ইতিহাসে ভালোবাসার বিশেষ বিশেষ বর্ণণা লিখিত হয়েছে। সেসব ইতিহাস পৃথিবীজুড়ে যুগের পর যুগ মানুষের হৃদয়ে কখনো হাহাকার সৃষ্টি করে, কখনো উজ্জীবিত করে নতুন করে ভালোবাসার পরিপত্র সৃষ্টিতে। ট্রয় নগরির ধ্বংসের ইতিহাস যেভাবে ব্যথিত করে অন্যদিকে শিল্পসাহিত্যে লায়লি-মজনু উপখ্যানের করুণ পরিণতিও ব্যথিত করে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের পথচলায় ভালোমন্দের হিসেব করতে বাধ্য করে এমন সব ঘটনা-রটনা। এসব ঘটনা ও রটনা মূলত বহু কারণেই। কেননা মানুষের জীবনের সব থেকে মধুর এবং সুন্দর একটা অনুভূতি শিশির জমে জমে পাথরের রূপ নেওয়া ভালোবাসা শব্দটির মধ্যেই নিহিত রয়েছে। যে জীবনে প্রণয় নেই, ভালোবাসার অনুভূতি নেই সেই জীবন অসার, নির্জীব। তাই বলা যায় মানুষের জীবনে ভালোবাসা না আসলে তার জীবনও আসলেই যান্ত্রিক। তাই হয়তো যুগে যুগে হাজারো কবি হাজারো মহৎ বাক্তি প্রণয়ের পথে ছুটেছেন। কেউ সফল হয়েছেন কেউ বা লিখে গেছেন প্রণয়ের ব্যর্থ উপাখ্যান।
ভালোবাসা নিয়ে অনেক অনেক গল্প কাহিনী থাকলেও এসব যে মানুষের জীবনের সাথে সম্পূর্ণরূপে সম্পৃক্ত তা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। এটা অস্বীকার করার কোনো জো নেই যে, মানুষের জীবনে একবার হলেও ভালোবাসার মোহন বাতাসের ছোয়া লাগেনি। হয়তো কারও জীবনে সেই বাতাসের ছোয়ায় মনটা উড়ন্ত কবুতর হয়েছে। আবার কারো কারো পেয়ারা জীবনে ভালোবাসার অদৃশ্য বায়ু করে দিয়েছে শান্ত, এনে দিয়েছে একাকিত্বের কারাগার। তাই হয়তো দস্তয়েভস্কি বলেছেন- ‘কেউ ভালোবাসা পেলে এমনকি সুখ ছাড়াও সে বাঁচতে পারে’। দস্তয়েভস্কির সাথে অধিকাংশ মানুষ সুর মেলাবেন। কারণ প্রতিটি জীবন ভালোবাসার সুখ, দু:খ, মিলন, বিরহের স্বাদ সঙ্গোপনে গ্রহণ করেছে। এ কারণেই পৃথিবী জুড়ে পালিত হচ্ছে ভালোবাসা দিবস। কেউ কেউ এই দিবসটিকে অস্বীকার করছে। কোনো কোনো মৌলবাদি চিন্তায় অন্ধ কথিত বোদ্ধারা এই দিবসকে ফেৎনা বলছে। কিন্তু এটা অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই যে, পৃথিবীর বিশেষ বিশেষ কারণ, জয়-পরাজয়, মিলন-বিচ্ছেদ, আগমণ, প্রস্তানের দিবস পালিত হয়ে থাকে। যেহেতু অনেক দিবসই পালিত হয়ে থাকে বিশেষ কোনো কারণকে স্মরণে রাখতে তাই ভালোবাসাও নির্দিষ্ট দিনে যাপিত হতে পারে এটা দোষের কিছু নয়। অনেক বোদ্ধারাই বলে থাকেন, ভালোবাসার কোনো দিবস হয় নাকি! কেউ কেউ বলে থাকে ভালোবাসার দিবস উৎযাপন মানেই তো একটা দিনের ভেতরই আটকে থাকা। আসলে বিষয়টি কিন্তু তা নয়। কেননা কোনো দিবসকে উৎযাপন করা মানেই যে সেই দিবসে আটকে থাকা তা সঠিক নয়। এটার গুরুত্ব হচ্ছে - পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই সাধারণ বিষয়গুলো সম্পর্কে জানে। তবুও বারবার তাকে জানিয়ে দেওয়া হয় জানা বিষয়গুলো। কারণ যাতে সেটা তার মাঝে একটা এলার্ম দিয়ে যায়। যেমন বলা যেতে পারে, আপনি কাউকে টাকা ধার দিয়েছেন। সে একটা নির্দিষ্ট দিন আপনাকে পরিশোধ করে দেবে বলেই নিয়েছে। কিন্তু কোনো না কোনো তাগিদ থেকে আপনি নির্দিষ্ট তারিখ আসার আগেই তাকে মনে করিয়ে দিলেন, ভাই আগামী তারিখের কথা মনে আছে। এই যে এলার্ম দেয়া এটার জন্যই একটা দিবস প্রয়োজন। অন্তত এমন দিবস থাকলে বছরে একবার মানুষ ভালো কাজ করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। দিবসকে মনে রেখে অনেকেই ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ হয়ে থাকে।
