ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ মতামত ]

আমরা কি পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ফিরে যাচ্ছি

রহমান মৃধা
প্রকাশিত: ১১:৫৩, ২৫ আগস্ট ২০২৬
আমরা কি পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ফিরে যাচ্ছি
আজ যদি আমরা সত্যিই নতুন জাগরণ চাই, তাহলে প্রথমে আমাদের নিজেদের কাছে একটি প্রশ্ন করতে হবে: আমি কি শুধু অন্যের অন্যায়ের বিরুদ্ধে, নাকি নিজের সুবিধার বিরুদ্ধেও সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে প্রস্তুত? এই প্রশ্নের উত্তরই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

একটি জাতি যখন দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়া এবং গণতন্ত্রের সংকটের মধ্য দিয়ে পথ চলে, তখন একসময় মানুষের ভেতরে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা জমতে থাকে। বাংলাদেশও সেই জমে থাকা ক্ষোভ ও আকাঙ্ক্ষার বিস্ফোরণ দেখেছে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে। কিন্তু সেই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল, আমরা কি শুধু একটি সরকার পরিবর্তন করব, নাকি রাষ্ট্রের চরিত্রও পরিবর্তন করব?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই জুলাই জাতীয় সনদ সামনে আসে। দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, পুলিশ, দুর্নীতি দমন, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং জবাবদিহি নিয়ে সংস্কারের একটি রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে ওঠে। ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জুলাই সনদ স্বাক্ষরিত হয়। পরে এর সংস্কার প্রস্তাব জনগণের সামনে গণভোটে দেওয়া হয়।

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সেই গণভোটে জনগণ জুলাই সনদের সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে রায় দেয়। আন্তর্জাতিক IDEA-এর বিশ্লেষণেও গণভোটটিকে বাংলাদেশের পরবর্তী সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

Advertisement

তাহলে আজ প্রশ্নটি খুবই সরল: জনগণ যদি রায় দেয়, রাজনৈতিক দলগুলো যদি সংস্কারের অঙ্গীকার করে এবং সেই রায় বাস্তবায়নের জন্য একটি কাঠামোও নির্ধারণ করা হয়, তাহলে সেই রায় বাস্তবায়নের পথে এত জটিলতা, বিরোধ ও বিলম্ব কেন? 

গণতন্ত্রে জনগণের ভোট কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়। ভোট হচ্ছে জনগণের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রকে দেওয়া একটি ম্যান্ডেট। আর গণভোটে জনগণ কোনো নির্দিষ্ট প্রশ্নে সরাসরি মত প্রকাশ করে। সেই মতকে পরে রাজনৈতিক সুবিধা-অসুবিধার হিসাবের মধ্যে আটকে রাখা হলে গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হয়।

এখানেই আমাদের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি করতে হবে: জনগণের রায় যদি রাজনৈতিক দল নিজেদের সুবিধামতো গ্রহণ করে, তাহলে গণভোটের অর্থ কী?

জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে চলমান বিরোধকে শুধু আইনি বা সাংবিধানিক পদ্ধতির বিতর্ক হিসেবে দেখলে সমস্যাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়ে যায়। কারণ একদিকে রয়েছে সংবিধানের বিদ্যমান কাঠামো ও সংসদের আইনগত কর্তৃত্বের প্রশ্ন, অন্যদিকে রয়েছে গণভোটের মাধ্যমে প্রকাশিত জনগণের রাজনৈতিক ম্যান্ডেট। এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় কীভাবে হবে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। 

সরকারে পক্ষ থেকে সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সাংবিধানিক সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর একটি অংশ গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত সংস্কার কাউন্সিলের প্রক্রিয়া অনুসরণের দাবি জানিয়ে আসছে। ফলে সংস্কার বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ এখনো পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি।

