ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ মতামত ]
স্থিতির কাচের প্রাসাদ

সীমান্ত নয়, মানবতার দৃষ্টিতে উদ্বাস্তু সংকট

কে এম জয়নুল আবেদীন
প্রকাশিত: ০৯:১০, ২৪ আগস্ট ২০২৬
সীমান্ত নয়, মানবতার দৃষ্টিতে উদ্বাস্তু সংকট
কে এম জয়নুল আবেদীন

পৃথিবী আজ এক অদৃশ্য মানবস্রোতের শব্দ শুনছেকিন্তু আমরা অনেক সময় তা শুনেও না-শোনার ভান করি। আমাদের চোখের সামনে কোটি কোটি মানুষ ঘর ছাড়ছে। কেউ ক্ষুধার তাড়নায়, কেউ যুদ্ধের আগুনে, কেউ নিপীড়নের ভয়ে, আবার কেউ উন্নত জীবনের মিথ্যা আশ্বাসে। তারা কেউই জন্মভূমি, ঘরবাড়ি কিংবা আপনজনকে ছেড়ে অজানার পথে পা বাড়াতে চায়নি। তারা শুধু চেয়েছিল এমন একটি জীবন, যাকে ভালোবাসা যায়; এমন একটি নিরাপদ আশ্রয়, যেখানে সন্তানদের নিয়ে স্বপ্ন দেখা যায়।

তবু আজ তাদের অনেকের পথ সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ, মরুভূমির উত্তাপ, সীমান্তের কাঁটাতার কিংবা মানবপাচারকারীর অন্ধকার জালে গিয়ে শেষ হয়। এই মানুষগুলো অপরাধী নয়। তারা আমাদেরই মতো মানুষশুধু তাদের ভাগ্যে নিরাপদ পৃথিবীটি জোটেনি।

Advertisement

আমার কাছে এই সংকট কোনো ব্যক্তির নৈতিক ব্যর্থতা মাত্র নয়; এটি বিশ্ব নেতৃত্বের এক গভীর মানবিক ব্যর্থতা। পৃথিবীর শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য উঁচু প্রাচীর তোলে, কঠোর সীমান্ত আঁকে। অথচ সেই প্রাচীরের ওপারে যখন ক্ষুধার্ত, ভীত ও বাস্তুচ্যুত মানুষ আশ্রয়ের জন্য দাঁড়িয়ে থাকে, তখন আমরা ভুলে যাইসীমান্ত মানুষের জন্য, মানুষ সীমান্তের জন্য নয়।

যেখানে সুশাসনের অভাব, দুর্নীতি, রাজনৈতিক হিংসা, যুদ্ধ ও অন্যায় মানুষের নিজভূমিকে বসবাসের অযোগ্য করে তোলে, সেখান থেকেই বাস্তুচ্যুতির জন্ম। অথচ যে রাজনৈতিক ব্যর্থতা মানুষকে ঘরছাড়া করে, অনেক সময় সেই একই ব্যবস্থা তাদের আশ্রয়ের দরজাও বন্ধ করে দেয়। এ এক নির্মম বৈপরীত্য।

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীতে আজও ১১ কোটিরও বেশি মানুষ যুদ্ধ, সংঘাত, নিপীড়ন ও সহিংসতার কারণে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত। এই সংখ্যা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি ভাঙা ঘর, একটি হারানো শৈশব, একটি মায়ের কান্না, একটি শিশুর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

ইতিহাস আমাদের বারবার এই একই সত্য দেখিয়েছে। ভিয়েতনামের ‘বোট পিপল’ উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে মৃত্যুকে সামনে রেখে নিরাপত্তার সন্ধান করেছিল। সিরিয়ার যুদ্ধ রাতারাতি অসংখ্য শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে উদ্বাস্তুতে পরিণত করেছিল। আর আমাদের খুব কাছেই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দীর্ঘ দুর্ভোগনিজের জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে লাখ লাখ মানুষ আজও আশ্রয়শিবিরে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে বেঁচে আছে। তাদের কষ্ট আমাদের বিবেকেরও পরীক্ষা।

দুঃখজনকভাবে, মানুষের এই অসহায়ত্বকে অপরাধীরা ব্যবসায় পরিণত করেছে। মানবপাচার, জোরপূর্বক শ্রম, ঋণের ফাঁদ, পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া, মজুরি আত্মসাৎএসবই আধুনিক দাসত্বের নতুন রূপ। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, কোটি কোটি মানুষ আজ জোরপূর্বক শ্রমের শিকার। অভিবাসী শ্রমিকদের ঝুঁকি আরও বেশি।

আমরা যখন কাউকে ‘অবৈধ অভিবাসী’ বলে সহজেই চিহ্নিত করি, তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য আড়ালে পড়ে যায়কোনো মানুষ অবৈধ নয়; তার কোনো কোনো প্রবেশপথ বা কাগজপত্র হয়তো আইনের চোখে বৈধ নয়। একজন মানুষকে তার কাগজ দিয়ে নয়, তার মানবিক মর্যাদা দিয়ে দেখতে শেখাই সভ্যতার লক্ষণ।

