ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ খবর ]
আন্তর্জাতিক চিঠি দিবস

ম্যাসেঞ্জারের আড়ালে ডাক দিয়ে যায় চিঠির মমতা

এস এম মুকুল
প্রকাশিত: ১৮:৫৭, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ম্যাসেঞ্জারের আড়ালে ডাক দিয়ে যায় চিঠির মমতা
যদিও আধুনিক প্রযুক্তির যুগে হাতে লেখা চিঠির জায়গা দখল করে নিয়েছে ই-মেইল, মেসেজ বা হোয়াটসঅ্যাপ, তবুও চিঠির সেই মায়া আজও অনেকের হৃদয়ে রয়ে গেছে।

শেষ কবে কাকে চিঠি লেখা হয়েছে, তা কি মনে আছে! নেই তো! না থাকারই কথা।  কারণ এখন ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারের সাহায্যে চাইলেই টুক করে মেসেজ পাঠানো যায়।  কিন্তু একসময় চিঠিই ছিলো- কখনো যুদ্ধক্ষেত্রের সাহস জোগানো বার্তা, কখনো প্রেমের অনুভূতি প্রকাশ, কখনোবা প্রিয়জনের খোঁজ-খবরের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।  

একসময়ে দূরে থাকা আপনজনের সঙ্গে যোগাযোগের একটি মাধ্যম ছিল চিঠি। শুধু দূরে নয়, অন্তরের খুব কাছের কাউকে মুখে না বলতে পারা কথাগুলো সযত্নে সাজিয়ে নেওয়া হতো চিঠিতে। একেকটি চিঠিতে ছিলো কত গল্প, কত যে ইতিহাস, প্রেক্ষাপট! চিঠিজুড়ে থাকতো আবেগ-অনভূতির কথামালা। 

শূণ্য দশকের আগে চিঠি লেখার ঐতিহ্য একসময় ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির আবির্ভাবে এই চর্চা ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে।

Advertisement

একসময় মানুষ চিঠি লিখে নিজেদের মনের ভাব, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করতেন। চিঠির মাধ্যমে ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলো আরও ঘনিষ্ঠ এবং গভীর হতো। একটি হাতের লেখা চিঠি ছিল ব্যক্তিগত স্পর্শের প্রতীক, যা আজকের ডিজিটাল বার্তায় পাওয়া সম্ভব না।

চিঠি! এ বিষয়টির সঙ্গে যেন জড়িয়ে আছে নানা স্মৃতি, নানা আবেগ। ডিজিটাল যুগে চিঠির প্রয়োজন ফুরিয়েছে। কিন্তু একসময় চিঠিই ছিলো ব্যক্তিগত আদান প্রদানের মাধ্যম।  যদিও আধুনিক প্রযুক্তি এসে এসএমএস থেকে শুরু করে বিভিন্ন অ্যাপের সাহায্যে চ্যাট, যোগাযোগের তাৎক্ষণিক মাধ্যম খুলে দিয়েছে।  ফলে চিঠির আর প্রয়োজন হয় না। হাতে লেখা চিঠি তো দূর এমনকি ই-মেইলে লেখা ব্যক্তিগত চিঠিও প্রায় উঠেই যাচ্ছে। কিন্তু তারপরও চিঠির আবেগ, অনুভূতি কেড়ে নিতে পারেনি এসএমএস বা চ্যাটিং।

আজ ১ সেপ্টেম্বর, আন্তর্জাতিক চিঠি দিবস। আজকের এই দিনটি আন্তর্জাতিক চিঠি দিবস হিসেবে স্বীকৃত।  জানা যায়, ২০১৪ সালে প্রথম অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক রিচার্ড সিম্পকিনের হাত ধরে এই দিবসের প্রচলন শুরু হয়। নব্বই দশকের শেষের দিকে সিম্পকিন নিজ দেশের বড় ব্যক্তিত্বদের চিঠি পাঠাতেন। অনেক সময় সেই চিঠির উত্তর পেতেন না। তবে যখন পেতেন, তখন তাঁর আনন্দের সীমা থাকত না। এই আনন্দ নাকি তাঁর কাজকর্মে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দিত। সেই ভালোবাসা থেকে সিম্পকিন ২০১৪ সালে এই দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি চান চিঠি লেখার চর্চা আবার ফিরে আসুক।

