ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ মতামত ]

অন্ধকারের অতলে ভবিষ্যত- শিশুর হাতে মাদক!

দীপু মাহমুদ 
প্রকাশিত: ১১:১২, ৩১ আগস্ট ২০২৬
অন্ধকারের অতলে ভবিষ্যত- শিশুর হাতে মাদক!
দীপু মাহমুদ, শিশু শিক্ষা ও মানবাধিকার বিষয়ক লেখক, বিশ্লেষক এবং কথাসাহিত্যিক

একজন ১৬ বছরের কিশোরী একসময় রাস্তায় থাকত। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর পাচার হয়েছিল ভারতে। সেখানে নির্যাতনের শিকার হয়ে ফিরে এসে আর পরিবারকে খুঁজে পায়নি। ঢাকার রাস্তায় থাকার সময় তার হাতে ওঠে ড্যান্ডি, পরে ইয়াবা। আজ সে একটি পুনর্বাসনকেন্দ্রে পড়াশোনা করছে, হাতের কাজ শিখছে, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন দেখছে।

এই মেয়ের কাহিনিকে আমরা চাইলে মাদকাসক্তির ঘটনা বলতে পারি। কিন্তু আরও গভীরভাবে দেখলে এটা আদতে একজন শিশুর হারিয়ে যাওয়া, ভেঙে পড়া এবং আবার ফিরে আসার কাহিনি। প্রশ্ন হলো- সে যখন রাস্তায় হারিয়ে যাচ্ছিল, তখন রাষ্ট্র, পরিবার, সমাজ ও প্রতিষ্ঠানগুলো কোথায় ছিল? 

===
** ৩৩ শতাংশ মাদক ব্যবহারকারী প্রথম মাদক নিয়েছে ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সে
** ৫৯ শতাংশ শুরু করেছে ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সে
** অবৈধ মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৮১ লাখ ৯৪ হাজার

====

Advertisement

বাংলাদেশের মাদক-সংকট নিয়ে নতুন জাতীয় গবেষণার সবচেয়ে ভয়ংকর তথ্য হচ্ছে ৩৩ শতাংশ মাদক ব্যবহারকারী প্রথম মাদক নিয়েছে ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সে। আরও ৫৯ শতাংশ শুরু করেছে ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সে। অর্থাৎ মাদকের বড় বাজারটি শুধু বড়দের নয়-আমাদের কৈশোরের দরজা দিয়েও তার প্রবেশ ঘটেছে। জাতীয় পর্যায়ের গবেষণায় দেশে অবৈধ মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৮১ লাখ ৯৪ হাজার ৬৫১ বলে অনুমান করা হয়েছে। প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী বলেছেন, মাদক সহজেই পাওয়া যায়। 

এই পরিসংখ্যান আমাদের প্রচলিত প্রশ্নকে বদলে দিতে বাধ্য করে। আমরা সাধারণত জানতে চাই- কতজন মাদকাসক্ত? কতজনকে গ্রেপ্তার করা হলো? কত কেজি মাদক উদ্ধার হলো? কতটি অভিযান হলো? অথচ শিশু-কিশোরদের জন্য আরও জরুরি প্রশ্ন হলো- কতজন প্রথমবার মাদক নেওয়ার আগেই শনাক্ত হলো? কতজন স্কুল থেকে ঝরে পড়ার পর সামাজিক সুরক্ষার আওতায় এল? কতজন মানসিক চাপ, পারিবারিক সহিংসতা বা নির্যাতনের পর কাউন্সেলিং পেল? কতজন শিশুর জন্য সহজলভ্য, শিশুবান্ধব চিকিৎসা আছে? 

কারণ মাদকের ঘটনা অনেক সময় মাদক দিয়ে শুরু হয় না। শুরু হয় একাকিত্ব দিয়ে, বন্ধুর চাপ দিয়ে, পরিবারের ভাঙন দিয়ে, নির্যাতন দিয়ে, রাস্তায় রাত কাটানো দিয়ে, স্কুল ছেড়ে দেওয়া দিয়ে কিংবা এমন এক মানসিক চাপ দিয়ে যার কথা বলার মতো কোনো মানুষ শিশুর পাশে নেই। জাতীয় গবেষণাতেও peer pressure, পারিবারিক অস্থিরতা, মানসিক চাপ, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত থাকার মতো বিষয়গুলোকে মাদক ব্যবহারের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। 

