ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ মতামত ]

শিশুর চারপাশের পরিবেশই তার জীবনের সিলেবাস 

দীপু মাহমুদ 
প্রকাশিত: ১১:১৯, ২৪ আগস্ট ২০২৬
শিশুর চারপাশের পরিবেশই তার জীবনের সিলেবাস 
শিশুকে শুধু ভবিষ্যতের মানুষ হিসেবে নয়, আজকের মানুষ হিসেবেও সম্মান করতে হবে। কারণ আমরা আজ যে পৃথিবীটি শিশুদের দিচ্ছি, আগামী দিনে তারা সেই পৃথিবীটিই আরও বড় করে আমাদের ফিরিয়ে দেবে। 

একজন শিশু স্কুল থেকে ফিরে ব্যাগটা ছুড়ে রেখে বলল, ‘আজ আমি মাঠে খেলব।’ মা বললেন, ‘না, আগে পড়তে বসো।’ বাবা বললেন, ‘কাল পরীক্ষা আছে।’ তারপর শিক্ষককে ফোন করে জানা গেল, পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য আরও কিছু পড়া বাকি। সন্ধ্যায় তাকে ইংরেজির শিক্ষক পড়ালেন, রাতে গণিত। মাঝখানে খানিকটা সময় পেলেও সে মুঠোফোনের পর্দায় চলে গেল। মাঠে যাওয়া হলো না। বন্ধুর সঙ্গে কথা বলা হলো না। গাছের নিচে বসে থাকা হলো না। নিজের মতো করে কোনো প্রশ্ন নিয়ে ভাবার সময়ও হলো না। 

এখানে কোনো বড় অপরাধ ঘটেনি। মা-বাবা সন্তানের ভালোই চেয়েছেন। শিক্ষকও দায়িত্ব পালন করেছেন। শিশুও হয়তো পরীক্ষায় ভালো করবে। কিন্তু দিনের শেষে একটি প্রশ্ন থেকে যায়—শিশুর নিজের দিনটি কোথায়? 

শিশুর জীবন নিয়ে আমাদের এই প্রশ্নটিই নতুন করে ভাবতে হবে। 
ইতালীয় চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা-দার্শনিক মারিয়া মনতেসেরি The Secret of Childhood বইয়ে শিশুর বিকাশ নিয়ে যে গভীর ভাবনা সামনে এনেছিলেন, তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— "শিশুকে বড়দের হাতে গড়ে তোলা কোনো নিষ্ক্রিয় বস্তু হিসেবে দেখা যাবে না। শিশুর নিজেরও একটি সক্রিয় মন আছে; সে দেখে, শোনে, প্রশ্ন করে, সিদ্ধান্ত নেয়, পরিবেশ থেকে শেখে এবং ধীরে ধীরে নিজের ব্যক্তিত্ব নির্মাণ করে।" 

Advertisement

শিশুর নিজের মতো করে ভাবা, মত প্রকাশ করা, পছন্দ ও সিদ্ধান্ত জানানোর এবং নিজের জীবন ও চারপাশের জগতে অর্থপূর্ণ ভূমিকা রাখার এই ক্ষমতাকে আমরা সহজ ভাষায় বলতে পারি—নিজের চিন্তা ও বিবেচনা দিয়ে নিজের জীবনে ভূমিকা রাখার সক্ষমতা। 

শিশুর এই সক্ষমতা মানে তাকে সব সিদ্ধান্ত একা নিতে দেওয়া নয়। আবার তার হয়ে সব সিদ্ধান্তও বড়রা নেবেন না। বরং বয়স ও সক্ষমতা অনুযায়ী তাকে প্রশ্ন করতে, মত দিতে, পছন্দ করতে, ভুল করতে, ভুল থেকে শিখতে এবং নিজের সিদ্ধান্তের পরিণতি বুঝতে শেখানো। এই জায়গাটিই আমাদের পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজে সবচেয়ে বেশি সংকুচিত হয়ে আসছে। আমরা শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়ে এত ব্যস্ত যে তার বর্তমান জীবনটি প্রায় ভুলে যাচ্ছি। 