কিন্তু জনগণ কি এই অচলাবস্থার জন্য ভোট দিয়েছিল? না। মানুষ ভোট দিয়েছিল পরিবর্তনের আশায়। সুতরাং আজকের প্রশ্ন কোনো একটি দলকে অভিযুক্ত করার জন্য নয়। প্রশ্নটি রাষ্ট্রের কাছে, রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে এবং একই সঙ্গে আমাদের নিজেদের কাছেও। আমরা কি আবারও সেই পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ফিরে যাচ্ছি, যেখানে নির্বাচনের আগে জনগণ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু নির্বাচনের পরে জনগণের রায় রাজনৈতিক হিসাবের কাছে গৌণ হয়ে যায়?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের আজকের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনটির দিকেও তাকাতে হবে। ২০ আগস্ট ২০২৬, ৩৫ বছর পর বাংলাদেশে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু নির্বাচনের আগেই বিএনপির চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি স্পষ্ট করে বলেছেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ বহাল থাকায় কোনো সংসদ সদস্য দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তাঁর সংসদ সদস্য পদ থাকবে না।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। বিএনপি নতুন কোনো আইন তৈরি করে এই বিধান চাপিয়ে দেয়নি। এটি বর্তমান সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদেরই কার্যকারিতা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জুলাই সনদের যে সংস্কারের জন্য জনগণ গণভোটে রায় দিয়েছিল, সেই সংস্কারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই যদি সংসদ সদস্যের স্বাধীন মতপ্রকাশ ও দলীয় নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন হয়, তাহলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনে আমরা পুরোনো ব্যবস্থাই কেন বহাল রাখছি? জুলাই সনদের প্রস্তাবিত সংস্কারের মধ্যে ৭০ অনুচ্ছেদ পরিবর্তনের বিষয় ছিল। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গোপন ব্যালটে ভোট দেওয়ার প্রস্তাবও ছিল।

আজ যদি জুলাই সনদের সেই সংস্কার কার্যকর থাকত, তাহলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একজন সংসদ সদস্য হয়তো শুধু দলের নির্দেশ অনুসরণকারী ভোটার হয়ে থাকতেন না। তিনি নিজের বিবেক, রাজনৈতিক বিচারবোধ এবং জনগণের প্রতি দায়িত্ব বিবেচনা করে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেতেন। তাহলে জাতি কী দেখতে পেত? হয়তো একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা। হয়তো সংসদ সদস্য প্রথমবারের মতো অনুভব করতেন, তাঁর ভোট শুধু দলের নয়, তাঁর নিজেরও। হয়তো নতুন প্রজন্ম দেখতে পেত, রাজনীতি মানে অন্ধ আনুগত্য নয়, রাজনীতি মানে বিবেক, স্বাধীন চিন্তা এবং জনগণের প্রতি জবাবদিহি। হয়তো জুলাইয়ের জাগরণ একটি বাস্তব প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নতুন অর্থ পেত।

কিন্তু তার বদলে আমরা কী দেখছি? নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতির পরও পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান এখনো কার্যকর, এবং সেই বিধানের ভিত্তিতে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দেওয়ার স্বাধীনতা একজন সংসদ সদস্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে আছে। এখানেই প্রশ্নটি আরও তীব্র হয়ে ওঠে: তাহলে জুলাইয়ের এত রক্ত, এত ত্যাগ, এত প্রত্যাশা, এত রাজনৈতিক অঙ্গীকারের পর আমরা কি সত্যিই নতুনের পথে হাঁটছি, নাকি পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই নতুন মোড়কে ফিরে যাচ্ছি?

এখানেই “জাতির সঙ্গে প্রতারণা” শব্দটি সামনে আসে। প্রতারণা শুধু তখনই হয় না, যখন কাউকে সরাসরি মিথ্যা বলা হয়। প্রতারণা তখনও ঘটে, যখন মানুষের সামনে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি করা হয়, জনগণের কাছ থেকে ম্যান্ডেট নেওয়া হয়, কিন্তু সেই ম্যান্ডেট বাস্তবায়নের সময় রাজনৈতিক স্বার্থ, ক্ষমতার হিসাব কিংবা পারস্পরিক বিরোধ সামনে চলে আসে।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। জুলাই সনদের সংস্কার বাস্তবায়নের সাংবিধানিক পদ্ধতি নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আইন ও সংবিধানের মধ্যে সামঞ্জস্য, সংসদের ক্ষমতা এবং গণভোটের রাজনৈতিক ম্যান্ডেট কীভাবে একসঙ্গে কার্যকর হবে, তা নিয়ে বাস্তব আইনি ও রাজনৈতিক প্রশ্ন রয়েছে। কিন্তু আইনি প্রশ্ন থাকা আর রাজনৈতিক দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাওয়া এক বিষয় নয়। বরং এখানেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরীক্ষা। আইনের পথ খুঁজে জনগণের ম্যান্ডেট বাস্তবায়ন করা হবে, নাকি আইনের জটিলতাকে সামনে রেখে সেই ম্যান্ডেটকে অনির্দিষ্টকাল পিছিয়ে দেওয়া হবে?

গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য এখানেই, আইন ও জনগণের ইচ্ছার মধ্যে সংঘাত তৈরি হলে সেই সংঘাতের একটি বৈধ, স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক সমাধান খুঁজে বের করতে হয়। জনগণের রায়কে অস্বীকার করাও সমাধান নয়, আবার সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়েও টেকসই সংস্কার সম্ভব নয়। তাই প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। প্রয়োজন সমঝোতা। প্রয়োজন জনগণের প্রতি জবাবদিহি।

কিন্তু এখানেই আমাদের আরেকটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি হতে হবে। রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক একমুখী নয়। আমরা কি সত্যিই গণতন্ত্র চাই? নাকি আমরা শুধু চাই, আমাদের পছন্দের দল ক্ষমতায় থাকুক? আমরা কি দুর্নীতির বিরুদ্ধে? নাকি অন্যের দুর্নীতি আমাদের ক্ষতি করলে আমরা তার বিরুদ্ধে, আর নিজের স্বার্থে সুবিধা পেলে সেটিকে মেনে নিই? আমরা কি আইনের শাসন চাই? নাকি আইনটি আমার পক্ষে থাকলেই সেটিকে ভালো আইন মনে করি? আমরা কি সত্য চাই? নাকি সত্য তখনই গ্রহণ করি, যখন সেটি আমার রাজনৈতিক বিশ্বাসকে সমর্থন করে?

এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে গেলে বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক সংস্কারই দীর্ঘস্থায়ী হবে না। কারণ রাষ্ট্রের সংকট শুধু রাষ্ট্রে তৈরি হয় না। সমাজের মধ্যেও তার শিকড় থাকে।

আজ বাংলাদেশের দুর্নীতির পরিস্থিতি সেই সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি। Transparency International-এর ২০২৫ সালের Corruption Perceptions Index-এ বাংলাদেশের স্কোর ২৪, ১৮২টি দেশের মধ্যে অবস্থান ১৫০। আগের বছরের তুলনায় সামান্য উন্নতি হলেও দেশটি এখনো বৈশ্বিক গড়ের অনেক নিচে রয়েছে এবং দুর্নীতির ব্যাপকতা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ রয়ে গেছে।

তাহলে কি বাংলাদেশের মানুষ সত্য থেকে বহু দূরে সরে গেছে? আমি তা বলব না। বরং সত্যটি আরও গভীর। মানুষের মধ্যে সত্যের আকাঙ্ক্ষা এখনো আছে, কিন্তু সত্যের পক্ষে ধারাবাহিকভাবে দাঁড়ানোর সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে গেছে।

আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলি, কিন্তু অনেক সময় নিজের সুবিধার জন্য অন্যায়ের সঙ্গে আপস করি। আমরা দুর্নীতিকে গালি দিই, কিন্তু নিজের কাজ দ্রুত করানোর জন্য ঘুষ দেওয়াকে “বাস্তবতা” বলে মেনে নিই। আমরা রাজনৈতিক নেতাদের পরিবারতন্ত্রের সমালোচনা করি, অথচ নিজের দল বা নিজের লোক অন্যায় করলে তাকে রক্ষা করি। আমরা যোগ্যতার কথা বলি, আবার পরিচিতি, সুপারিশ ও ক্ষমতার কাছে যোগ্যতাকে বিসর্জন দিই।

এভাবেই একটি সমাজ ধীরে ধীরে অন্ধকারে ঢুকে যায়। অন্ধকার সবসময় হঠাৎ আসে না। কখনো কখনো মানুষ প্রতিদিন একটু একটু করে আলো থেকে দূরে সরে যায়। একটি মিথ্যা মেনে নেওয়া, একটি অন্যায় দেখে চুপ থাকা, একটি ঘুষকে স্বাভাবিক মনে করা, একজন অযোগ্য মানুষকে শুধু নিজের লোক বলে সমর্থন করা, একটি রাজনৈতিক দলের অন্যায়কে “আমাদের দল” বলে ক্ষমা করে দেওয়া, এই ছোট ছোট আপসগুলোই একদিন একটি বড় সামাজিক অসুস্থতার জন্ম দেয়।

তাই বাংলাদেশের সংকট শুধু রাজনৈতিক নয়। এটি নৈতিকও। রাষ্ট্র দুর্নীতিগ্রস্ত হলে সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কিন্তু সমাজ যখন অন্যায়ের সঙ্গে আপস করতে শেখে, তখন রাষ্ট্রের দুর্নীতিও দীর্ঘস্থায়ী হয়।

তাহলে কি সব শেষ? না। এখানেই আমাদের আশার জায়গা। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান দেখিয়েছে যে মানুষের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা এখনো জীবিত। ২০২৬ সালের গণভোটও দেখিয়েছে যে মানুষ রাষ্ট্রের কাঠামো ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে মত প্রকাশ করতে প্রস্তুত। অর্থাৎ জনগণ পুরোপুরি অন্ধকারে হারিয়ে যায়নি।