.png)
এখন আসা যাক, ভালোবাসা দিবস কিভাবে এলো সেই বিষয়ে। বিষয়টি নিয়ে যেহেতু জানা-অজানা অনেক গল্প ও ইতিহাস রয়েছে। তাই সেসব ইতিহাস থেকে কিছু বিষয় অল্পকথায় নজরে আনতে উল্লেখ করা। যদিও সেটা উল্লেখ করা অনিচ্ছাকৃত। ঐ যে মনের মধ্যে এলার্ম বাজছে নতুন করে জানিয়ে দিতে। ১৪ ফেব্রুয়ারি, বিশ্ব ভালবাসা দিবস (ভ্যালেন্টাইন্স ডে) হিসেবে পালিত হচ্ছে। কথিত আছে, প্রাচীন রোমে ১৪ ফেব্রুয়ারি ছিল রোমান দেব-দেবীর রানী জুনোর সম্মানে ছুটির দিন। জুনোকে নারী ও প্রেমের দেবী বলে লোকে বিশ্বাস করত। কারো কারো মতে ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবস হওয়ার কারণ ছিল এটিই।
আবার কেউ বলেন, রোমের সম্রাট ক্লডিয়াস ২০০ খ্রিস্টাব্দে দেশে বিয়ে প্রথা নিষিদ্ধ করেন। তিনি ঘোষণা দেন, আজ থেকে কোনও যুবক বিয়ে করতে পারবে না। যুবকদের জন্য শুধুই যুদ্ধ। তার মতে, যুবকরা যদি বিয়ে করে তবে যুদ্ধ করবে কারা? সম্রাট ক্লডিয়াসের এ অন্যায় ঘোষণার প্রতিবাদ করেন এক সাহসি যুবক, নাম ভ্যালেন্টাইন। এযুবকের প্রতিবাদে সম্রাট রাজদ্রোহের শাস্তি হিসেবে তাকে মৃত্যুদন্ড দেয় । ১৪ ফেব্রুয়ারি শাস্তি কার্যকর হলে ভ্যালেন্টাইন দিবস হিসেবে পালিত হতে থাকে দিবসটি।
কারও কারও মতে, প্রাচীন রোমে ভ্যালেন্টাইন নামে একজন চিকিৎসক ছিলেন। অসুস্থ মানুষের ওষুধ খেতে কষ্ট হয় বলে তিনি তেঁতো ওষুধ ওয়াইন, দুধ বা মধুতে মিশিয়ে খেতে দিতেন। সেই ডাক্তার খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন। এই ধর্মে বিশ্বাসীদের সে সময় শাস্তি দেওয়া হতো। একদিন রোমের এক কারা প্রধান তার অন্ধ মেয়েকে ভ্যালেন্টাইনের কাছে নিয়ে এসেছিলেন চিকিৎসার জন্য। ভ্যালেন্টাইন কথা দিয়েছিলেন, তিনি তার সাধ্য মতো চিকিৎসা করবেন। মেয়েটির চিকিৎসাকালীন হঠাৎ একদিন রোমান সৈন্যরা এসে ভ্যালেন্টাইনকে বেঁধে নিয়ে যায়। ভ্যালেন্টাইন বুঝতে পেরেছিলেন, খ্রিস্টান হওয়ার অপরাধে তাকে মেরে ফেলা হবে। ২৬৯ খ্রিষ্টাব্দে বা কারও মতে ২৭০খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি রোম সম্রাট ক্লডিয়াসের আদেশে ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়।তার আগে ভ্যালেন্টাইন অন্ধ মেয়েটিকে বিদায় জানিয়ে একটি চিরকুট লিখে রেখে গিয়েছিলেন। তাকে হত্যার পর কারা প্রধান চিরকুটটি দিয়েছিলেন মেয়েটিকে। তাতে লেখা ছিল,
‘ইতি তোমার ভ্যালেন্টাইন’ ।
মেয়েটি চিরকুটের ভেতরে বসন্তের হলুদ ত্রৌকস ফুলের আশ্চর্য সুন্দর রং দেখতে পেয়েছিল কারণ, ইতোমধ্যে ভ্যালেন্টাইনের চিকিৎসায় মেয়েটির অন্ধ দু’চোখে দৃষ্টি ফিরে এসেছিল। ভালবাসার এসব কীর্তির জন্য ৪৯৬ খ্রিস্টাব্দে পোপ জেলাসিয়ুস ফেব্রুয়ারির ১৪ তারিখকে ভ্যালেন্টাইন্স ডে হিসেবে ঘোষণা করেন। সেই থেকে এই দিনটিকে মানুষেরা ভ্যালেন্টাইন্স ডে হিসেবে পালন করে আসছে।
ইতিহাসে ভ্রান্তি থাকতে পারে, তবে দিবস উৎযাপন যে কোনো বিশেষ কারণে হয় বা হচ্ছে সেটা মানতে কারো অসুবিধে বা দ্ব›দ্ব থাকার কথা নয়। কেননা কোন একটা দিনকে যখন বিশেষ দিন হিসেবে স্বীকৃতি পায় তার পেছনে অবশ্য বড় রকমের কোনো কারণ থাকে। আমরা সে কারণ খোঁজার পাশাপাশি, নিজেরা ভালোবাসায় সিক্ত হবো, ভালোবাসায় সিক্ত করবো আমাদের আপনজনদের। কেননা ভালোবাসলেই পৃথিবী আমার হবে, আমাদের হবে।