২০২৫ সালে চারটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০৯ শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, substance use-এর বর্তমান হার ১৬.১ শতাংশ। যাদের মাদক ব্যবহারকারী বন্ধু ছিল, তাদের মধ্যে substance use-এর হার ৩৫.৮ শতাংশ; এমন বন্ধু না থাকা শিক্ষার্থীদের মধ্যে তা ১৩.১ শতাংশ।

বন্ধুর প্রভাবের বিষয়টিও হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। ২০২৫ সালে চারটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০৯ শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, substance use-এর বর্তমান হার ১৬.১ শতাংশ। যাদের মাদক ব্যবহারকারী বন্ধু ছিল, তাদের মধ্যে substance use-এর হার ৩৫.৮ শতাংশ; এমন বন্ধু না থাকা শিক্ষার্থীদের মধ্যে তা ১৩.১ শতাংশ। পারিবারিকভাবে মাদক ব্যবহারের ইতিহাস থাকলেও ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অর্থাৎ কিশোর-কিশোরীদের মাদক থেকে দূরে রাখার লড়াইটি শুধু তাদের ব্যক্তিগত ইচ্ছাশক্তির লড়াই নয়; তাদের চারপাশের সামাজিক পরিবেশও এতে বড় ভূমিকা রাখে। 

পথশিশুদের ক্ষেত্রে বিপদ আরও নির্মম। বাংলাদেশের পথশিশুদের নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, অনেকের মাদক ব্যবহারের শুরু হয় সস্তা আঠাজাতীয় পদার্থ শোঁকার মাধ্যমে- যা পরিচিত ‘ড্যান্ডি’ নামে। সেখান থেকে কেউ কেউ গাঁজা, ঘুমের ওষুধ, এমনকি আরও ঝুঁকিপূর্ণ মাদকে যায়। গবেষণায় বন্ধু বা সহকর্মী শিশুদের মাধ্যমে প্রথম মাদকের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে। 

অথচ যে শিশু ফিরে আসতে চায়, তার জন্য আমাদের দরজা খুব কম। সরকারি মাদক পুনর্বাসনকেন্দ্রগুলোর মোট শয্যা মাত্র ১৯৯টি। এর বড় অংশ পুরুষ বা ছেলেশিশুদের জন্য। তেজগাঁওয়ের কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রটি ২৫০ শয্যায় উন্নীত করার কাজ চলছে, কিন্তু নির্মাণকাজের কারণে বর্তমানে সেখানে মাত্র ২৮ জন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের চিকিৎসা চলছে। নারী ও শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত আলাদা ব্যবস্থা তো দূরের কথা, অনুমোদিত ১৮টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র চারজন।
এখানে একটি অস্বস্তিকর বৈপরীত্য আছে। 

২০২৫ সালে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ৩৯ হাজার ৬৪১ জন মাদকনির্ভর মানুষ চিকিৎসা নিয়েছেন। কিন্তু সরকারি কেন্দ্রে চিকিৎসা নেওয়া মানুষের সংখ্যা ২০২৪ সালের ১৩ হাজার ২৪ থেকে কমে ৭ হাজার ১৫৯-এ নেমেছে। বিপরীতে বেসরকারি কেন্দ্রে রোগীর সংখ্যা বেড়ে ২৬ হাজার ৫২ থেকে ৩২ হাজার ৪৮২ হয়েছে।

অর্থাৎ চিকিৎসার দায়িত্ব ক্রমেই এমন একটি ব্যবস্থার দিকে সরে যাচ্ছে, যেখানে পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ নির্ধারণ করতে পারে। একটি দরিদ্র পরিবারের মাদকাসক্ত কিশোর আর একটি সচ্ছল পরিবারের কিশোরের জন্য পুনর্বাসনের দরজা তাই সমানভাবে খোলা নয়। 

আরেকটি বিপদ হলো চিকিৎসাকে শুধু ‘ভর্তি হওয়া’ হিসেবে দেখা। জাতীয় গবেষণায় মাদক ব্যবহারকারীদের বড় অংশ তরুণ; বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গবেষণাও substance use-এর সঙ্গে পারিবারিক ইতিহাস, বন্ধুদের প্রভাব, ঘুমের সমস্যা ও জীবনযাপনের নানা ঝুঁকির সম্পর্ক দেখাচ্ছে। ফলে একজন কিশোরকে ২৮ দিন চিকিৎসা দিয়ে আগের পরিবেশে ফিরিয়ে দিলেই তার পুনর্বাসন সম্পন্ন হয় না। স্কুলে ফেরানো, পরিবারকে কাউন্সেলিং দেওয়া, পুরোনো মাদকসঙ্গ থেকে দূরে রাখা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া, দক্ষতা তৈরি করা এবং দীর্ঘমেয়াদি follow-up- সবই চিকিৎসার অংশ হওয়া উচিত। 