চিঠি পেলে আমাদের আনন্দের সীমা থাকে না।  চিঠি মানে কুশল বিনিময়, গুরুত্বপূর্ণ খবর আদান-প্রদান, মনের কথা জানানো, সুসংবাদ অথবা দুঃসংবাদ—সবকিছু ছিল এই চিঠির ভিতর। বাড়িতে বাড়িতে ডাকহরকরা বা পোস্টম্যান পৌঁছে দিয়ে আসতেন খামে ভরা চিঠি।

তাতে বসানো দেশ-বিদেশের ডাকটিকিট সংগ্রহের প্রচলনও তুঙ্গে ছিল শিশু-কিশোরদের মধ্যে। পত্রমিতালি হতো দেশ-বিদেশের বন্ধুদের সঙ্গে। চিঠি নিয়ে আসত চাকরির খবর, পদোন্নতির সংবাদ, নতুন প্রাণের আগমনবার্তা, নয়তো বিয়ের নেমন্তন্ন।  আবার কোনো বিপদ, অসুস্থতা, নয়তো কারও মৃত্যুসংবাদ নিয়ে আসত চিঠির বার্তা।

যুগে যুগে চিঠির ভাষার সাহিত্যমূল্য কিন্তু আমাদের অবাক করেছে, করেছে মুগ্ধ। চিঠির আদলে লেখা রবিঠাকুরের গল্প ‘স্ত্রীর পত্র’, কাজী নজরুল ইসলামের ‘বাঁধনহারা’র মতো পত্রোপন্যাস তো বটেই, বিভিন্ন সময়ে লেখা জীবননিষ্ঠ চিঠিতে একেকটি সময়ের আখ্যান লেখা থাকে। অশভিচে জার্মান কনসেনট্রেশন ক্যাম্প থেকে ইহুদি বন্দীদের লেখা চিঠির সংকলন নিয়ে লেখা বইগুলো আজও সাক্ষ্য বহন করছে সেই দুঃসহ সময়ের। নেলসন ম্যান্ডেলা আর আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর দেশের জন্য কারাবরণের সময়ে লেখা চিঠিগুলো যেন একেকটি প্রামাণ্য ঐতিহাসিক দলিল। মহাত্মা গান্ধী, আলবার্ট আইনস্টাইন, জওহরলাল নেহরু এমনকি হিটলার, মুসোলিনির চিঠিগুলো আজও আমাদের ইতিহাসের পাঠ দেয়।

চিঠি দিবসের গুরুত্ব এখনও অমলিন
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে স্কুল, লাইব্রেরি ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে এই দিনটিকে ঘিরে নানা আয়োজন হয়। চিঠি লেখা কর্মশালা, প্রতিযোগিতা, প্রদর্শনী ইত্যাদির মাধ্যমে শিশুদের মধ্যে এই ঐতিহ্য সম্পর্কে আগ্রহ জাগিয়ে তোলা হয়।

যদিও আধুনিক প্রযুক্তির যুগে হাতে লেখা চিঠির জায়গা দখল করে নিয়েছে ই-মেইল, মেসেজ বা হোয়াটসঅ্যাপ, তবুও চিঠির সেই মায়া আজও অনেকের হৃদয়ে রয়ে গেছে।

আন্তর্জাতিক চিঠি দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিন নয়, বরং এটি আমাদের সেই অতীতকে স্মরণ করার এবং অনুভূতির গভীরতায় ফিরে যাওয়ার একটি অনন্য সুযোগ। 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এস এম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!