মানুষ দেশ ছাড়ে কেন? অধিকাংশ সময় অপরাধ করার জন্য নয়বেঁচে থাকার জন্য। নিরাপদ জীবন, কাজ, সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং একটু সম্মানের আশায় মানুষ অজানা পথে যায়। তাই মানবিকতার প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত তাদের জন্য নিরাপদ ও বৈধ পথ তৈরি করা। কারণ নিরাপদ পথ যত সংকুচিত হয়, মানবপাচারকারীদের ব্যবসা তত বিস্তৃত হয়।

আর একটি বিষয় আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন। অভিবাসী ও উদ্বাস্তুরা সবসময় বোঝা নয়; অনেক সময় তারাই আশ্রয়দাতা দেশের অর্থনীতির নীরব শক্তি। কৃষি, নির্মাণ, পরিচর্যা, স্বাস্থ্যসেবা ও নানা কঠিন শ্রমে তারা অবদান রাখে। তারা কর দেয়, অর্থনীতিতে অংশ নেয় এবং এমন অনেক কাজ করে, যার ওপর স্থানীয় সমাজের দৈনন্দিন জীবনও নির্ভরশীল।

কিন্তু তার চেয়েও বড় সত্য হলোনিরাপত্তা কোনো মানুষের স্থায়ী সম্পত্তি নয়।

আজ যে মানুষটি নিজের ঘরে নিরাপদ, আগামীকাল সে-ই হয়তো যুদ্ধ, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, রাজনৈতিক সংঘাত কিংবা জলবায়ু দুর্যোগে ঘরহারা হতে পারে। আজ যে সীমান্তের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে আমরা ‘অন্য’ বলে মনে করছি, কাল হয়তো সেই আমরাই কোনো অচেনা মানুষের দরজায় আশ্রয় চাইব।

তাই বাস্তুচ্যুতি কোনো নির্দিষ্ট জাতি, ধর্ম বা দেশের সমস্যা নয়। এটি মানুষের একটি সার্বজনীন দুর্বলতা। আজ সে, কাল আমিএই উপলব্ধিই আমাদের মানবিক করে তুলতে পারে।

সমাধানও অসম্ভব নয়। পৃথিবীর রাষ্ট্রগুলোকে নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের পথ বাড়াতে হবেমানবিক ভিসা, বৈধ শ্রমের সুযোগ এবং সুরক্ষিত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। বাস্তুচ্যুত মানুষের পরিচয় ও আইনগত অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে নির্যাতনের শিকার হলে তারা পুলিশের কাছে যেতে পারে, মজুরি দাবি করতে পারে এবং ভয় ছাড়াই ন্যায়বিচার চাইতে পারে। স্থানীয় ও অভিবাসী শ্রমিকসবার জন্য সমান শ্রম অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। গোপন নিয়োগ-ফি, ঋণের ফাঁদ এবং মজুরি আত্মসাতের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

এসব কোনো দয়া নয়। এগুলো মানুষের ন্যায্য অধিকার।

একজন বিশ্ব-নাগরিক ও শান্তির কর্মী হিসেবে আমি মনে করি, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে একজন নিরপরাধ মানুষ যখন শুধু বেঁচে থাকার জন্য ঘর ছাড়তে বাধ্য হন, তখন তার কষ্ট থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখার অধিকার আমাদের নেই। মানবতার প্রতি দায়িত্বের কোনো ভৌগোলিক সীমান্ত নেই। শান্তির কথাও তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা কেবল সম্মেলনের মঞ্চে উচ্চারিত শব্দ না হয়ে অসহায় মানুষের জীবনে নিরাপত্তা ও মর্যাদা ফিরিয়ে আনে।

আমি বিশ্বাস করি, মানুষের জন্য ভালো কিছু করা কোনো দয়া প্রদর্শন নয়; এটি আমাদের মানবিক দায়িত্ব। একজন মানুষের জীবনকে একটু নিরাপদ করা, একটি শিশুর ভবিষ্যৎকে একটু আশাবাদী করা, একজন উদ্বাস্তুকে একটু সম্মান দেওয়াএসবই বিশ্বশান্তির বৃহৎ যাত্রার ছোট ছোট পদক্ষেপ।

আমরা হয়তো একা পৃথিবী বদলে দিতে পারব না। কিন্তু পৃথিবীর কোথাও একজন মানুষের কষ্টকে নিজের কষ্ট বলে অনুভব করতে পারি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারি। মানবতার পক্ষে দাঁড়াতে পারি। কারণ শান্তি শুধু যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয়শান্তি হলো এমন একটি পৃথিবী, যেখানে কোনো মানুষকে বেঁচে থাকার অপরাধে ঘরছাড়া হতে হয় না।

শেষ পর্যন্ত আমাদের মনে রাখতে হবে

বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা কোনো অপরাধ নয়।

নিরাপত্তার সন্ধান কোনো অপরাধ নয়।

মানবিক মর্যাদা চাওয়া কোনো অপরাধ নয়।

এটাই মানুষের চিরন্তন স্পন্দন। আর সেই স্পন্দনের পাশে দাঁড়ানোই আমার কাছে একজন বিশ্ব-নাগরিক ও শান্তিকর্মী হিসেবে দায়িত্ব।

লেখক: প্রকৌশলী ও কলামিস্ট

ডেইলি-বাংলাদেশ/এম এ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!