বাংলাদেশে ‘আদিবাসী’ বিতর্কের বড় একটি সমস্যা হলো Indigenous Peoples, Ethnic Community, Tribe, Aboriginal, আদিবাসী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ইত্যাদি ভিন্ন ভিন্ন শব্দকে পরস্পরের সমার্থক ধরে নেওয়া। প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করতে চাই- আদিবাসী জনগোষ্ঠী সম্পর্কে কোনো একক, সর্বজনস্বীকৃত সংজ্ঞা নেই। জাতিসংঘও কোনো চূড়ান্ত সংজ্ঞা নির্ধারণ করেনি। তারা একটি জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা, পূর্বপুরুষের ভূখণ্ডের সঙ্গে সম্পর্ক, স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান, ভাষা, নিজস্ব পরিচয় এবং বৃহত্তর সমাজে অবস্থান ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য সনাক্তর মাধ্যমে Indigenous Peoples- চিহ্নিত করার কথা বলে। ILO Convention No. 169-এ Indigenous বা Tribal হিসেবে একটি জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়কে মৌলিক মানদণ্ড বলা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো জনগোষ্ঠী নিজেদের কীভাবে পরিচিত করে এবং সেই পরিচয় তাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় কতটা প্রতিষ্ঠিত তা উপেক্ষা করে বাইরে থেকে তাদের পরিচয় নির্ধারণ করা আধুনিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ঠিক এই সূত্রটি ব্যবহার করে আমি ডোম জনগোষ্ঠীরে ভাষা নিয়ে কাজ করেছিলাম। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ভাষা নিয়ে কাজ করলেও ডোমদের ভাষা নিয়ে কাজ করেনি। যারা কাজ করেছেন তারা ডোমদের ভাষাকে সাদরী বলে মনে করেছেন। কিন্তু কোনো ডোম তাদের ভাষাকে সাদরী বলে না। তারা তাদের ভাষাকে বলে ডোমাই এবং একটু শিক্ষিতরা বলে ভোজপুরী।
.png)
অবশেষে তাদের ভাষাকে ডোমাই ধরে নিয়ে ভোজপুরীর সঙ্গে তুলনা করে কাজটি সম্পন্ন করেছি। অবশেষে ডোম জনগোষ্ঠীর ভাষা: ডোমাই-ভোজপুরী নামে আমাই থেকে বের হয়েছে। আমি ডোমদের হরিজন বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বলতে নারাজ। আমি তাদের আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে সনাক্ত করতে চাই। করেছি। এখানে আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল প্রশ্ন- কোনো একটি জনগোষ্ঠীর পরিচয় তাদের হয়ে অন্য কেউ নির্ধারণ করবে, নাকি তারা নিজেরাই সেই পরিচয় নির্ধারণ করবে? এই একই প্রশ্নে আমি বেদেদের কাছে ফিরে গেছি।
বিশ্বব্যাংকের OP 4.10-ও Indigenous Peoples শনাক্ত করার ক্ষেত্রে চারটি বৈশিষ্ট্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে--
এক. স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী হিসেবে আত্মপরিচয় এবং অন্যদের কাছেও সেই পরিচয়ের স্বীকৃতি,
দুই. নির্দিষ্ট আবাসভূমি বা পূর্বপুরুষের ভূখণ্ড এবং সেখানকার প্রাকৃতিক সম্পদের সঙ্গে সমষ্টিগত সম্পর্ক,
তিন. সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজের তুলনায় পৃথক প্রথাগত সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক বা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান,
চার. স্বতন্ত্র ভাষা, যা অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় বা আঞ্চলিক প্রধান ভাষা থেকে পৃথক।
তবে এসব বৈশিষ্ট্য একটি জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে বিভিন্ন মাত্রায় থাকতে পারে। সব বৈশিষ্ট্যই প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে অবধারিত ভাবে একই মাত্রায় উপস্থিত থাকতেই হবে এমন কোনো কথা নেই।
