ঢাকা,  শনিবার   ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩

[ শিল্প ও সাহিত্য ]
গল্প

জৈগুন বিবি

শহীদুল হক বাদল
প্রকাশিত: ১১:৪৪, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জৈগুন বিবি
এমনসময় বাড়ির পাশেই মসজিদ থেকে আযান শোনা গেল। দাদাজানও ওজুর পানি দেওয়ার জন্য আমার দাদীকে তাগাদা দিলেন। অযুর জন্য পানি দিয়ে দাদীজান কিছু চাউল, পেঁয়াজ-মরিচসহ আরো কী যেন একটা পোটলায় বেঁধে জৈগুন বিবিকে দিলেন

ভাঙ্গা বেড়া আর অনেকটাই উদোম ঘরের ছালের চাউনী তলেই জৈগুন বিবির নিবৃতে নিবাস। যৌবনে- স্বামী-সন্তান সবই ছিল তাঁর । একাত্তরের যুদ্ধ কেড়ে নিলো তার স্বামীকে। সেও তো গত হয়েছে না কতোটা বছর? বয়সের ভারেও তখনো হাল ছাড়েনি সে। দু’চোখের কোণেই ছিল- একমাত্র ছেলেকে নিয়ে তাঁর ঝলমলে এক স্বপ্নের খোয়াব। 

একদিন হঠাৎ, কালসাপের দংশনে হারালো সে বুকের মাণিক। পুত্রশোকে ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধার নিভে গেল যেন শেষ আশার আলোও। চোখের দৃষ্টিও ঝাপসা হয়ে আসছে ক্রমেই। কাঁপা হাতে লাঠিই ভর করে ভিক্ষার থলি নিয়ে এখন দ্বারে-দ্বারে সে করুনা মাগে। তাঁর বিষন্ন এই আর্তনাত যেন- মহাকালের এক অসহায় আর্জি। 

তবুও, অভিযোগ নেই তাঁর কোনোই । ঠক্ ঠক্ লাঠির শব্দে, গুনগুন সুরে রোমন্থন হয় তার সে-ই হারানো দিনের শত স্মৃতি। জৈগুন- বিরামহীন সে হাটছে, পথ যেন আর ফুরায় না...

সেদিন, বাড়ির বৈঠকখানায় চেয়ারে বসে আমার দাদাজান আয়েশ করেই হুক্কায় দম দিচ্ছিলেন। তাঁর পাশেই, বেতের মোড়ায় বসে দাদীজানও খিলিপান বানাচ্ছেন। 

এমনসময় জৈগুনবিবি এসেই ভিক্ষার থলি হাতে দাদীজানের পাশে পিঁড়িটা টেনে বসে দাদাজানকে বললো-
কি গো দেওয়ান ছাব! আপনের শরীরটা ভালানি? আইজ কিন্তু জব্বর রইদ পড়ছে। এই গরমে বাড়ি-বাড়িই গিয়া ভিক্ষা মাগনের জোর পাইতাছি না তেমন। পারলে ক’য়ডা ভিক্ষার চাউল বেশি কইরা দিয়া দেইন। মনডাও ভালা ঠেকছেনা আইজ।  একথা বলেই জৈগুন দাদীজানের দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকালো। 

তাঁর হাতে পানের বাটা দেখে বললো-
: ও মাইজি! একটু কড়া জর্দা দিয়া আমারেও একটা পান দিও গো। পান চিবুতে চিবুতে জৈগুনবিবি, দাদাজানকে গতরাতে তাঁর দেখা স্বপ্নের বয়ান শুরু করলো-
হুনেন দেওয়ান ছাব, গতকাইল শেষ রাইতে আপনের মরহুম মাতাজিকে স্বপ্নে দেখলাম। আহ্! কী নুরানীই না চেহারা তার। 

দেখি কী জানেন- রাজরানীর বেশে বেহেস্তের বাগানে তিনি পানি দিতাছেন। তখনই আমি উনাকে ডাইক্যা কইলাম- ঐ দুইন্যাতে তো মেলা কাম-কাজ করছো তুমি, এখন শুধু নাক ডাইক্যা ঘুমাও। এই কথা শুনে তিনি কী কইলেন জানেন-

