ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ মতামত ]

আমেরিকার মানচিত্রে হরমুজ প্রকাশের জবাবে ইরানের মানচিত্রে ক্যালিফোর্নিয়া!

ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ২১:৫৪, ২২ আগস্ট ২০২৬
আমেরিকার মানচিত্রে হরমুজ প্রকাশের জবাবে ইরানের মানচিত্রে ক্যালিফোর্নিয়া!
রিয়াজুল হক

মানচিত্র শুধু ভূগোলের ছবি নয়, অনেক সময় তা হয়ে ওঠে ক্ষমতার ভাষা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনায় মানচিত্র যেন সেই ক্ষমতার ভাষাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। ‎সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন একটি মানচিত্র প্রকাশ করেছেন, যেখানে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীকে ‘NEW U.S. Territory’ বা ‘নতুন মার্কিন ভূখণ্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর আগে ট্রাম্প হরমুজ প্রণালীকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে পরিণত করার ইচ্ছার কথাও প্রকাশ্যে বলেছিলেন।

‎এর জবাবে ইরানের একটি সরকারি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অ্যাকাউন্টে যুক্তরাষ্ট্রের মানচিত্র প্রকাশ করে ক্যালিফোর্নিয়াকে নীল রঙে চিহ্নিত করে সেটিকে ‘NEW TERRITORY OF ISLAMIC REPUBLIC OF IRAN’ বলে অভিহিত করেছে। অর্থাৎ, ওয়াশিংটনের হরমুজ-দাবির জবাব তেহরান দিয়েছে ক্যালিফোর্নিয়া-দাবির মানচিত্র দিয়ে। আমেরিকা হয়তো ভাবতেই পারেনি বিষয়টা এরকম হতে পারে।

‎হরমুজ প্রণালী ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ, যার একটি অংশ উভয় দেশের আঞ্চলিক জলসীমার সঙ্গে সম্পর্কিত। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য এর গুরুত্ব অপরিসীম। মার্কিন কংগ্রেসের গবেষণা সেবার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও হরমুজকে ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক জলসীমার সমন্বয়ে গঠিত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। 

Advertisement

‎তাই হরমুজের ওপর সামরিক নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব প্রতিষ্ঠা করা আর হরমুজকে নিজের ভূখণ্ড বলে দাবি করা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। কোনো রাষ্ট্র সামরিক শক্তির মাধ্যমে কোনো অঞ্চলে প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে পারে; কিন্তু সেই প্রভাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভূখণ্ডগত সার্বভৌমত্ব সৃষ্টি করে না। এখানেই আমেরিকার হরমুজের বিপরীতে ইরানের ক্যালিফোর্নিয়ার পাল্টা মানচিত্রটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। 

‎ইরান কার্যত বলতে চেয়েছে, আপনি যদি শক্তির জোরে অন্যের ভূখণ্ড বা জলসীমাকে নিজের বলে মানচিত্রে চিহ্নিত করতে পারেন, তাহলে একই যুক্তি ব্যবহার করে আমরাও আপনার ভূখণ্ডের একটি অংশকে নিজেদের বলে চিহ্নিত করতে পারি। 

‎আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিপজ্জনক প্রবণতা শুরু হয় তখনই, যখন শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো নিজেদের জন্য এক ধরনের নিয়ম এবং অন্যদের জন্য আরেক ধরনের নিয়ম দাবি করতে শুরু করে। দুর্বল রাষ্ট্রকে যদি বলা হয়—তোমার সার্বভৌমত্ব, সীমান্ত ও আন্তর্জাতিক আইনকে সম্মান করতে হবে; কিন্তু শক্তিশালী রাষ্ট্র নিজের স্বার্থে অন্যের ভূখণ্ড, জলসীমা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক যোগাযোগপথকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অধিকার রাখে; তাহলে আন্তর্জাতিক আইন আর সার্বজনীন আইন থাকে না, তা পরিণত হয় শক্তিশালীর সুবিধা সংরক্ষণের নিয়মে। 

‎আজ যদি হরমুজকে ‘নতুন মার্কিন ভূখণ্ড’ বলা হয়, কাল অন্য কোনো শক্তিধর রাষ্ট্র কোনো দুর্বল দেশের একটি অঞ্চলকে ‘নতুন ভূখণ্ড’ ঘোষণা করতে পারে। আজ যদি ক্যালিফোর্নিয়াকে ব্যঙ্গ করে ‘ইরানের নতুন ভূখণ্ড’ দেখানো হয়, কাল অন্য কেউ আলাস্কা, তাইওয়ান, কাশ্মীর, ক্রিমিয়া কিংবা অন্য কোনো বিতর্কিত অঞ্চল নিয়ে একই ধরনের মানচিত্র প্রকাশ করতে পারে। তখন মানচিত্র আর রাষ্ট্রের সীমা নির্দেশ করবে না, হয়ে উঠবে শক্তির প্রদর্শনী। ‎বিশ্বের ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোর জন্য এটাই সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়।

‎কারণ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় তাদের প্রধান নিরাপত্তা হলো 'আইন', সামরিক শক্তি নয়। একটি ছোট রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া কিংবা অন্য কোনো পরাশক্তির সঙ্গে শক্তির প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না। তাই তাদের জন্য আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘের সনদ, সার্বভৌমত্বের নীতি এবং রাষ্ট্রগুলোর ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মানই প্রধান রক্ষাকবচ। 

‎পরাশক্তিগুলো যখন নিজেদের স্বার্থে সেই নীতিগুলোকে দুর্বল করে, তখন ক্ষতিটা শুধু কোনো একটি রাষ্ট্রের হয় না, ক্ষতিগ্রস্ত হয় গোটা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা। ‎হরমুজের ঘটনাটি তাই আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন রেখে যায় বিশ্ব কি সত্যিই আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে, নাকি শেষ পর্যন্ত ‘যার শক্তি বেশি, তার মানচিত্রই সত্য’, এই নীতিই প্রতিষ্ঠিত হবে?

‎ইরানের ক্যালিফোর্নিয়া মানচিত্রের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই। এটি ওয়াশিংটনের বক্তব্যকে তার নিজের যুক্তির আয়নায় দেখানোর চেষ্টা। আপনি যদি অন্যের ভূখণ্ডকে মানচিত্রে নিজের বলে দেখান তাহলে আপনার নিজের ভূখণ্ড নিয়েও একই ধরনের কাল্পনিক মানচিত্র তৈরি করা সম্ভব, এটাই সার কথা। 

‎মানচিত্রে রঙ বদলানো সহজ। কিন্তু আন্তর্জাতিক সীমারেখা বদলানো এত সহজ নয়। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট নয় যে ইচ্ছেমতো ঘোষণা করে দেওয়া যাবে। আর আন্তর্জাতিক আইনও কোনো শক্তিধর রাষ্ট্রের পছন্দমতো চালু বা বন্ধ করার বাটন নয়, যে  সুইচ চাপ দিলেই হয়ে যাবে।

‎হরমুজ তাই শুধু একটি প্রণালী নয়, এটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য একটি পরীক্ষাও। বিশ্ব দেখছে, শক্তি কি আইনের ওপর স্থান পাবে, নাকি আইনই শেষ পর্যন্ত শক্তিকে সীমারেখার মধ্যে রাখবে। কারণ আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে বিপজ্জনক মানচিত্র হলো সেটি, যেখানে শক্তির জোরে অন্যের ভূখণ্ডকে নিজের বলে দেখানোর সাহস জন্ম নেয়।

‎-লেখক:রিয়াজুল হক, অতিরিক্ত পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এস আই এস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!