কিছুদিন আগে এক বিতর্কসভায় আমন্ত্রিত হয়েছিলাম। বিষয় ছিল ‘সংবাদ মাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা’। অর্থাৎ সংবাদমাধ্যম কি বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে? তাদের সংবাদ আজ সমাজের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য? একজন বর্ষীয়ান সাংবাদিক উঠে বললেন, ‘পুলিশ যেমন ভাল পুলিশ এবং খারাপ পুলিশ হন, চিকিৎসক যেমন ভাল ও খারাপ দুই প্রকারই হন, শিক্ষক, এমনকী এক জন দোকানদারের মধ্যেও যদি প্রকারভেদ থাকতে পারে, তবে সাংবাদিকদের মধ্যেও ভাল ও খারাপ, সাদা এবং কালো, এই ভিন্নতা থাকাটাই কি স্বাভাবিক ঘটনা নয়? তবে আমরা যেটা দেখছি সেটা হল ‘এজ অফ ডেকাডেন্স।’
বালিতে মুখ গুঁজে বাস্তবের দিকে দৃষ্টি সরিয়ে এই ধরনের কথার খেলা চালানো যায়। কিন্তু আমরা একথা ভাবি না যে সাদা ও কালোর মধ্যে ধূসরতা থাকে। আর সেই ধূসরতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে প্রকৃত সত্য। মায়ানমারের সামরিক জুন্টা সরকার বিরোধী দলকে স্বীকৃতি দিল এবং স্বাধীন সংবাদপত্রের উপর থেকে বাধানিষেধ প্রত্যাহার করল। দক্ষিণ এশিয়ার সংবাদমাধ্যম তা নিয়ে নাচানাচি করল। তারপরে যখন রোহিঙ্গা বিতারণের মাধ্যমে বাংলাদেশের ওপর স্থায়ী ক্ষত তৈরি করল তখন তারা নিশ্চুপ থাকল কেন? এ কথা সত্যি যে বিশ্বায়নের পর সংবাদমাধ্যমেও এক দ্রুত পরিবর্তন এসেছে। সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে বদলে দিয়েছে অনেকটাই। কলেজ জীবনে যখন লিটল ম্যাগাজিন বার করতাম, তখন পেশাদারি হতে চেষ্টা করলেও বাণিজ্যিক হওয়ার কথা ভাবিনি। কে কী বলল কিছু আসত যেত না। সংবাদ মাধ্যমও তাই ছিল। কিন্তু বাজার অর্থনীতির আগমন পাল্টে দিয়েছে তথাকথিত সব মূল্যবোধকে।
.png)
১৯৯৮ থেকে ২০০৬, এই অল্প কয়েক বছরের মধ্যে ভারতে ৫০টি স্যাটেলাইট নিউজ চ্যানেলের জন্ম হয়। তারপরেই এটি দ্রুত বেড়ে ৩০০ সংখ্যায় পৌঁছয়। এখন সেই সংখ্যা বাড়তে বাড়তে যে কোথায় পৌঁছেছে, তা বলার নয়। প্রশ্নটা হল, বাজার অর্থনীতিতে এই চ্যানেলগুলোর টিকে থাকার জন্য, বলা হয় তিনটি ‘সি’ প্রয়োজন। একটি ‘সি’ ক্রিকেট, দ্বিতীয় ‘সি’ সিনেমা, আর তৃতীয় ‘সি’ ক্রাইম বা অপরাধ। একই চিত্র বাংলাদেশের। তবে ভারত ও বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের দুটি ভোক্তা সমাজ আছে। একটি অভিজাত। অন্যটি গ্রামীণ। এখানেই গ্যাঁড়াকল। কোন সংবাদ মাধ্যম যদি গ্রামীণ চিত্র বেশি প্রচার করে তাহলে কোনো বহুজাতিক সংস্থা বিজ্ঞাপন দিতে চায় না। প্রত্যন্ত গ্রামের অন্ত্যজ মানুষের সুখ-দুঃখের কথা লিখলে বা বললে কি মার্সিডিজ বেঞ্জ বিজ্ঞাপন দেবে? বরং প্রচ্ছদ-নিবন্ধ যদি হয় গাড়ির যত্ন বা লাইফস্টাইল ম্যানেজমেন্ট, তা হলে খুব সহজেই বিজ্ঞাপন আসে। এটাই বাজার অর্থনীতি।