শিশু কত নম্বর পেল, কোন স্কুলে পড়ল, কতটা ইংরেজি বলতে পারে, কোন কোচিংয়ে যায়, ভবিষ্যতে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে—এসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু সে কী ভাবছে, কী নিয়ে আনন্দ পাচ্ছে, কোন অন্যায় তাকে কষ্ট দিচ্ছে, কোন বই তাকে বদলে দিচ্ছে, কোন মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চাইছে, সে পৃথিবীকে কীভাবে দেখতে শিখছে—এসব প্রশ্ন অনেক সময় আমাদের কাছে গৌণ। 

Early childhood education in disadvantaged areas to receive better  financial aid

শিশুকে আমরা মানুষ হিসেবে দেখার চেয়ে ‘ভবিষ্যতের মানবসম্পদ’ হিসেবে দেখতে বেশি অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি!
এখানেই বিপদ। কারণ মানুষ কেবল দক্ষতা দিয়ে তৈরি হয় না; মানুষ তৈরি হয় চিন্তা, কল্পনা, নৈতিকতা, সহমর্মিতা, সৌন্দর্যবোধ, যুক্তি ও স্বাধীন বিবেচনার মধ্য দিয়ে। 

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক শিশু পরিস্থিতির দিকে তাকালে উদ্বেগের কারণ আরও স্পষ্ট হয়। ২০২৫ সালের বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে অনুযায়ী, ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মাত্র ৫০.২ শতাংশের foundational reading skill এবং ৩৯.২ শতাংশের foundational numeracy skill আছে। অর্থাৎ স্কুলে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; শিশু কী শিখছে, কীভাবে শিখছে এবং সেই শেখা তাকে চিন্তা করার ক্ষমতা কতটা দিচ্ছে—সেটিও দেখতে হবে। 

আরও বড় উদ্বেগ সহিংস শাসন। একই জরিপে দেখা গেছে, ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৮৫.৭ শতাংশ শিশু গত এক মাসে কোনো না কোনো ধরনের violent discipline বা সহিংস শাসনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। 

যে শিশুকে নিয়মিত বলা হয়—‘চুপ করো’, ‘বড়দের কথার উত্তর দেবে না’, ‘তুমি কী বোঝো’, ‘আমি তোমার ভালোর জন্যই করছি’—তার নিজের মত প্রকাশের আত্মবিশ্বাস কীভাবে তৈরি হবে? 

শিশুকে নিয়ন্ত্রণ করা আর শিশুকে পথ দেখানো এক বিষয় নয়। শাসন আর অপমান এক বিষয় নয়। ভালোবাসা আর শিশুর হয়ে সব সিদ্ধান্ত নেওয়াও এক বিষয় নয়। আমাদের এই পার্থক্যগুলো শেখার সময় এসেছে। 

কারণ শিশুর চারপাশের পৃথিবীও আগের মতো নেই। একসময় শিশুর পৃথিবী ছিল পরিবার, উঠান, পাড়া, মাঠ, নদী, গাছ, বন্ধু, গল্পের বই ও বিদ্যালয়। এখন সেই পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইউটিউব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেম, অ্যালগরিদম, অসংখ্য অচেনা মানুষের মতামত এবং মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিও। 

২০২৫ সালে UNICEF Bangladesh-এর প্রায় ২৯ হাজার তরুণের U-Report জরিপে দুই-তৃতীয়াংশ উত্তরদাতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে misinformation ও fake news-কে সবচেয়ে বড় stressor হিসেবে উল্লেখ করেছেন। bullying, negative comments এবং harmful content-ও বড় উদ্বেগ হিসেবে উঠে এসেছে। 

অর্থাৎ শিশুর চিন্তার জগৎ এখন শুধু পরিবারের হাতে নেই। তার একটি বড় অংশ এমন একটি ডিজিটাল পরিবেশে তৈরি হচ্ছে, যার নিয়ম শিশুর প্রয়োজনের চেয়ে ব্যবসায়িক ও সামাজিক উত্তেজনার দ্বারা অনেক সময় বেশি নিয়ন্ত্রিত। 

What is Education environment? Meaning, Definition.

