১৯৫৪ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের আমলে ক্রিমিয়াকে ইউক্রেনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যদিও এটি রাশিয়ার সোভিয়েত ফেডারেশনে ছিল। এই পদক্ষেপটি ছিল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যা সোভিয়েত নেতৃত্বের অধীনে নেওয়া হয়েছিল। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ক্রিমিয়া ইউক্রেনের একটি স্বশাসিত প্রজাতন্ত্র হিসেবে থেকে যায়। যদিও ক্রিমিয়াতে বসবাসরত জনসংখ্যার বেশিরভাগই ছিল রুশ বংশোদ্ভূত, তবুও তারা ইউক্রেনের শাসনাধীনে ছিল।
২০১৪ সালের মার্চ মাসে ক্রিমিয়াতে অনুষ্ঠিত গণভোটে অধিকাংশ ভোটার রাশিয়ার সাথে সংযুক্তির পক্ষে ভোট দেন। তবে অনেক দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা এই ভোটকে অবৈধ বলে আখ্যায়িত করে। গণভোটের পর রাশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ক্রিমিয়াকে নিজেদের অংশ হিসেবে ঘোষণা করে। তবে ইউক্রেন এবং পশ্চিমা দেশগুলি এই সংযুক্তিকে অবৈধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে মনে করে। এর ফলে রাশিয়ার ওপর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
.png)
১৯৭০ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের দ্বারা গৃহীত আন্তর্জাতিক আইনের নীতিগুলির প্রস্তাব অনুযায়ী একটি সার্বভৌম এবং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অথবা স্বাধীন রাষ্ট্রের সাথে অবাধ সংযুক্ত করার মাধ্যমে জনগণ তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রয়োগ করতে পারে।
ক্রিমিয়া ২০১৪ সালে রাশিয়ায় সংযুক্ত হয়, যদিও ইউক্রেন ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একে অবৈধ ঘোষণা করে। দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক অঞ্চলগুলিতে রাশিয়াপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠী গঠন এবং সেখানে একটি গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, যা ২০১৪ সাল থেকে এখনও চলছে। এই অঞ্চলগুলিতে অনেক রুশভাষী বাসিন্দা আছেন, যারা নিজেদের ইউক্রেনের চেয়ে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মনে করে এবং রাশিয়ার সাথে সংযুক্ত হতে চায়।
এই প্রেক্ষাপটে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা আন্দোলন ভিন্ন হলেও তাদের দাবি একই – জাতিগত, সাংস্কৃতিক, এবং রাজনৈতিকভাবে নিজেদের স্বাধীনতা অর্জন। একইসাথে নিজেদের মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার এবং নিজ ধর্ম রক্ষার অধিকারও তারা অর্জন করতে চায়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি দুই অঞ্চলের জন্য একই ধরনের সমর্থন বা বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারেনি।
ক্রিমিয়া, দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন, এবং জাপরিজজিয়া অঞ্চলের স্ব-নিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বাধীনতা দাবি করা দিনকে দিন জটিল এবং বিতর্কিত ভূ-রাজনৈতিক প্রসঙ্গে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। তাদের স্ব-নিয়ন্ত্রণের অধিকার পূরণের জন্য এই অঞ্চলের বাসিন্দারা গণভোট (২০১৪ সালে ক্রিমিয়া, ডিপিআর এবং এলপিআর, ২০২২ সালে খেরসন এবং জাপরিজজিয়া) আয়োজন করে, তারপরে রাশিয়ায় যোগদানের সিদ্ধান্ত নেয়। উক্ত অঞ্চলসমূহের দাবি বাস্তবায়নে অনেকগুলো বিষয় বিবেচ্য, যেমন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, আন্তর্জাতিক আইন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়াসহ পশ্চিমা বিশ্বের একের পর এক বাধা সৃষ্টিতে তা জটিলতর হয়ে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী একটি রাষ্ট্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের নীতি অনুযায়ী, জাতীয়তাবাদ এবং স্ব-নিয়ন্ত্রণের দাবি বৈধ, তবে তা আন্তর্জাতিক সীমান্তের অখণ্ডতা ক্ষুণ্ণ করার জন্য ব্যবহার করা যাবে না। ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা দাবি আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য কারণ তাদের ভূমি অধিগ্রহণ এবং মানবাধিকারের ব্যাপক লঙ্ঘন হয়েছে, যা জাতিসংঘ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার নীতির সাথে সাংঘর্ষিক। ফিলিস্তিন একটি স্বীকৃত জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করছে যা অনেক দেশ স্বীকৃতি দিয়েছে।