সরকার অবশ্য ঢাকার বাইরে সাত বিভাগীয় শহরে ২০০ শয্যার নতুন মাদক চিকিৎসা ও পুনর্বাসনকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। মোট ১,৪০০ নতুন শয্যা যুক্ত হওয়ার কথা। তেজগাঁও কেন্দ্রকেও ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হচ্ছে। এটা প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। কিন্তু নতুন ভবন ও নতুন শয্যা তৈরিই যথেষ্ট নয়। নতুন ব্যবস্থার নকশাতে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের জন্য পৃথক ইউনিট, প্রশিক্ষিত child psychologist, social worker, family counsellor, শিক্ষা পুনর্বাসন এবং চিকিৎসা-পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা রাখতে হবে। 

কারণ একজন ১৪ বছরের শিশুকে ৩৫ বছরের প্রাপ্তবয়স্ক মাদকনির্ভর মানুষের সঙ্গে একই পুনর্বাসন কাঠামোয় দেখলে তার প্রয়োজনটিই আমরা ভুল বুঝব। শিশুর চিকিৎসা শুধু শরীর থেকে মাদক সরিয়ে দেওয়ার চিকিৎসা নয়। তার হারানো পড়াশোনা ফিরিয়ে দেওয়া, আত্মসম্মান ফিরিয়ে দেওয়া, নিরাপদ সম্পর্ক তৈরি করা, পরিবার খুঁজে দেওয়া, প্রয়োজনে বিকল্প পরিবার বা সুরক্ষিত আবাসন নিশ্চিত করা- এসবও চিকিৎসা। 

নারী ও কিশোরীদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন আরও আলাদা। সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক প্রত্যাখ্যান, যৌন ও শারীরিক নির্যাতনের অভিজ্ঞতা, পাচারের ঝুঁকি এবং নিরাপদ আবাসনের অভাব তাদের মাদকনির্ভরতার পেছনে আলাদা বাস্তবতা তৈরি করতে পারে। তাই শুধু ‘নারীদের জন্য কয়েকটি শয্যা’ তৈরি করলেই সমাধান হবে না; প্রয়োজন trauma-informed, gender-sensitive এবং child-friendly rehabilitation। 

আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু একজন মাদকাসক্তকে সুস্থ করা নয়; বরং একজন শিশুকে মাদকাসক্ত হওয়ার আগেই রক্ষা করা। আর যে শিশু ইতিমধ্যে মাদকে জড়িয়ে গেছে, তাকে অপরাধী হিসেবে নয়, ফিরে আসতে চাওয়া একজন মানুষ হিসেবে দেখা। কারণ একজন শিশুর হাতে মাদক ওঠা মানে শুধু একটি জীবন বিপন্ন হওয়া নয়- তার সঙ্গে পরিবার, ভবিষ্যৎ এবং শেষ পর্যন্ত সমাজের সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। 

তাই নতুন মাদক নিরাময়কেন্দ্রের পাশাপাশি আমাদের দরকার নতুন ধরনের পুনর্বাসন-চিন্তা- যেখানে চিকিৎসার বিছানার পাশে থাকবে বই, কাউন্সেলিং রুমের পাশে থাকবে শ্রেণিকক্ষ, চিকিৎসকের পাশে থাকবে মনোবিজ্ঞানী, আর হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার পর শিশুকে একা ছেড়ে না দিয়ে তার পাশে থাকবে পরিবার, স্কুল ও সমাজ। 

মাদক থেকে একজন শিশুকে ফিরিয়ে আনা মানে তাকে শুধু নেশামুক্ত করা নয়, তার বয়সটাকেও ফিরিয়ে দেওয়া।

লেখক : দীপু মাহমুদ, শিশু শিক্ষা ও মানবাধিকার বিষয়ক লেখক, বিশ্লেষক এবং কথাসাহিত্যিক

ডেইলি-বাংলাদেশ/এস এম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!