: ও জৈগুন…! পোলা-মাইয়্যাদের ছাইরা এখানে এত্তো আরাম-আয়েশ ভালা লাগেনা রে।  অতঃপর একটু দম নিয়ে জৈগুন বিবি ভাঙা-ভাঙা স্বরে বললো-

উনি আমার মাথায় হাত বুলাইয়া আরও কইলো- কী রে জৈগুন, এত্তো শুকাইয়া গেলি কেমনে? আয় এদিকে। কয়ডা পোলাও-ভাত, মুরগির মাংস আর চিতল মাছের পেটি দিয়া আমার লগে পেট ভইরা খাইয়্যা যা। তুইও তাড়াতাড়ি ঐ মিছা দুইন্যার মায়া ছাইরা চইল্যা আয় এখানে- কী কছ?

দিজানও জৈগুনবিবির কথায় মিটমিট করে আঁড়ালে হাসছেন। তাই সে মুখটা ভার করে বললো-

আপনার মায়ের এই কথাডা হুইন্যাতো আমার গলা শুকাইয়া গেছিলো তখন। আমিও উনারে কইলাম, তোমার বেহেস্তে তুমিই থাকো। ঐখানে আমারে একদম টানাটুনি কইরো না তো। 

এই দুইন্যাতেই শাক-শুঁটকি আর মরিচের ভর্তা খাইয়াই আমি শতগুণে ভালা আছি। পরে মনে হয়, তিনিও বিষয়টা বুঝবার পাইয়া হাসিমুখে আমারে কইলো- ধুর পাগলি, ভয় পাইছসনি? 
এমনি এমনি তোর লগে মজাক করলাম। তবে দুইন্যার মায়া কইরা কী আর আইবো জৈগুন। 

বেহুদাই সবার নানান চিন্তা আর কষ্ট- তাই না? যাউক, আরও ক’য়ডা দিন ঐখানেই থাক। তোর মনের হাউস মিইট্যা গেলে বিছনায় পড়বি যখন, তখন নিজের থাইক্যাই উপরঅলার কাছে যাওনের অস্থিরতা বাড়তে থাকবো- দেখিস।

এসব কথা শুনে দাদাজানও রসিকতা করে তাঁকে বললো-
ও জৈগুন, আগেকার মতো সুখের দিন এখন আর নাই রে। এই আমলে হগ্যলেই নানান পেরেশানী আর টানাটুনির মধ্যে আছে। জিনিসপত্রের যে দামদর, আমার মাইজিরে আবার স্বপ্নে দেখলে উনারে কইছ- মোরগ-পোলাও যেন স্বপ্নে আর না দেখায় তোরে। নিজেরাই তো মাসে একবার ভালা কিছু খাইবার পারি না। তোরে খাওয়ামু কী কইরা বল ? 

জৈগুনবিবির মনে আশা ভঙের কারনে- তার চেহারায় কিছুটা মলিনভাব ফুটে উঠলো। তা বুঝতে পেরেই দাদাজান তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে বললো-

দেশের জন্য দোয়া কর রে জৈগুন। জব্বর কঠিন সময় পাড়ি দিতে হইবো সবার। দিনে-দিনে বেবাক লোকজনই পাষাণ হইয়্যা যাইতেছে। আদব-কায়দা, দয়া-মায়া, সবই উইঠ্যা গেছে মাইনষের মন থাইক্যা। এখন উপরঅলাই শেষ ভরসা।

এমনসময় বাড়ির পাশেই মসজিদ থেকে আযান শোনা গেল। দাদাজানও ওজুর পানি দেওয়ার জন্য আমার দাদীকে তাগাদা দিলেন। অযুর জন্য পানি দিয়ে দাদীজান কিছু চাউল, পেঁয়াজ-মরিচসহ আরো কী যেন একটা পোটলায় বেঁধে জৈগুন বিবিকে দিলেন। 

এগুলো পেয়েই জৈগুনের চোখের তারায় একটা প্রশান্তিভাব উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। তারপর, কাঁপা লাঠিই ভর করে তড়িগড়ি সে গন্তব্যপথে পা বাড়ালো…

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
Durga Puja
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!