ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে এ অঞ্চলে পানির কোনো অভাব নেই; নদী, নালা, খাল এবং সাগরের সীমানায় ঘিরে থাকা এক সুবিশাল জলাভূমি এটি। কিন্তু প্রকৃতির কী নিষ্ঠুর বৈপরীত্য চারদিকে অপার পানির প্রাচুর্য থাকা সত্ত্ওে এক ফোঁটা পানযোগ্য মিষ্ট পানি পাওয়ার জন্য উপকূলের মানুষকে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হচ্ছে। 'চারদিকে পানি, অথচ এক ফোঁটাও পানের যোগ্য নয় ইংরেজি সাহিত্যের সেই বিখ্যাত পংক্তিটিই যেন আজকের বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জনপদের নিত্যদিনের নির্মম বাস্তবতা।
যেখানে পানি নেই সেখানে জীবনও নেই। পানি ছাড়া পৃথিবীর কোন জীবজন্তু, ছাছপালা এবং মানুষ বাঁচতে পারে না। আর এই পানির আধারতথা ধারক ও বাহক হলো সমুদ্র, নদ নদী, খাল,বিল, নালা, ঝিল,হাওর, বাওড় এবং জলাভূমি। বছরের পর বছর ধরে এ অঞ্চলের মানুষকে এক কলসি নিরাপদ পানির জন্য কিলোমিটারের পর কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয়। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন নারী ও শিশুরা। ভোর না হতেই পানির পাত্র কাঁখে নিয়ে মাইলের পর মাইল হাঁটা উপকূলীয় জীবনের এক করুণ চিত্রে পরিণত হয়েছে। পানির জন্য এই দীর্ঘ পথপরিক্রমা কেবল শারীরিক কষ্টই বাড়াচ্ছে না, বরং স্থানীয় নারী ও শিশুদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রেও এক নীরব বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
.png)
সংকটের বহুমাত্রিক কারণ:
উপকূলীয় অঞ্চলে পানির এই ভয়াবহ সংকট কোনো একক কারণে তৈরি হয়নি; এটি জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশগত রূপান্তর এবং মনুষ্যসৃষ্ট কর্মকাণ্ডের এক জটিল সম্মিলিত ফল। এটি এক কথায় বলা যায় মানুষের কর্মের ফল। প্রকৃতি কখনো মানুষের অকল্যাণের জন্য নয়, কল্যাণের জন্য। কিন্তু মানুষ তাদের নিজেদের স্বার্থের জন্য কল্যাণকে অকল্যাণ তৈরী করে নিজেদের ধংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
১. জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি:
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাবে জোয়ারের সময় সাগরের লবণাক্ত পানি নদী ও নালা বেয়ে দেশের ভেতরের ভূখণ্ডে প্রবেশ করছে। ফলে একসয়ের মিঠা পানির উৎস নদীগুলো এখন অত্যধিক লবণাক্ত।
২. ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততার বিস্তার:
অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে সুপেয় পানির স্তরে সাগরের লোনা পানি প্রবেশ করছে। বহু এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এতটাই নিচে নেমে গেছে যে, হাজার ফুট গভীর নলকূপ বসিয়েও প্রয়োজনীয় মিষ্ট পানির সন্ধান মিলছে না।
৩. প্রাকৃতিক জলাধার হ্রাস ও দীর্ঘস্থায়ী খরা:
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাতের প্যাটার্ন বদলে গেছে। দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং সময়মতো বৃষ্টি না হওয়ার কারণে প্রাকৃতিক জলাধারগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, খাল-বিল ভরাট ও অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের কারণে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে।
৪. উজান থেকে সাধু পানির প্রবাহ হ্রাস:
আঞ্চলিক নদী ব্যবস্থাপনার জটিলতা এবং নদীর নাব্যতা হ্রাসের কারণে উজান থেকে আসা মিঠা পানির প্রাক-শরৎ ও শীতকালীন প্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। ফলে নদীর স্বাভাবিক নিম্নমুখী চাপ কমে গিয়ে লোনা পানি আরও ওপরের দিকে উঠে আসছে।
জনস্বাস্থ্য ও স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব:
সুপেয় পানির অভাব কেবল তৃষ্ণা নিবারণের কোনো সাধারণ সংকট নয়; এটি গোটা উপকূলীয় জীবনযাত্রাকে এক চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। প্রথমত, জনস্বাস্থ্যের চরম অবনতি: বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত লবণাক্ত বা দূষিত পানি ব্যবহারের ফলে উপকূলীয় জনগোষ্ঠী নানাবিধ জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ডায়রিয়া, চর্মরোগ, পাকস্থলীর সংক্রমণ, উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভবতী নারীদের গর্ভপাত ও প্রি-অ্যাকল্যাম্পশিয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে। তাছাড়া দীর্ঘদিন ধরে লোনা পানি পান করার ফলে স্থানীয় মানুষের মধ্যে কিডনি জটিলতা মারাত্মক আকার ধারণ করছে।