এই বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের সংকট। একজন শিশু কোনো রাজনৈতিক বিশ্বাস নিয়ে জন্মায় না। সে প্রথমে পৃথিবীকে চিনতে শেখে তার চারপাশের মানুষের চোখ দিয়ে। পরিবারে বড়রা কী বলেন, টেলিভিশনে কী দেখে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কী দেখে, স্কুলে ইতিহাস কীভাবে পড়ানো হয়—সব মিলিয়েই তার দেশ, সমাজ, মানুষ ও ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয়। তাই ইতিহাসের বই বদলানো শুধু কয়েকটি অধ্যায় বা কয়েকজন ব্যক্তির নাম বদলানো নয়। এর সঙ্গে শিশুর অতীত বোঝার কাঠামোটিও বদলে যায়। 

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাঠ্যপুস্তকের ইতিহাস ও রাজনৈতিক বয়ানে ধারাবাহিক পরিবর্তন আমরা দেখেছি। একটি সরকারের সময়ে যে বয়ান গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে, অন্য সময়ে তার কিছু অংশ বাদ গেছে বা নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। 

এই পরিবর্তন যদি প্রমাণ, গবেষণা ও ইতিহাসবিদদের বিতর্কের ভিত্তিতে হয়, তা স্বাভাবিক। কিন্তু ইতিহাস যদি ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে পাল্টাতে থাকে, তাহলে শিশুর কাছে ইতিহাস সত্য অনুসন্ধানের বিষয় না হয়ে ক্ষমতার বয়ান হয়ে ওঠে। 

শিশুকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মত শেখানো নয়; বরং তাকে এমন জ্ঞান ও চিন্তার সরঞ্জাম দেওয়া দরকার, যাতে সে নিজে প্রশ্ন করতে পারে, প্রমাণ যাচাই করতে পারে, ভিন্ন মত শুনতে পারে এবং নিজের সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে। 

এখানেই শিক্ষা আর প্রচারণার মধ্যে পার্থক্য। আমাদের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলোর একটিও শিশুদের এই সংকটের কথা মনে করিয়ে দেয়। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংসতায় বহু শিশু নিহত ও আহত হয়েছে। UNICEF প্রথম পর্যায়ে অন্তত ৩২ জন শিশুর নিহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছিল। পরে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের অনুসন্ধান নিয়ে UNICEF জানায়, ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে নিহত প্রায় ১,৪০০ মানুষের মধ্যে শতাধিক শিশু ছিল। 

একটি সমাজের রাজনৈতিক সংঘাত যখন শিশুর জীবন পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তখন তার ক্ষতি শুধু শরীরে সীমাবদ্ধ থাকে না। ভয়, নিরাপত্তাহীনতা, সহিংসতার দৃশ্য, প্রিয়জন হারানো এবং বড়দের আচরণ—সবকিছু শিশুর পৃথিবী সম্পর্কে ধারণা বদলে দিতে পারে। 

আমরা প্রায়ই বলি, ‘শিশুরাই দেশের ভবিষ্যৎ।’ কথাটি এত বেশি বলা হয়েছে যে এর ভেতরের অর্থ প্রায় হারিয়ে গেছে। বরং বলা দরকার— শিশুরা দেশের বর্তমান। 

আজ যে শিশু অন্যায় দেখে বড় হচ্ছে, কাল সে কেমন নাগরিক হবে, তার উত্তর অনেকটাই নির্ভর করে আজ আমরা তার সামনে কোন পৃথিবী তৈরি করছি তার ওপর। 