কিন্তু একটি গণঅভ্যুত্থান কখনোই একটি জাতির স্থায়ী পরিবর্তনের নিশ্চয়তা দেয় না। একটি নির্বাচনও দেয় না। একটি গণভোটও দেয় না। পরিবর্তন স্থায়ী হয় তখনই, যখন রাজনৈতিক সংস্কারের সঙ্গে নাগরিক সংস্কারও আসে।

আমাদের তাই একটি নতুন জাগরণ দরকার। তবে নতুন জাগরণ মানে আরেকটি সরকার পতন নয়। আরেকজন নেতা এসে সবকিছু ঠিক করে দেবেন, সেটিও নয়। নতুন জাগরণ মানে মানুষের চিন্তার পরিবর্তন।

একজন নাগরিক যখন বলবেন, “আমার দল ভুল করলে আমি তার বিরোধিতা করব,” তখন জাগরণ শুরু হবে। একজন ভোটার যখন বলবেন, “আমার নেতা আমার মালিক নন, তিনি জনগণের প্রতিনিধি,” তখন জাগরণ শুরু হবে। একজন সরকারি কর্মকর্তা যখন বুঝবেন, “আমার পদ কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, এটি জনগণের আমানত,” তখন জাগরণ শুরু হবে। 

একজন ব্যবসায়ী যখন বলবেন, “ঘুষ না দিলে আমার কাজ বিলম্বিত হলেও আমি ঘুষ দেব না,” তখন জাগরণ শুরু হবে। একজন বাবা-মা যখন সন্তানকে শুধু অর্থ উপার্জনের শিক্ষা না দিয়ে সততা, দায়িত্ব ও মানবিকতার শিক্ষা দেবেন, তখন জাগরণ শুরু হবে। আর একজন তরুণ যখন বলবে, “আমি কোনো রাজনৈতিক দলের অন্ধ অনুসারী নই, আমি বাংলাদেশের নাগরিক,” তখন হয়তো সত্যিকার নতুন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হবে।

এই কারণেই জুলাই সনদের প্রশ্নটি শুধু সংবিধান সংশোধনের প্রশ্ন নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। এই সুযোগ নষ্ট করা যাবে না।

যদি বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে সাংবিধানিক সমস্যা থাকে, রাজনৈতিক দলগুলোকে বসতে হবে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতামত নিতে হবে। প্রয়োজন হলে আদালতের ব্যাখ্যা নিতে হবে। কিন্তু জনগণের রায়কে অনির্দিষ্টকাল রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যে আটকে রাখা কোনো সমাধান হতে পারে না।

প্রথম কাজ হওয়া উচিত একটি সর্বসম্মত, প্রকাশ্য এবং সময়সীমাবদ্ধ বাস্তবায়ন রোডম্যাপ তৈরি করা। কোন সংস্কার আইন দিয়ে হবে, কোনটি সাংবিধানিক সংশোধন চাইবে, কোনটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে করা সম্ভব, কোনটি কত দিনের মধ্যে বাস্তবায়িত হবে এবং কে তার জন্য দায়ী থাকবে, সবকিছু জনগণের সামনে স্পষ্ট করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, নির্দিষ্ট সময় পরপর একটি July Charter Implementation Report প্রকাশ করা যেতে পারে। কোন সংস্কার সম্পন্ন হয়েছে, কোনটি প্রক্রিয়াধীন এবং কোনটি আটকে আছে, তার কারণও জনগণকে জানাতে হবে।

তৃতীয়ত, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বিচারবিদ, নাগরিক সমাজ, তরুণ প্রজন্ম, পেশাজীবী এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের পর্যবেক্ষণের সুযোগ থাকতে হবে।

চতুর্থত, রাজনৈতিক দলগুলোকে একটি মৌলিক অঙ্গীকার করতে হবে: কোনো দল ক্ষমতায় এসে নিজের সুবিধামতো গণতান্ত্রিক সংস্কারের নিয়ম পরিবর্তন করবে না। আর পঞ্চম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি জনগণের। আমাদের নিজেদেরও বদলাতে হবে।

কারণ শুধু সংবিধান বদলালে দেশ বদলায় না। প্রতিষ্ঠান বদলালেও মানুষ যদি একই থাকে, পুরোনো সংস্কৃতি নতুন প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ফিরে আসে। আমরা যদি নতুন বাংলাদেশ চাই, তাহলে আমাদের নতুন নাগরিকও হতে হবে।

আজ তাই প্রশ্নটি শুধু সরকারের কাছে নয়। আমরা কেমন বাংলাদেশ চাই? এমন বাংলাদেশ, যেখানে ক্ষমতাসীনরা জনগণের ভোটকে ক্ষমতা অর্জনের সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করবে?

