ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ মতামত ]
অর্থনৈতিক প্রতিরক্ষার মরীচিকা

অন্যকে ঠেকাতে গিয়ে যখন নিজের অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়

কে এম জয়নুল আবেদীন
প্রকাশিত: ০৯:০৪, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অন্যকে ঠেকাতে গিয়ে যখন নিজের অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়
কে এম জয়নুল আবেদীন

বিশ্ব আজ এমন এক অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে প্রবেশ করেছে, যেখানে কোনো দেশই পুরোপুরি একা চলতে পারে না। খাদ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি, কাঁচামাল, ওষুধ কিংবা শিল্পের যন্ত্রাংশপ্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেশগুলো একে অন্যের ওপর কোনো না কোনোভাবে নির্ভরশীল।

এই বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে: একটি দেশ যদি নিজের নিরাপত্তার নামে অন্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ করে বা কঠোরভাবে সীমিত করে, তাহলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতি কার বেশি হয়?

Advertisement

সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য ও প্রযুক্তি বিরোধ এই প্রশ্নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এখানে কোনো পক্ষকে দোষী বা নির্দোষ বলার বিষয় নয়। বরং ঘটনাটি দেখায়, বিশ্ব অর্থনীতির গভীর পারস্পরিক নির্ভরতার যুগে অর্থনৈতিক চাপ অনেক সময় প্রত্যাশার বিপরীত ফল তৈরি করতে পারে।

বিরল খনিজ: একটি বাস্তব শিক্ষা

Rare earth বা বিরল খনিজ আধুনিক প্রযুক্তির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈদ্যুতিক গাড়ি, উইন্ড টারবাইন, শিল্পের শক্তিশালী মোটর, ইলেকট্রনিক পণ্য, এমনকি প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতেও এগুলোর ব্যবহার রয়েছে।

সমস্যা হলোখনিজ মাটির নিচে থাকলেই তার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায় না। খনিজ উত্তোলনের পর তাকে আলাদা করা, পরিশোধন করা এবং শেষ পর্যন্ত শক্তিশালী চুম্বক বা অন্যান্য ব্যবহারযোগ্য উপাদানে রূপান্তর করতে জটিল শিল্পব্যবস্থা দরকার।

ন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা IEA-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে চীন বিশ্বে magnet rare earth-এর প্রায় ৬০ শতাংশ উত্তোলন করলেও পরিশোধনের ক্ষেত্রে তার অংশ ছিল প্রায় ৯১ শতাংশ এবং permanent magnet উৎপাদনে প্রায় ৯৪ শতাংশ। অর্থাৎ শুধু খনি থাকা যথেষ্ট নয়; প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষমতাই অনেক সময় প্রকৃত কৌশলগত শক্তি।

২০২৫ সালে চীনের কিছু rare-earth পণ্যের ওপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপের পর যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের কিছু গাড়ি নির্মাতা সরবরাহ সংকটে পড়ে। IEA-এর হিসাবে, কিছু উৎপাদনকারীকে উৎপাদনের গতি কমাতে বা সাময়িকভাবে কারখানা বন্ধ করতেও হয়েছে। (IEA)

এখানে শিক্ষাটি পরিষ্কার: একটি সরবরাহ-শৃঙ্খলের দুর্বলতা ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে চাপ দেওয়া সম্ভব, কিন্তু একই সঙ্গে সেই শৃঙ্খলের ওপর নির্ভরশীল নিজের শিল্পও বিপদে পড়তে পারে।

সেমিকন্ডাক্টর: শুধু উন্নত চিপ নয়

একই বিষয় দেখা যায় সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে।

আধুনিক বিশ্বের আলোচনায় AI-এর জন্য অত্যাধুনিক চিপ সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন চলে আরও সাধারণ বা “legacy” ও “mature” চিপের ওপর। গাড়ি, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, চিকিৎসা সরঞ্জাম, শিল্পযন্ত্র এবং নানা ধরনের বৈদ্যুতিক পণ্যে এসব চিপ ব্যবহৃত হয়।

তাই কোনো দেশ যদি প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে সরবরাহ সীমিত করে, তার প্রভাব শুধু প্রতিপক্ষের ওপর পড়ে না। যেসব শিল্প ওই উপকরণের ওপর নির্ভরশীল, তাদের উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ পণ্যের দামের মাধ্যমে সাধারণ ভোক্তার ওপর পড়ে।

অর্থাৎ অর্থনৈতিক অস্ত্রের লক্ষ্য হতে পারে একটি দেশ, কিন্তু তার প্রভাব পৌঁছে যেতে পারে সাধারণ মানুষের বাজার পর্যন্ত।

অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা কি সত্যিই সম্ভব?

আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলোসরবরাহ-শৃঙ্খল একটি জালের মতো। একটি দেশের কাঁচামাল অন্য দেশের কারখানায় যায়; সেখানে তৈরি উপাদান তৃতীয় দেশে যায়; শেষ পণ্য তৈরি হয় চতুর্থ দেশে; তারপর তা বিক্রি হয় পৃথিবীর বিভিন্ন বাজারে।

এই ব্যবস্থাকে রাতারাতি ভেঙে ফেলা সম্ভব নয়।

তাই “সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা” অনেক সময় একটি আকর্ষণীয় রাজনৈতিক ধারণা হলেও বাস্তবে তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। অবশ্যই জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সরবরাহের বিকল্প উৎস তৈরি করা দরকার। IEA-ও সরবরাহের বৈচিত্র্য, নতুন বিনিয়োগ, পুনর্ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

কিন্তু নির্ভরতা কমানো আর পৃথিবীকে অর্থনৈতিকভাবে ভাগ করে ফেলা এক বিষয় নয়।

সবচেয়ে বড় ক্ষতি হতে পারে সাধারণ মানুষের

বাণিজ্য যুদ্ধের হিসাব সাধারণত সরকার, কোম্পানি ও জাতীয় স্বার্থের ভাষায় করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ে মানুষের জীবনেপণ্যের দাম বাড়ে, চাকরি অনিশ্চিত হয়, উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং উন্নয়নের অর্থনৈতিক সুযোগ কমে যায়।

যে অর্থ দারিদ্র্য দূরীকরণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জলবায়ু মোকাবিলা ও কর্মসংস্থানে ব্যয় হতে পারত, তার একটি বড় অংশ তখন ব্যয় হয় বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি, অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা, মজুত এবং বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায়।

এখানেই মানবতার জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

শান্তিই কি তাহলে কেবল নৈতিক আদর্শ?

না। শান্তি শুধু নৈতিক বা মানবিক আদর্শ নয়; এটি অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও একটি বাস্তব শর্ত।

যুদ্ধ ও সংঘাত সম্পদ নষ্ট করে। বাণিজ্যিক বিভাজন উৎপাদন ব্যয় বাড়ায়। অবিশ্বাস প্রযুক্তি ও জ্ঞান বিনিময়কে বাধাগ্রস্ত করে। আর সহযোগিতা বিপরীতভাবে নতুন বাজার, নতুন প্রযুক্তি, নতুন কর্মসংস্থান এবং উন্নয়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে।

তাই আজকের সাপলাই-চেইন সংকটকে একটি বৃহত্তর মানবিক বার্তা হিসেবে দেখা যায়:

প্রতিবেশীকে দুর্বল করতে গিয়ে যদি নিজের অর্থনীতিও দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে সেই সংঘাত কোনো পক্ষের প্রকৃত বিজয় নয়।

মানবতার সামনে এখন সিদ্ধান্তের সময়

বিশ্বের প্রতিটি দেশেরই নিজের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার অধিকার আছে। কিন্তু সেই নিরাপত্তা যদি এমন নীতির ওপর দাঁড়ায়, যা অন্যকে ক্ষতি করার পাশাপাশি নিজের জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়িয়ে দেয়, তবে সেই নীতিকে নতুন করে ভাবা দরকার।

বিশ্বের ভবিষ্যৎ হওয়া উচিত প্রতিযোগিতার সঙ্গে সহযোগিতা, নিরাপত্তার সঙ্গে বাণিজ্য এবং জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে বৈশ্বিক মানবিক স্বার্থের ভারসাম্য।

বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় শক্তি অস্ত্র বা বাণিজ্যিক বাধা নয়মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও সৃজনশীলতা।

শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সেই মানবসম্পদই নতুন শিল্প তৈরি করতে পারে, নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করতে পারে এবং অর্থনীতিকে পরিবর্তন করতে পারে।

শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর কোনো দেশ একা সমৃদ্ধ হতে পারে না। একটি দেশের উন্নয়ন যখন অন্য দেশের দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা বা ধ্বংসের ওপর দাঁড়ায়, তখন সেই উন্নয়নও দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

আজকের অর্থনৈতিক সংঘাত তাই মানবতার জন্য একটি জীবন্ত শিক্ষা:

আমরা একে অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে দীর্ঘদিন নিরাপদ থাকতে পারি না।

শান্তি শুধু যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয়।

শান্তিই মানুষের উন্নয়ন, সহযোগিতা, নিরাপত্তা এবং সবার জন্য একটি মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যতের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।

লেখক: প্রকৌশলী ও কলামিস্ট

ডেইলি-বাংলাদেশ/এম এ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!