দ্বিতীয়ত, কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা সংকট: আবাদী জমিতে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশের ফলে মাটির উর্বরতা কমে যাচ্ছে। ধানসহ অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যা সরাসরি স্থানীয় এবং জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
সেচের জন্য প্রয়োজনীয় মিষ্ট পানির অভাবে বিপুল পরিমাণ জমি বছরের পর বছর অনাবাদী পড়ে থাকছে। তৃতীয়ত, জীবিকা ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়: কৃষি ও সুপেয় পানির অভাবে অনেক পরিবার গৃহপালিত পশু পালন বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে। চাষাবাদ ও জীবনযাপনের স্বাভাবিক পরিবেশ হারিয়ে যাওয়ার কারণে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জেলাগুলো থেকে ক্রমাগত লোকজন বাস্তুচ্যুত হয়ে শহরের বস্তিগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছে। এটি নতুন এক পরিবেশগত শরণার্থীর জন্ম দিচ্ছে।
প্রযুক্তিভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনা- নদীর লোনা পানি পরিশোধন:
এই জটিল ও ঘনীভূত সংকট মোকাবিলায় সবচেয়ে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই সমাধান হতে পারে উপকূলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা নদীর পানিকে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে পানযোগ্য মিষ্ট পানিতে রূপান্তর করা। বিশ্বের অনেক পানিসংকটগ্রস্ত দেশে সমুদ্র ও নদীর লোনা পানি পরিশোধনের মাধ্যমে সুপেয় পানির চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশেও সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে আধুনিক ডেসালিনেশন প্রযুক্তি প্রয়োগ করা সম্ভব।
১. ডেসালিনেশন ও রিভার্স অসমোসিস :
উপকূলীয় এলাকাগুলোতে ছোট ও মাঝারি আকারের শোধনাগার স্থাপন করে 'রিভার্স অসমোসিস' প্রযুক্তির মাধ্যমে নদীর পানি থেকে দ্রবীভূত লবণ, জীবাণু, পলি ও ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান অপসারণ করা যায়। নদীর পানি যদি কম লবণাক্ত হয়, তবে সাধারণ শোধন প্রক্রিয়া প্রয়োগ করেও কাদা ও জীবাণু মুক্ত করে তা পানের উপযোগী করা সম্ভব।
২. পাইপলাইনের মাধ্যমে সুপেয় পানি বিতরণ:
উপকূলের যেসব নদীর পানি তুলনামূলক কম লবণাক্ত বা যেসব স্থানে মিঠা পানির প্রাকৃতিক উৎস রয়েছে, সেখান থেকে শোধনাগারের মাধ্যমে পানি বিশুদ্ধ করে পাইপলাইনের সাহায্যে দূরবর্তী গ্রামগুলোতে পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে।
৩. সৌরবিদ্যুৎচালিত ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট:
উপকূলীয় দুর্গম অঞ্চলে বিদ্যুৎ সংযোগের সীমাবদ্ধতা বা বিদ্যুৎ অপচয়ের কথা চিন্তা করে সৌরবিদ্যুৎচালিত লোনা পানি শোধন প্ল্যান্ট স্থাপন করা অত্যন্ত কার্যকর একটি সমাধান। এটি চালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ অনেকটাই কমিয়ে আনে এবং গ্রিন এনার্জি ব্যবহারের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
প্রাকৃতিক ও স্থানীয় প্রযুক্তির টেকসই সমন্বয়:
আগেই বলেছি উপকূলে চারদিকেই পানি আর পানি। কিন্তু সুপেয় পানির সংকট। এসংকট থেকে পরিত্রাণের জন্য মাথা খাটালেই সমাধান রয়েছে। আধুনিক বড় বড় যন্ত্র বা শোধনাগার স্থাপন করেই এ সংকটের পূর্ণাঙ্গ সমাধান সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন প্রাকৃতিক উৎসের সুরক্ষা এবং স্থানীয় প্রথাগত পদ্ধতির কার্যকর সমন্বয়। রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং (বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ) উপকূলীয় অঞ্চলে বছরে একটি নির্দিষ্ট সময়ে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাইক্লোন শেল্টার এবং সরকারি ভবনগুলোর ছাদে বৃষ্টিপাত সংগ্রহের আধুনিক ও স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। সংরক্ষিত মিষ্ট পানির পুকুর ও জলাধার, প্রতিটি ইউনিয়নে নির্দিষ্ট সংখ্যক পুকুরকে সম্পূর্ণ লোনা পানি ও রাসায়নিক মুক্ত রেখে কেবল পানের পানির জন্য সংরক্ষিত হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