এমনকি জোরপূর্বক উচ্ছেদ বা ভূমিচ্যুতির কারণে কোনো জনগোষ্ঠী তার ঐতিহাসিক ভূখণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক হারালেও সেই জনগোষ্ঠীর Indigenous পরিচয় বিলুপ্ত হয়ে যায় না। অতএব, ‘ভাষা নেই, তাই আদিবাসী নয়’ অথবা ‘বর্তমানে পূর্বপুরুষের জমিতে বসবাস করে না, তাই আদিবাসী নয়’-এ ধরনের সরল সিদ্ধান্ত আধুনিক নৃবিজ্ঞান মান্যতা দেয় না। এ বিষয়ে আরেকটি ভুল ধারণা সংশোধন করা জরুরি। পুরোনো নৃতাত্ত্বিক তত্ত্বে ব্যবহৃত ‘নিগ্রয়ড’, ‘অস্ট্রালয়ড’, ‘প্রটো-অস্ট্রালয়ড’ ইত্যাদি তথাকথিত জাতিগত শ্রেণিবিন্যাস দিয়ে বর্তমানে কোনো জনগোষ্ঠীর Indigenous পরিচয় নির্ধারণ করা হয় না। আধুনিক নৃতত্ত্বে এগুলো গ্রহণযোগ্য নয়। Indigenous identity কোনো জৈবিক race নয়। এটি একটি ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচয়।
একই কারণে Ethnic Community এবং Indigenous Peoples-কেও এক করে দেখা যাবে না। একটি জনগোষ্ঠী ethnic group হতে পারে, কিন্তু Indigenous হওয়ার জন্য তার ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা কী, ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের সঙ্গে সম্পর্ক কী, নিজস্ব সামাজিক প্রতিষ্ঠান আছে কি না, নিজস্ব পরিচয় কী এবং বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় সমাজের সঙ্গে তার ক্ষমতার সম্পর্ক কেমন,- এই সব জানা জরুরি।
বাংলাদেশে সমস্যাটি জটিল তার কারণ আদিবাসী প্রশ্নে রাষ্ট্রীয় পরিভাষা ও আন্তর্জাতিক পরিভাষা এক নয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩ক অনুচ্ছেদে ‘tribes, minor races, ethnic sects and communities’-এর স্বতন্ত্র স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। আবার আন্তর্জাতিক পরিসরে Indigenous Peoples একটি অধিকারভিত্তিক ধারণা, যার সঙ্গে ভূমি, সংস্কৃতি, আত্মপরিচয়, অংশগ্রহণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারও যুক্ত। তাই বাংলাদেশের আদিবাসী প্রশ্নের সমাধান কোনো সরকারি বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের নিরিখে করা উচিত হবে না।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম ১৯৭১ সালে। কিন্তু এই ভূখণ্ডের মানুষের ইতিহাস রাষ্ট্রের জন্মের চেয়ে বহু প্রাচীন। এই ভূখণ্ডের ভেতরে কোনো জনগোষ্ঠীর আন্তঃঅভিবাসন, স্থানান্তর বা বসতি পরিবর্তনের ইতিহাস থাকলেই তাকে বহিরাগত বলা যায় না।
আমি যদি গোপালগঞ্জ থেকে অভিবাসনের মাধ্যমে রাজশাহীতে গিয়ে বসতি স্থাপন করি, তাহলে কি রাজশাহীতে আমি বহিরাগত হয়ে যাব? আমি তো একই রাষ্ট্রীয় ভূখণ্ডের মানুষ। আমার স্থানান্তর আমার ঐতিহাসিক-সাংস্কৃতিক পরিচয়কে রাতারাতি মুছে দেয় না। তাহলে অন্য কোনো জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও শুধু বর্তমান বসতির স্থান দেখিয়ে তাদের ইতিহাসকে অস্বীকার করা কতটা যৌক্তিক?
কাজেই আমার মনে হয় বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একটি বৈজ্ঞানিক Indigenous Identification Framework তৈরি করা প্রয়োজন। সেখানে নৃতত্ত্ব, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস, ভাষাবিজ্ঞান, আইন এবং সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর নিজস্ব মতামত একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কারণ কোনো জনগোষ্ঠীকে শুধু সংখ্যায় ছোট বলে আদিবাসী বলা যেমন ভুল, তেমনি রাষ্ট্রীয় তালিকায় একটি শব্দ নেই বলে তাদের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় অস্বীকার করাও যৌক্তিক নয়।
আদিবাসী পরিচয়ের প্রশ্নে শেষ কথা বলার অধিকার সবচেয়ে হচ্ছে সেই জনগোষ্ঠীর নিজের। কোনো জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব স্বীকার করার কারণে বাঙালি পরিচয়টি ছোট হয়ে যায় না। একটি ভূখণ্ডের ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি ও জনগোষ্ঠীর স্বাতন্ত্র্যকে স্বীকার করার মধ্য দিয়েই একটি রাষ্ট্র তার নিজস্ব বহুত্ববাদী চরিত্রকে যেমন সমৃদ্ধ করে, তেমনি সে আধুনিকতার দিকে ধাবিত হয়। কাজেই আদিবাসী বিতর্কে না গিয়ে আমদের ঠিক করা উচিত বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের একটি জনগোষ্ঠীর পরিচয় নির্ধারণের নৃবৈজ্ঞানিক মানদণ্ড কী হবে ?
লেখক : রঞ্জনা বিশ্বাস, সমাজ চিন্তক, লেখক ও গবেষক