যুগের পর যুগ ধরে চলতে থাকা অমীমাংসিত রহস্যের জট নিমিষেই খুলে দিয়েছে।

মায়া সভ্যতার কথাই ধরা যাক। মধ্য আমেরিকার গহীন জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা এই প্রাচীন সভ্যতার পিরামিড আর পাথরের গায়ে খোদাই করা ছিল অদ্ভুত সব চিত্রলিপি। শত শত বছর ধরে বিশ্বের বাঘা বাঘা ভাষাবিদ আর বিজ্ঞানীরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলেও এই মায়া লিপির পাঠোদ্ধার করতে পারছিলেন না। পুরো বিষয়টা ছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম বড় এক গোলকধাঁধা।

অথচ এই অসম্ভব ধাঁধার সমাধান লুকিয়ে ছিল স্পেনের এক লাইব্রেরির ধুলোমাখা এক কোণায় পড়ে থাকা অবহেলিত একটি বইয়ে! ষোড়শ শতাব্দীতে এক স্প্যানিশ ব্যক্তি, ডিয়েগো ডি ল্যান্ডা মায়া সভ্যতার ওপর একটি বই লিখেছিলেন। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় বইটি স্পেনের রয়্যাল অ্যাকাডেমির আর্কাইভে হারিয়ে যায়। তিন শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে কেউ বইটির পাতা খুলেও দেখেনি।

অবশেষে ১৮৬২ সালে এক স্কলার মাদ্রিদের লাইব্রেরিতে ধুলোর আস্তরণে ঢেকে থাকা এই বইটি আবিষ্কার করেন। আর সবচেয়ে বড় চমকটা ছিল সেখানেই! যুগের পর যুগ ধরে বিজ্ঞানীরা যে মায়া লিপির অর্থ খুঁজছিলেন, সেই লিপি পড়ার মূল চাবিকাঠি বা ‘অ্যালফাবেট কি’ লুকিয়ে ছিল ওই অবহেলিত বইটারই কয়েকটা পাতায়। 

ভাবুন, কোথায় ষোড়শ শতাব্দীর স্প্যানিশ লেখক, আর কোথায় বিংশ শতাব্দীর আধুনিক বিশ্ব! মাঝখানের এই শত শত বছরের দূরত্ব এক নিমিষেই ঘুচিয়ে দিয়েছিল অপঠিত ওই পুরোনো বইটি। এ কারণেই বলব, আজ একটা চমৎকার বই কিনেছেন মানে এই না যে আজ রাতেই সেটা শেষ করতে হবে। হতে পারে বইটি আপনার পড়াই হলো না। বছরের পর বছর সেটা আপনার বুকশেলফে চুপচাপ ঘুমিয়ে রইল। কিন্তু একদিন আপনার অবর্তমানে আপনার সন্তান বা নাতি-নাতনি যখন সেই বইটার ধুলো ঝাড়বে, তারা কেবল একটা কাগজ-কালির বই পড়বে না। তারা স্পর্শ করবে আপনার রুচিকে, আপনার মননকে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এস এম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!