খাল ও নদী পুনঃখনন লোনা পানির প্রবাহ রোধে এবং বর্ষার মিষ্ট পানি ধরে রাখতে স্থানীয় খাল ও ছোট নদীগুলো পুনঃখনন করা জরুরি। ভূগর্ভস্থ পানির প্রাকৃতিক পুনর্ভরণ কৃত্রিম উপায়ে বৃষ্টির পানিকে ভূগর্ভস্থ মিঠা পানির স্তরে পৌঁছে দেওয়ার প্রযুক্তি প্রয়োগ করে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর উন্নত করতে হবে। কিন্তু পুর্বের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায় খাল নদী প্রভাবশালীরা দখলে নিয়ে পানির প্রবাহ বন্ধ করছে, পাশাপাশি পিএসএফগুলো রক্ষনাবেক্ষণের অভাবে অকার্যকর থাকে।
এ জন্য স্থানীয় পর্যায় মানুষকে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি শক্তিশালী টিম করে দিতে হবে। শুধু তাই নয় স্থায়িত্বের জন্য স্থানীয় উপকারভোগিদের মাঝে প্রয়োজনীয়তার অনুভবের মানসিকতা তৈরী করতে হবে।
পানি নীতিমালা বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ:
পানি মানুষের জীবন ও উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি মৌলিক সম্পদ। এই সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই বাংলাদেশে জাতীয় পানি নীতিমালা ১৯৯৯ প্রণয়ন করা হয়। নীতিমালার মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের পানিসম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা।
পানি নীতিমালায় বলা হয়েছে, দেশের সব মানুষের জন্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি, শিল্প ও গৃহস্থালি খাতে পানির সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নদী, খাল, বিল ও জলাভূমি দখল ও দূষণ থেকে রক্ষা করার নির্দেশনা রয়েছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন এবং খরা মোকাবিলার জন্য সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনার কথাও এতে উল্লেখ করা হয়েছে।
নীতিমালায় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। মাছের আবাসস্থল রক্ষা, জলাভূমি সংরক্ষণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পানি ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথাও এতে উল্লেখ রয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, নীতিমালা থাকলেও এর কার্যকর বাস্তবায়ন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। নদী দূষণ, জলাশয় দখল এবং অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে পানিসম্পদ দিন দিন ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
তাই শুধু নীতিমালা প্রণয়ন করলেই চলবে না; এর সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে সরকার, বিভিন্ন সংস্থা এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পানি নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে দেশের পানিসম্পদ সংরক্ষণ সম্ভব হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও টেকসই পরিবেশ গড়ে তোলা যাবে।
১. নিরাপদ পানির ব্যবস্থা: সব মানুষের জন্য নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা নীতিমালার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
২. পানির সঠিক ব্যবহার: কৃষি, শিল্প, গৃহস্থালি ও পরিবেশ—সব ক্ষেত্রে পানির সুষম ও সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
৩. বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি ব্যবস্থাপনা: বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন, সেচব্যবস্থা উন্নয়ন এবং খরা মোকাবিলার জন্য বিভিন্ন প্রকল্প ও অবকাঠামো নির্মাণের কথা বলা হয়েছে।
৪. নদী ও জলাশয় সংরক্ষণ:নদী, খাল, বিল ও জলাভূমি দখল ও দূষণ থেকে রক্ষা করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
৫. পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা:পানি ব্যবস্থাপনার সময় মাছ, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে বলা হয়েছে।
৬. স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ:পানি ব্যবস্থাপনা ও সেচ প্রকল্প পরিচালনায় স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথা উল্লেখ আছে।
৭. ভূগর্ভস্থ পানির সুরক্ষা:অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ এবং পানির পুনঃভরাট (রিচার্জ) নিশ্চিত করার নির্দেশনা রয়েছে। ৮. পানি দূষণ নিয়ন্ত্রণ: শিল্পকারখানা ও অন্যান্য উৎস থেকে পানি দূষণ বন্ধ করার জন্য আইন ও নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার কথা বলা হয়েছে।পানি নীতিমালার মূল উদ্দেশ্য হলো—দেশের পানিসম্পদ সংরক্ষণ, সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পানির নিরাপত্তা বজায় রাখা।
পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪ অন্তর্র্বতী সরকারের সময় বিভিন্ন খাতে অনেকগুলো অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এর মধ্যে একটি ছিল পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪, যা পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের জন্য আনা হয়। পানি সম্পদ পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ আইন (খসড়া), ২০২৫। পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা আধুনিক করার লক্ষ্যে সরকার “পানি সম্পদ পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ আইন, ২০২৫” নামে একটি খসড়া আইন প্রকাশ করে এবং জনমত আহ্বান করে। এই আইনের লক্ষ্য ছিল—পানিসম্পদের পরিকল্পিত ব্যবহার নদী, জলাভূমি ও ভূগর্ভস্থ পানির সংরক্ষণ সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ সম্পর্কিত আইন প্রস্তাব। এছাড়া হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ নিয়ে নতুন আইনের খসড়াও প্রকাশ করা হয়, যাতে জলাভূমি রক্ষা ও পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। অন্তর্র্বতী সরকার পানি নিয়ে সরাসরি বড় কোনো নতুন স্থায়ী আইন পাশ না করলেও—পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার সংশোধনী অধ্যাদেশ,পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ সম্পর্কিত নতুন আইনের খসড়া— এসব উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। এখন বর্তমান সরকার অন্তর্র্বতী সরকারের খসড়া আইনগুলোর বিষয় কি পদক্ষেপ বা ব্যবস্থা নিবেন সেটি তাদের বিষয়।
অবহেলিত উপকূল:
বাংলাদেশ পানি আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৭ অনুযায়ী পানি সংকটাপন্ন এলাকার সুষ্ঠু পানি ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে জলাধার বা পানি ধারক স্তরের সুরক্ষার জন্য যথাযথ অনুসন্ধান, পরীক্ষা, নিরীক্ষা ও জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে ২৮ অক্টোবর ২০২৫ সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কিছু অঞ্চলকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পানি সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ঘোষণায় পানির সংকট বলা হয়েছে, কিন্তু সুনির্দিষ্ট করা হয়নি। হ্যাঁ শিকার করছি উপক‚লে পানি রয়েছে কিন্তু উপক‚লেও তো সংকট রয়েছে। উপকূলে পানি থাকলেও সুপেয় পানির সংকট তীব্র। কিন্তু দেশের উপক‚লীয় অঞ্চলে পানি থাকলেও সুপেয় পানির সংকট রয়েছে। গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কিছু অঞ্চলকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পানি সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা হলেও উপকূলের কথা সুনির্দিষ্ট করে উল্লেখ নেই। সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে উপকূলকে অন্তর্ভুক্ত না করায় আমি মনে করছি অন্তবর্তী সরকার বৈষম্য করেছে। এতে অবহেলিত হয়েছে উপক‚লীয় অঞ্চল।
কি বলা আছে ১৭ ধারায়: পানি সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা ও উহার ব্যবস্থাপনা:
"১৭। (১) সরকার নির্বাহী কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে জলাধার বা পানিধারক স্তরের সুরক্ষার জন্য, যথাযথ অনুসন্ধান, পরীক্ষা নিরীক্ষা বা জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, যেকোন এলাকা বা উহার অংশবিশেষ বা পানি সম্পদ সংশ্লিষ্ট যেকোন ভূমিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পানি সংকটাপন্ন এলাকা হিসাবে ঘোষণা করিতে পারিবে। (২) উপ-ধারা (১) এর অধীন জারিকৃত প্রজ্ঞাপনে মৌজা ম্যাপ ও দাগ নম্বর উল্লেখ করিয়া পানি সংকটাপন্ন এলাকার সীমানা নির্দিষ্ট করিতে হইবে। (৩) নির্বাহী কমিটি পানি সংকটাপন্ন এলাকার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করিবার লক্ষ্যে, এই আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে, সুরক্ষা আদেশ দ্বারা যেকোন বিধি-নিষেধ আরোপ করিতে পারিবে।" "পানি আইন, ২০২৩" হলো বাংলাদেশে পানি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, সুরক্ষা ও সংরক্ষণের জন্য প্রণীত একটি আইন। এই আইনের আওতায় স¤প্রতি কিছু এলাকাকে 'পানি সংকটাপন্ন এলাকা' হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে এবং সেখানে পানি ব্যবস্থাপনার জন্য ১১টি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এই নির্দেশনাগুলো অমান্য করলে পানি আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। কিন্তু যে এলাকা পানি সংকটাপন্ন রয়েছে সে এলাকা যদি সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে তালিকাভুক্ত করে ঘোষণা না করা হয় তাহলে তার শাস্তি কি? এটার শাস্তির ধারা থাকা উচিত।
