স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণের সর্বোচ্চ ফোরাম সিনেট। তবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) প্রায় এক দশক ধরে এই গুরুত্বপূর্ণ ফোরামের কোনো অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়নি। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯৭৩-এর ২১ ধারা অনুযায়ী, উপাচার্যকে বছরে অন্তত একবার সিনেটের সভা আহ্বান করতে হয়। কিন্তু রাবিতে সর্বশেষ সিনেট অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৬ সালের ১৯ মে। এরপর গত ১০ বছরে আর কোনো অধিবেশন হয়নি।
.png)
২০১৬ সালের ওই ২২তম অধিবেশন তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মিজানউদ্দীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহানের পূর্ণ মেয়াদে কোনো সিনেট অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়নি। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর উপাচার্যের দায়িত্ব নেওয়া অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীবের সময় রাকসু ও সিনেটের ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচন হলেও সিনেটের কোনো সভা আহ্বান করা হয়নি।
এর আগে রাবিতে দীর্ঘ সময় সিনেট কার্যক্রম বন্ধ থাকার নজিরও রয়েছে। ২০০১ সালের ২৮ ও ২৯ জুন ২০তম সিনেট অধিবেশনের পর টানা ১৪ বছর সভা অনুষ্ঠিত হয়নি। পরে ২০১৫ সালের ১৮ মে ২১তম অধিবেশনের মাধ্যমে সেই অচলাবস্থার অবসান হয়। এর এক বছর পর ২০১৬ সালের ১৯ মে সর্বশেষ ২২তম অধিবেশন বসে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী, রাবির সিনেটে মোট ১০৫ জন সদস্য থাকার কথা। এর মধ্যে উপাচার্য পদাধিকারবলে সভাপতি, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ সদস্য এবং রেজিস্ট্রার সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া সরকারের মনোনীত পাঁচজন, স্পিকারের মনোনীত পাঁচজন সংসদ সদস্য, চ্যান্সেলরের মনোনীত পাঁচজন শিক্ষাবিদ, সিন্ডিকেট মনোনীত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পাঁচজন প্রতিনিধি, শিক্ষা পরিষদ মনোনীত পাঁচজন কলেজ অধ্যক্ষ ও ১০ জন কলেজ শিক্ষক রয়েছেন।
এ ছাড়া অধিভুক্ত শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান দুইজন, নিবন্ধিত গ্র্যাজুয়েটদের ভোটে নির্বাচিত ২৫ জন, শিক্ষকদের ভোটে নির্বাচিত ৩৩ জন এবং শিক্ষার্থীদের ভোটে নির্বাচিত পাঁচজন প্রতিনিধি সিনেটের সদস্য হন।
রাকসু ভিপি ও সিনেট সদস্য মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষ ভোটে সিনেটের ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচিত হলেও এখনো তাদের শপথ পড়ানো হয়নি। বিষয়টি প্রশাসনকে একাধিকবার জানানো হলেও সিনেট অধিবেশন আয়োজন বা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিতে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
তার দাবি, নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধিদের শপথ না করানো এবং দীর্ঘদিন সিনেট অধিবেশন না হওয়ার বিষয়টিকে শুধু প্রশাসনিক গাফিলতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর পেছনে প্রশাসনের কোনো বিশেষ সিদ্ধান্ত বা উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, তা নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে।
আরেক সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি ফাহিম রেজা বলেন, বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনের কাছে সিনেট অধিবেশন আয়োজনের দাবি জানানো হলেও তারা শুধু আশ্বাস ও নানা অজুহাত দিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছে।
সিনেট অকার্যকর থাকার বিষয়ে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব বলেন, সিনেটের আগের সদস্যদের মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। দীর্ঘদিন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় সদস্যদের খুঁজে বের করাটিও প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাকসুর সাধারণ সম্পাদক ও সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, সিনেট সচল করতে হলে নিবন্ধিত গ্র্যাজুয়েট ক্যাটাগরিতে নতুন নির্বাচন আয়োজন করে সদস্য নির্বাচন করতে হবে। এ নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের।
বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর অল্প সময়ই হয়েছে। তবে সিনেটকে কার্যকর করার বিষয়ে তারা চিন্তাভাবনা করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো সিনেটের মাধ্যমে নেওয়ার লক্ষ্যেই কাজ চলছে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব বর্তমান পরিস্থিতির জন্য তার প্রশাসনকে দায়ী করার সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, তারা প্রায় দেড় বছর দায়িত্বে ছিলেন। এর আগে দীর্ঘ ১৫ বছরে কী হয়েছে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। বর্তমান প্রশাসনের হাতে পর্যাপ্ত সময় রয়েছে এবং তাদেরই সিনেট সচল করার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।