এবার যে প্রশ্নে সরাসরি চলে আসব তা হল সংবাদ পরিবেশনে নিরপেক্ষতা। ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বার্টন জন এবং পেনসিলভ্যানিয়ার কিরস্টেন জনসন সম্পাদিত একটি বই ‘নিউজ উইথ এ ভিউ’-এ বিভিন্ন প্রবন্ধে বলা হয়েছে, ‘আধুনিক সাংবাদিকতায় নিরপেক্ষতার প্রশ্নে গ্রহণ শুরু হয়েছে’। আগে বলা হত যে কোনো সংবাদমাধ্যম বা সাংবাদিক কোনো ব্যক্তি বা দল যে উঠছে, তাকে টেনে নামাতে পারেন না। আর যে নামছে, তাকে টেনে তুলতে পারে না। তাহলে সংবাদপত্র পারেটা কী? যে উঠছে, তাকে একটু ধাক্কা দিয়ে আরো একটু দ্রুত তুলে দিতে পারে, আর যে নামছে, তাকে ধাক্কা দিয়ে তার পতন আরো ত্বরান্বিত করতে পারে। এটাই সাংবাদিকতার মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এবং আজও প্রাসঙ্গিক। সেজন্যে এখন সাংবাদিকের ভূমিকা কী, তা নিয়ে লেখালিখি চলছে বিস্তর।
আচ্ছা, বাস্তবে সাংবাদিকের ভূমিকা কী? আমেরিকার এক সেনেটর বলেছিলেন, “সাংবাদিকের কাজ হল সত্যকে খুঁজে বার করে তাকে রক্ষা করা। সত্য না থাকলে আস্থা থাকে না, আর আস্থা না থাকলে গণতন্ত্র থাকে না।’’
তুরস্ক, বাংলাদেশ, ভারত, রাশিয়া, ফিলিপিন্সের মতো দেশে সরকার নির্বাচিত হয়, কিন্তু সরকারের কাজ নিয়ে অনুসন্ধান শুরু হলেই শাস্তির খাঁড়া নেমে আসে। নাগরিক সমাজ তখন এগিয়ে আসে। নির্যাতিত, অপমানিত সাংবাদিককে পুরস্কার দিয়ে সামাজিক প্রতিষ্ঠা ফিরিয়ে দেয়। ভারত আবার জাঁক করে যে, সে বিশ্বের ‘বৃহত্তম গণতন্ত্র’। অথচ বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচক অনুযায়ী তার স্থান ১৫০। সরকারের পক্ষ থেকে মিডিয়াকে ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টা কখনো থাকে সূক্ষ্ম ও প্রচ্ছন্ন। আবার কখনো স্থূল ভাবেই বার্তা দেওয়া হয়— স্বাধীন দৃষ্টিভঙ্গি, প্রশাসনের আধিকারিকদের কাজের তদন্তমূলক প্রতিবেদন, সরকারি নীতিকে প্রশ্ন করা বা সরকারের সমালোচনা, এ সব মেনে নেবে না সরকার। যারা সরকারের সমালোচনা করেন, তাদের গায়ে কাদা ছোড়া হয়। তা কেবল রাজনৈতিক রং লাগিয়ে নয়, সাম্প্রদায়িকতার রং লাগানোও ক্রমশ বাড়ছে। ভারতে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল, সরকারের সমালোচনা করার জন্য কোনো সাংবাদিককে রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে গ্রেফতার করা যাবে না, যদি না তিনি সরকারের বিরুদ্ধে, অথবা