দুঃখজনক হলেও সত্য, পানিসম্পদ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ এখনো যথেষ্ট নয়। নদী-খাল পুনরুদ্ধার, জলাভূমি সংরক্ষণ এবং পানির সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। নীতিমালা থাকলেও তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত না হলে সমস্যার সমাধান হবে না।
বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়:
প্রযুক্তিভিত্তিক এবং প্রাকৃতিক উভয় সমাধানের পথেই কিছু বাস্তবমুখী চ্যালেঞ্জ রয়েছে,
১. উচ্চ বিনিয়োগ ও পরিচালন ব্যয়,আধুনিক ডেসালিনেশন প্ল্যান্ট স্থাপন ও তা সচল রাখতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন।
২. নদীর পানির গুণগত মানের পরিবর্তন, শুষ্ক মৌসুমে নদীগুলোতে লবণাক্ততা অতিরিক্ত বৃদ্ধি পায় এবং বর্ষায় ঘোলাটে পলির পরিমাণ বেড়ে যায়, যা শোধনাগারের ফিল্টার নষ্ট করে ফেলতে পারে।
৩. পরিবেশগত ঝুঁকি, ডেসালিনেশন প্রক্রিয়ায়য পানি পরিশোধনের পর যে উচ্চ ঘনত্বের লোনা বর্জ্য তৈরি হয়, তা অসাবধানতাবশত নদীতে ফেললে জলজ বাস্তুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।
এসব চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে হলে প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি, যথাযথ পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন এবং উপযুক্ত আর্থিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। স্থানীয় যুবকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে শোধনাগারগুলোর দৈনন্দিন রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে, যা স্থানীযয় কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও ভূমিকা রাখবে। এছাড়াও স্থানীয় পর্যায়ে উপকারভোগিদের সুপেয় পানির প্রয়োজনীয়তাও বুঝতে হবে। সম্প্রতি একটি গবেষণায় দেখা গেছে উপকূলে খাবার পানির উৎসে লবণাক্ততা, হৃদরোগের ঝূকিতে প্রতি জনে একজন, আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর.বি) ও ইম্পোরিয়াল কলেজ লন্ডনের একটি যৌথ গবেষণার প্রাথমিক ফলাফলে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
উপকূলীয় সুপেয় পানি সংকটের সমাধান কোনো একক সংস্থা বা সরকারের পক্ষে একা করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদ), দেশি-বিদেশি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং সর্বোপরি স্থানীয় জনগণের একটি সমন্বিত ও অংশগ্রহণে সমর্থিত নেটওয়ার্ক।
পানি কেবল কোনো বিক্রয়যোগ্য পণ্য বা সাধারণ সম্পদ নয়; এটি মানুষের মৌলিক মানবাধিকার। উপকূলবাসীর নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা প্রদান করা জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার এক অপরিহার্য অংশ হওয়া উচিত। স্বল্পমেয়াদী ত্রাণ বা সাময়িক সমাধান ছেড়ে এখনই সময়োপযোগী মাস্টারপ্ল্যান, জলবায়ু অভিযোজন তহবিল - এর সঠিক ব্যবহার, আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ এবং পরিবেশ সংরক্ষণে সর্বস্তরের মানুষের দায়িত্বশীল ভূমিকা সুনিশ্চিত করার। সমন্বিত ও আন্তরিক উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলেই উপকূলের দীর্ঘদিনের এই তৃষ্ণার্ত হাহাকার দূর করে একটি বাসযোগ্য ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব।
উপকূলের পানিসম্পদ রক্ষা করা মানে দেশের পরিবেশ ও অর্থনীতিকে রক্ষা করা। তাই এখনই নদী-খালকে বাঁচাতে এবং পানির সুষম ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা সময়ের দাবি। অন্যথায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা একটি সংকটাপন্ন উপকূল রেখে যাব। যে সংকট থেকে কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
লেখক: শফিকুল ইসলাম খোকন, সাংবাদিক, কলাম লেখক ও গবেষক।