শিশু তার চারপাশ থেকে শুধু ভালো আচরণ শেখে না; ক্ষমতার ব্যবহারও শেখে। সে দেখে, কে কাকে ভয় দেখায়, কে কাকে অপমান করে, কে নিয়ম ভাঙলেও পার পেয়ে যায়, কে সত্য বলেও বিপদে পড়ে, আর কে তোষামোদ করে সুবিধা পায়। 

আমাদের সমাজে এই নীরব পাঠ্যপুস্তকটি অনেক সময় অত্যন্ত বিপজ্জনক। রাস্তায়, বাজারে, বাসে, ট্রেনে, অফিসে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কিংবা রাজনীতিতে শিশু যদি বারবার দেখে শক্তিই শেষ কথা, তাহলে তার কাছে সহযোগিতার চেয়ে প্রতিযোগিতা, যুক্তির চেয়ে জোর এবং ন্যায়ের চেয়ে ক্ষমতা বেশি কার্যকর বলে মনে হতে পারে। 

এই কারণেই কিশোরদের কোনো সহিংস ঘটনা ঘটলে শুধু ‘কিশোর অপরাধ’ বলে বিষয়টি শেষ করা যাবে না। অবশ্যই অপরাধের দায় আছে এবং আইনগত জবাবদিহি প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে দেখতে হবে—তারা কোন সামাজিক পরিবেশ থেকে এসেছে? বড়রা তাদের সামনে বিরোধ মীমাংসার কী ভাষা ব্যবহার করেছেন? বিদ্যালয়ে তারা কি যুক্তি ও আলোচনার সংস্কৃতি পেয়েছে, নাকি ভয় ও আনুগত্যের সংস্কৃতি? 

শিশু যে পরিবেশ পায়, সেটিই তার নীরব পাঠ্যপুস্তক এবং তাঁর অনাগত ভবিষ্যতের ভিত্তি গড়ার সিলেবাস। এই নীরব পাঠ্যপুস্তকের বা সিলেবাসের আরেকটি বড় অধ্যায় হলো শহর-গ্রামের বৈষম্য। 

Creating inclusive learning environments and empowering young children |  Lillio

শহরের একজন শিশু হয়তো লাইব্রেরি, জাদুঘর, পার্ক, সংগীত, নাটক, খেলাধুলা, ভালো ইন্টারনেট, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নানা ধরনের শেখার সুযোগের কাছাকাছি থাকে। গ্রামের বা প্রান্তিক এলাকার একজন শিশুর জন্য একই সুযোগ অনেক দূরের ব্যাপার। 

২০২৫ সালের জাতীয় Multidimensional Poverty Index-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ২৮.৯ শতাংশ শিশু বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করে। অর্থাৎ শিশুর দারিদ্র্য শুধু পরিবারের আয় কম হওয়া নয়; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবনযাপনের পরিবেশসহ নানা ক্ষেত্রে একসঙ্গে বঞ্চিত হওয়া। 

তাই সবার হাতে একই পাঠ্যবই তুলে দিলেই সমান শৈশব তৈরি হয় না। এক শিশু বড় হয় সুযোগের মধ্যে, অন্য শিশু বড় হয় সুযোগের অভাবে। এর প্রভাব তার আত্মপরিচয়েও পড়ে। শহর-গ্রামের বিভাজন কারও মধ্যে অহংকার তৈরি করতে পারে, কারও মধ্যে হীনম্মন্যতা। 

আবার শহরের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের অনেক শিশুর শৈশবও অন্য ধরনের চাপে সংকুচিত হচ্ছে। সেখানে অভাব নেই, কিন্তু অবসর নেই। 

খেলার সময় নেই, কারণ কোচিং আছে। গল্পের বই নেই, কারণ পরীক্ষার প্রস্তুতি আছে। মাঠ নেই, কারণ শহরে জায়গা নেই। গাছের নিচে বসে থাকার সময় নেই, কারণ সময়সূচি ঠাসা। শিশুর নিজের পছন্দ নেই, কারণ তার ভবিষ্যৎ নিয়ে বড়দের পরিকল্পনা আগে থেকেই তৈরি। 