একাধিক সম্প্রদায়ের ভিতরে হিংসায় উস্কানি দিয়ে থাকেন। সাংবাদিকের গ্রেফতারের সপক্ষে যুক্তি খাড়া করতে সরকার বার বার সংবাদের পিছনে ‘ষড়যন্ত্র’ দেখেছে, কিংবা ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ ব্যাহত করার আশঙ্কা করেছে। তাই অনেক সাংবাদিক আজ কারান্তরালে। আজকের শাসকগোষ্ঠী আশা করে যে সংবাদপত্রের ভূমিকা হবে ‘Decent’ অর্থাৎ সরকারের পক্ষে ‘অমায়িক’। শাসকরা মনে করেন যে, সংবাদমাধ্যমে ‘Dissent’ অর্থাৎ ভিন্নমতের কোনো স্থান নেই।
সংবাদপত্র এই বাধার সম্মুখীন হওয়ায় শিক্ষিত মানুষ আজকাল প্রতিবাদের ভাষা খুঁজতে সোশ্যাল মিডিয়ার আশ্রয় নিচ্ছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় অশিক্ষার ছাপ সমৃদ্ধ উদ্দেশ্য প্রণোদিত প্রচারণা আজকাল দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত ‘তথ্যাদি’ ও ‘তত্ত্বাদি’ যাচাইয়ের সুযোগ কম। সাইবার আইনের প্রয়োগ করা তখনই সম্ভব যখন প্রচারক দেশে থেকে সম্প্রচার করেন। কিন্তু কতজনকে আইনের আওতায় আনবেন। এদের সম্মিলিত অভিঘাত সমাজের ওপর কম নয়। তবে স্বীকার করতেই হবে যে, গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ এবং বাক্স্বাধীনতা হরণের এই জমানায় সোশ্যাল মিডিয়ার অস্তিত্ব বা জোরালো উপস্থিতি খুব জরুরি। তাই এর ব্যবহার দিনদিন বাড়ছে। সোশ্যাল মিডিয়ার এই গ্রহণযোগ্যতার জন্যই বড় বড় সংবাদপত্রগুলিও এই মিডিয়াকে হাতিয়ার করছে। যার ফলে দিন দিন সোশ্যাল মিডিয়ার গুরুত্ব বাড়ছে। সংবাদপত্রের সীমিত পরিসরে পাঠক যা কিছু পান, তার থেকে অনেক বেশি খবর সোশ্যাল মিডিয়াতে পাওয়া যায় এবং বিনা পয়সায়। আগামী দিনে প্রথাগত সংবাদমাধ্যমকে সোশ্যাল মিডিয়া কতটা চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে তার অনেকটাই নির্ভর করছে রাষ্ট্রনীতির ওপরে। বাজার অর্থনীতি সামলে নেয়া যাবে যদি রাষ্ট্র তাদের মনোভাব বদলায়। সরকারি বিজ্ঞাপন আজ সংবাদ মাধ্যমের টিঁকে থাকার একটি বড় শর্ত। কিন্তু সরকারি বিজ্ঞাপন সাধারণত তাবেদার সংবাদ মাধ্যম প্রতিষ্ঠানরাই পাচ্ছে। বিরুদ্ধমত প্রকাশ করলে তারা বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে ব্রাত্য হয়ে পড়ছে। কাজেই গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ সংবাদ মাধ্যম তাদের মূল্যবোধ জলাঞ্জলি দিয়ে সরকারের বশংবদ হয়ে পড়েছে। কাজেই সোশ্যাল মিডিয়াকে আটকাতে গেলে আগে এই একদেশদর্শিতা ছুঁড়ে ফেলে দিতে হবে। নাহলে জায়গা নেবে সোশ্যাল মিডিয়া। সেই জোয়ার তীব্র হলে ক্ষতি রাষ্ট্রের। কিন্তু সেই বোধ সরকারের কবে আসবে?