অন্যদিকে ক্রিমিয়া ও পূর্ব ইউক্রেনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সাধারণত ইউক্রেনের আঞ্চলিক অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং এই অঞ্চলগুলির স্বাধীনতার দাবি আন্তর্জাতিকভাবে সমর্থিত হয়নি। মূলত পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়াকে দুর্বল করতেই এবং নিষেধাজ্ঞাসহ বহিঃবিশ্ব থেকে রাশিয়াকে বিচ্ছিন্ন করতেই ক্রিমিয়াসহ পূর্ব ইউক্রেনের স্বাধীনতাকামী অঞ্চল সমূহের আকাঙ্খা পূরণ করছে না৷ এক্ষেত্রে রাশিয়ায় ক্রিমিয়া যুক্ত হওয়া এবং পূর্ব ইউক্রেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলিকে সমর্থন দেয়াটাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে৷
ফিলিস্তিন ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এক ধরনের নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যাটি দেখেছে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। মিডিয়া, জাতিসংঘ এবং মানবাধিকার সংস্থা থেকে ফিলিস্তিনিদের স্ব-নিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি ব্যাপক সমর্থন রয়েছে। তবে ক্রিমিয়া এবং পূর্ব ইউক্রেনের অঞ্চলগুলির ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া অনেকটা দ্বিমুখী এবং পক্ষপাতদুষ্ট মনে হয়। বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলি রাশিয়ার ভূমিকার কারণে এই অঞ্চলগুলিকে রাশিয়াপন্থী অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করে এবং ইউক্রেনের আঞ্চলিক অখণ্ডতার পক্ষে সমর্থন দেয়।
ফিলিস্তিন ইস্যুটি মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য এবং বিশেষ করে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব এর সঙ্গে জড়িত। অন্যদিকে ইউক্রেনের ইস্যুটি পশ্চিমা বিশ্ব ও রাশিয়ার মধ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক শক্তির দ্বন্দ্বকে নির্দেশ করে। এখানে আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্য এবং রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলির দ্বন্দ্ব একটি বড় ভূমিকা পালন করে।
ফিলিস্তিন ইস্যুটি দীর্ঘকাল ধরে আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে বেশ প্রচার পেয়েছে। সেখানে মানবাধিকারের লঙ্ঘন, শরণার্থী সমস্যা এবং ইসরায়েলি দখলদারিত্বের মতো বিষয়গুলি সহজেই আন্তর্জাতিক মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অপরদিকে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের সমস্যা অনেক বেশি রাজনৈতিক এবং কম মানবিক সমস্যার আকারে দেখা হয়।
ফিলিস্তিনিরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে সমর্থন পায় কারণ তাদের অধিকাংশ মিত্র আন্তর্জাতিকভাবে প্রভাবশালী। এতে মুসলিম দেশগুলির ব্যাপক সমর্থন রয়েছে, বিশেষ করে আরব লীগ ও ওআইসিভুক্ত দেশসমূহের মধ্যে। অন্যদিকে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় অঞ্চলের বিদ্রোহীরা প্রধানত রাশিয়ার সমর্থন পায়, যা পশ্চিমা বিশ্বের অনেকাংশের বিরোধিতা করেছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার ভারসাম্য এবং রাজনৈতিক স্বার্থই নির্ধারণ করে কোন ইস্যুতে বিশ্ব সম্প্রদায় কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে। ফিলিস্তিন ইস্যুটি একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও জাতিগত মুক্তি আন্দোলন হিসেবে দেখা হলেও ইউক্রেনের ক্ষেত্রে এটি রাশিয়ার প্রভাব বাড়ানোর একটি প্রচেষ্টা হিসেবে গণ্য করা হয়। এর ফলে দুই অঞ্চলের স্বাধীনতার দাবিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভিন্ন প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়।
ফিলিস্তিন এবং ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় অঞ্চলগুলির স্ব-নিয়ন্ত্রণের দাবি ঐতিহাসিকভাবে, আইনীভাবে এবং নৈতিকভাবে ভিন্নভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। যদিও উভয় ক্ষেত্রেই স্ব-নিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রশ্নবিদ্ধ নয়, কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রতিক্রিয়া স্পষ্টভাবে বৈষম্যমূলক।
লেখক: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ প্রফেশনাল