কবি জয় গোস্বামীর ‘টিউটোরিয়াল’ কবিতায় এই প্রতিযোগিতাময় শৈশবের নির্মম চিত্র পাওয়া যায়—‘কারও অধিকার নেই দ্বিতীয় হওয়ার।’ আমরা যেন সন্তানদের জীবনেও সেই একই নিয়ম চালু করেছি।
প্রথম হতে হবে।
সবার আগে হতে হবে।
অন্যকে পেছনে ফেলতে হবে।
কিন্তু জীবন কি একটি পরীক্ষার খাতা? 

শিশুকে ভালো ফলাফল করতে উৎসাহ দেওয়া অবশ্যই দরকার। কিন্তু ভালো ফলাফল যেন ভালো মানুষ হওয়ার বিপরীতে দাঁড়িয়ে না যায়। ইংরেজি শেখা দরকার, কিন্তু নিজের ভাষায় ভাবতে শেখাও দরকার। প্রযুক্তি জানা দরকার, কিন্তু প্রযুক্তির বাইরে পৃথিবীকে অনুভব করাও দরকার। ভবিষ্যতের চাকরির প্রস্তুতি দরকার, কিন্তু অন্যায়কে অন্যায় বলে চেনার ক্ষমতাও দরকার। 

শিশুর জন্য তাই শুধু ভালো স্কুল যথেষ্ট নয়। তার দরকার নিরাপদ বাড়ি, নিরাপদ বিদ্যালয়, খেলার মাঠ, বই, প্রকৃতি, বন্ধুত্ব, শিল্প, প্রশ্ন করার স্বাধীনতা এবং এমন বড় মানুষ যারা তার কথা শুনবেন। 

প্রকৃতির সঙ্গে শিশুর সম্পর্কও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর স্বাভাবিক কৌতূহল তাকে গাছ, পাখি, মাটি, পানি, প্রাণী ও ঋতুর সঙ্গে পরিচিত করে। কিন্তু শহুরে জীবন, অতিরিক্ত স্ক্রিন-নির্ভরতা এবং সময়ের সংকট ধীরে ধীরে সেই সম্পর্ককে দুর্বল করছে। অথচ UNICEF-এর গবেষণা ও নীতিগত আলোচনায় নগর সবুজ এলাকা শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। 

শিশুকে শুধু স্ক্রিন থেকে দূরে রাখলেই হবে না; তাকে বিকল্প পৃথিবীও দিতে হবে।  
একটি মাঠ দিতে হবে।
একটি গাছ দিতে হবে।
একটি লাইব্রেরি দিতে হবে।
একটি নিরাপদ পাড়া দিতে হবে।
একটি প্রশ্ন করার জায়গা দিতে হবে।
আর দিতে হবে এমন বড় মানুষ, যিনি শিশুর কথা শেষ পর্যন্ত শুনবেন। 

মনতেসেরির চিন্তার বড় শিক্ষা এখানেই—শিশুকে বদলাতে চাইলে শুধু শিশুকে নিয়ে কাজ করলে হবে না। বদলাতে হবে শিশুর চারপাশের পরিবেশকে। 

এই দায়িত্ব প্রথমে পরিবারের। অভিভাবকের দায়িত্ব সন্তানকে নিজের অসম্পূর্ণ স্বপ্ন পূরণের প্রকল্পে পরিণত না করা। শিক্ষককে শুধু পাঠ শেষ করা নয়, প্রশ্নের জায়গা তৈরি করতে হবে। বিদ্যালয়কে শুধু পরীক্ষার ফল নয়, যুক্তি, সহমর্মিতা, শিল্প, খেলাধুলা ও নাগরিকতার চর্চার জায়গা হতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে ইতিহাসকে রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতিয়ার না বানিয়ে প্রমাণ, গবেষণা, বিতর্ক ও বহুমাত্রিকতার জায়গা তৈরি করতে হবে। গণমাধ্যমকে শিশুর সামনে কী ধরনের পৃথিবী হাজির করছে, সে ব্যাপারে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। 