নাকি এমন বাংলাদেশ, যেখানে জনগণের ভোট ক্ষমতাসীনদের ওপর একটি বাধ্যবাধকতা তৈরি করবে? আমরা কি এমন রাষ্ট্র চাই, যেখানে নেতা বদলাবে কিন্তু ক্ষমতার সংস্কৃতি বদলাবে না? নাকি এমন রাষ্ট্র চাই, যেখানে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো আরও শক্তিশালী, স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক হবে?

আজকের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আমাদের সামনে সেই প্রশ্নটিই নতুন করে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে, ৩৫ বছর পর যা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যদি সংসদ সদস্যরা নিজের বিবেক ও বিচারবোধ অনুযায়ী ভোট দেওয়ার স্বাধীনতা না পান, যদি দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দেওয়ার অর্থ হয় সংসদ সদস্য পদ হারানোর ঝুঁকি, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই, এটি কি নতুন গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা, নাকি পুরোনো রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণেরই ধারাবাহিকতা?

আজ যদি জুলাই সনদের সংস্কার কার্যকর থাকত, যদি সংসদ সদস্যের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গোপন ভোটের প্রস্তাব বাস্তবে কার্যকর হতো, তাহলে হয়তো জাতি অন্য একটি দৃশ্য দেখতে পেত। হয়তো একজন সংসদ সদস্য দলের নির্দেশের আগে নিজের বিবেকের কাছে জবাবদিহি করতেন। হয়তো নতুন প্রজন্ম দেখত, একজন জনপ্রতিনিধি সত্যিই জনগণের প্রতিনিধি। হয়তো জুলাইয়ের আত্মত্যাগের পর বাংলাদেশ তার রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারত।

কিন্তু আজকের বাস্তবতা আমাদের আবার সেই পুরোনো প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে: নতুন বাংলাদেশ কি সত্যিই নতুন হবে, নাকি পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির নতুন মোড়কে আবার ফিরে আসবে? নতুনের নামে যদি পুরোনো ক্ষমতার সংস্কৃতি, পুরোনো দলীয় আনুগত্য এবং পুরোনো নিয়ন্ত্রণই ফিরে আসে, তাহলে জুলাইয়ের জাগরণের অর্থ কোথায়?

জুলাইয়ের আন্দোলন আমাদের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ দিয়েছিল। গণভোট জনগণকে আরেকবার মত প্রকাশের সুযোগ দিয়েছে। এখন সেই ম্যান্ডেটকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দায়িত্ব রাজনীতির। কিন্তু নতুন বাংলাদেশ তৈরির শেষ দায়িত্ব শুধু রাজনীতির নয়। সেটি আমাদের সবার।

কারণ একটি দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রের পেছনে শুধু দুর্নীতিগ্রস্ত শাসক থাকে না, থাকে দুর্নীতিকে কোনো না কোনোভাবে মেনে নেওয়া একটি সমাজও। আবার একটি সৎ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রের পেছনে শুধু ভালো সরকার থাকে না, থাকে সচেতন নাগরিকও।

তাই আজ যদি আমরা সত্যিই নতুন জাগরণ চাই, তাহলে প্রথমে আমাদের নিজেদের কাছে একটি প্রশ্ন করতে হবে: আমি কি শুধু অন্যের অন্যায়ের বিরুদ্ধে, নাকি নিজের সুবিধার বিরুদ্ধেও সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে প্রস্তুত? এই প্রশ্নের উত্তরই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

জুলাই সনদের বাস্তবায়ন তাই শুধু একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি পূরণের বিষয় নয়। এটি জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের বিশ্বাসের পরীক্ষা।
জনগণ তাদের রায় দিয়েছে। এখন রাষ্ট্রের পালা সেই রায়ের মর্যাদা দেওয়ার। আর যদি জনগণের এই আস্থাও রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে পরাজিত হয়, তাহলে ক্ষতি শুধু একটি সনদের হবে না। ক্ষতি হবে গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের বিশ্বাসের।

একটি জাতিকে বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে হতাশ করা যায়, কিন্তু অনন্তকাল প্রতারিত করা যায় না। কারণ একসময় মানুষ প্রশ্ন করতে শেখে। আর যে জাতি প্রশ্ন করতে শেখে, যে জাতি নিজের ভুলও স্বীকার করতে শেখে, যে জাতি সত্যকে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে শেখে, তাকে চিরকাল অন্ধকারে রাখা যায় না নতুন জাগরণ সেখান থেকেই শুরু হয়।

লেখক : রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এস এম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!