ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ শিক্ষা ]

মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা

দেশে ২২ শতাংশের বেশি ৪ কোটি মানুষ নিরক্ষর!
এস এম মুকুল
প্রকাশিত: ১০:৫৮, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা
পরিসংখ্যান অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয় হলেও, একটি শতভাগ সাক্ষর সমাজ গঠনে মানসম্মত শিক্ষা ও প্রযুক্তিভিত্তিক সাক্ষরতা প্রসারে আরও দীর্ঘ পথ চলা বাকি।

দেশে এখন সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। বিপরীতে এখনো ২২ শতাংশের বেশি মানুষ নিরক্ষর। অর্থাৎ তাঁরা কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা ও দক্ষতার বাইরে রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছে বিদ্যালয়বহির্ভূত ও ঝরে পড়া শিশু-কিশোর, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং শিক্ষা থেকে বঞ্চিত প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও পুরুষ! 

আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, দেশে সাক্ষরতার হার ক্রমান্বয়ে বাড়লেও এখনও মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ এখনো নিরক্ষরতার অন্ধকারে রয়ে গেছে। তারচেয়েও বড় বিষয় তিন বছর ধরেই দেশে সাক্ষরতার অগ্রগতি শূন্যের কোটায় ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশে স্থির রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, পাঁচ বছরে সাক্ষরতার হার বেড়েছে মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ। ফলে এখনো দেশের ২১ দশমিক ৯ শতাংশ বা প্রায় চার কোটি মানুষ নিরক্ষর। 

নিরক্ষরতা দূরীকরণে সরকারি সংস্থা ‘উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো’ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তাদের তথ্যমতে, দেশের ৬৪ জেলার ২৪৮টি উপজেলার ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী প্রায় সাড়ে ৪৪ লাখ মানুষকে মৌলিক সাক্ষরতার আওতায় আনা হয়েছে।

Advertisement

৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্যের সঙ্গে মিল রেখে বাংলাদেশে দিবসটির প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়েছে—‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা।’ 

বিশ্বের প্রতিটি মানুষের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার প্রত্যয়ে ইউনেস্কোর উদ্যোগে ১৯৬৭ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী এবং ১৯৭২ সাল থেকে বাংলাদেশে প্রতি বছর ৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে সর্বজনীন, অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার ব্যবস্থা এবং নিরক্ষরতা দূর করার অঙ্গীকার রয়েছে।

জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ৪ নম্বর লক্ষ্যমাত্রায় ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের সব পূর্ণবয়স্ক নারী-পুরুষ এবং প্রবীণ জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশের সাক্ষরতা ও হিসাব-নিকাশে দক্ষতা অর্জনের কথা বলা হয়েছে। সেই লক্ষ্য অর্জনেও বাংলাদেশ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

কথায় আছে, যে দেশে সাক্ষরতার হার বেশি, সে দেশ তত উন্নত। ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, লুক্সেমবার্গের মতো ইউরোপের দেশগুলো আয়তনে ছোট হলেও সাক্ষরতার হার শতভাগ হওয়ায় তাদের জনগণ উন্নয়নের সুফল ভোগ করছে। অন্যদিকে মালি, নাইজার, সোমালিয়ার মতো তুলনামূলক বৃহদায়তনের আফ্রিকান দেশগুলোতে সাক্ষরতার হার অনেক কম হওয়ায় তারা ক্ষুধা, দারিদ্র্যতাসহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যায় জর্জরিত। 

অর্থনীতি ও জনসংখ্যায় বৃহৎ দেশগুলোসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের সাক্ষরতার হার বাড়ানোর জন্য নানামুখী কর্মসূচি নিয়েছে। বাংলাদেশেও সামগ্রিক সাক্ষরতার হার বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও এখনও প্রায় ২৩ শতাংশ মানুষের সাক্ষরজ্ঞান নেই।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার সময় আমাদের দেশে সাক্ষরতার হার ছিল প্রায় ১৬.৮ শতাংশ এবং ১৯৭৪ সালের প্রথম আদমশুমারিতে তা দাঁড়ায় ২৬.৮৩ শতাংশে। ভারতের সাক্ষরতার হার ৮০.৯ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৯৩ শতাংশ, সিঙ্গাপুরে ৯৭.৬ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ৯৫ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৯৮.৮,তাংশ, অস্ট্রেলিয়ায় ৯৯ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রে ৯৯ শতাংশ এবং বাংলাদেশে সামগ্রিক সাক্ষরতার হার ৭৭.৯ শতাংশ। 

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত শিক্ষা আইন নেই, তবে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা আইন ২০১৪, বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন ১৯৯০ অনুযায়ী সামগ্রিক শিক্ষার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

তবে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে সাক্ষরতার হারে বাংলাদেশ বেশ আশাব্যঞ্জক অবস্থানে রয়েছে। প্রথম স্থানে রয়েছে মালদ্বীপ, যাদের সাক্ষরতার হার ৯৭.৮৬ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে শ্রীলঙ্কা, যাদের সাক্ষরতার হার ৯২.৩৮ শতাংশ। তৃতীয় স্থানে বাংলাদেশ, যাদের সাক্ষরতার হার ৭৮ শতাংশ। অন্যান্য দেশের মধ্যে ভারতের সাক্ষরতার হার ৭৪.৩৭ শতাংশ এবং পাকিস্তানের ৫৮ শতাংশ।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয় হলেও, একটি শতভাগ সাক্ষর সমাজ গঠনে মানসম্মত শিক্ষা ও প্রযুক্তিভিত্তিক সাক্ষরতা প্রসারে আরও দীর্ঘ পথ চলা বাকি।

ব্যক্তি ও সমাজের অগ্রগতির অন্যতম ভিত্তি, সাক্ষরতা। শিক্ষা, সচেতনতা ও জ্ঞানচর্চার বিস্তারের মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে একটি আলোকিত ও সক্ষম সমাজ। জ্ঞানের আলোয় সমৃদ্ধ হোক বাংলাদেশ, আগামী প্রজন্ম বেড়ে উঠুক মেধা ও মননশীলতায়।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এস এম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!