আর রাষ্ট্রকে শিশুদের নিয়ে নীতি করার সময় শিশুদেরই কথা শুনতে হবে। এখানে আশার জায়গাও আছে। ২০২৬ সালে UNICEF Bangladesh শিশু ও তরুণদের সঙ্গে পরামর্শ করে একটি Child Rights Manifesto তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন পরামর্শে শিশু ও তরুণদের মতামত নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য শিশু অধিকারকেন্দ্রিক অঙ্গীকার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগের গুরুত্ব এখানেই—শিশুকে শুধু সুরক্ষা পাওয়ার মানুষ হিসেবে নয়, সমাজের অংশীজন হিসেবেও দেখা। 

How Can Kids Help the Environment?

শিশুর কথা শুনতে হবে। তার মতের সঙ্গে একমত হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু তার মত প্রকাশের অধিকারকে সম্মান করা জরুরি। কারণ শিশুর নিজের চিন্তা, মত, পছন্দ ও সিদ্ধান্তের ক্ষমতা মানে শিশুকে বড়দের প্রতিপক্ষ বানানো নয়। বরং তাকে ধীরে ধীরে এমন একজন মানুষ হতে সাহায্য করা, যে নিজের চিন্তা দিয়ে পৃথিবীকে বুঝতে পারে এবং নিজের বিবেচনা দিয়ে পৃথিবীতে ভালো কিছু করার চেষ্টা করতে পারে। 

আমরা যতদিন শিশুকে ‘আমাদের সন্তান’ বলব কিন্তু ‘নিজস্ব অধিকারসম্পন্ন মানুষ’ হিসেবে দেখব না, ততদিন তার হয়ে সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা থাকবে। আমরা তার হয়ে স্বপ্ন দেখব, তার হয়ে ইতিহাস ব্যাখ্যা করব, তার হয়ে সত্য নির্ধারণ করব, তার হয়ে ভবিষ্যৎ বেছে দেব।

শেষ পর্যন্ত হয়তো তার হয়ে জীবনটিও বেছে দেব। কিন্তু মানুষকে এভাবে তৈরি করা যায় না। শিশুকে সব সিদ্ধান্ত একা নিতে দেওয়া যেমন দায়িত্বশীলতা নয়, তেমনি তার কাছ থেকে সব সিদ্ধান্ত কেড়ে নেওয়াও শিক্ষা নয়। বড়দের দায়িত্ব হলো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে শিশু বয়স ও সক্ষমতা অনুযায়ী নিজের চিন্তা, পছন্দ, দায়িত্ববোধ ও নৈতিক শক্তি ধীরে ধীরে গড়ে তুলতে পারে। 

শিশুকে শুধু ভবিষ্যতের মানুষ হিসেবে নয়, আজকের মানুষ হিসেবেও সম্মান করতে হবে। কারণ আমরা আজ যে পৃথিবীটি শিশুদের দিচ্ছি, আগামী দিনে তারা সেই পৃথিবীটিই আরও বড় করে আমাদের ফিরিয়ে দেবে। 

তাই প্রশ্ন শুধু এই নয়—আমরা শিশুদের জন্য কী রেখে যাচ্ছি? 
আরও জরুরি প্রশ্ন হলো— আমরা আজ শিশুদের মধ্যে কেমন মানুষ তৈরি করছি? সেই প্রশ্নের উত্তরই আসলে আমাদের আগামী বাংলাদেশের উত্তর।

লেখক : দীপু মাহমুদ, সমাজ চিন্তক, শিশু-কিশোর বিষয়ক লেখক ও কথাসাহিত্যিক

ডেইলি-বাংলাদেশ/এস এম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!