প্লেন থেকে নেমে যখন সারাদিন জার্নির পর সন্ধ্যার কাছাকাছি সময়ে প্রথম ক্যাম্পে পৌঁছলাম, কি এক আশ্চর্য কারণে আমার মনটা খুব শান্ত হয়ে গেল। একেবারে নিরিবিলি পাহাড় ঘেরা এক উপত্যকায় আমার ক্যাম্প।
পাহাড় আমার জীবনের প্রথম ভালবাসা। সেই রাতটা ক্লান্তির ঘুমে কেটে গেলেও, ইসিয়ায় আমার প্রথম ভোরটা ছিল বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে যাওয়ার মতো সুন্দর।
.png)
ঘুম ভাঙতেই দেখি কি অবিশ্বাস্য সুন্দর আর সবুজে ঘেরা একটি উপত্যকা। হাতের তালুর মতো একমুঠো একটি ক্যাম্প। তার গা ঘেঁষে চলে গেছে উঁচু-নিচু পাহাড়ী রাস্তা। বেশ একটু দূরে, আরো একটি উঁচু উপত্যকার ওপর ছিমছাম ছড়িয়ে থাকা যে শহরটি, তাকে যেন ছায়া দিয়ে রেখেছে প্রাগৈতিহাসিক দেবতার মতো বিশাল এক কালো পাহাড়।
সবচেয়ে আনন্দময় ঘটনাটি ঘটলো যখন দেখলাম, ভোরের কুয়াশার কুহেলিকায় ঠিক পাশের এক গভীর খাদ থেকে উড়ে উড়ে উঠে এলো এক ঝাঁক নিলাভ হেরণ। আকাশে বকের ঝাঁক উড়ে যাওয়া দেখেছি। কিন্তু পাহাড়ের গভীর খাদ থেকে ছন্দময় কবিতার মত এক ঝাঁক নিলাভ বকের এমন উঠে আসার দৃশ্য যে কি অপূর্ব বিস্ময়কর, তাকে কিভাবে প্রকাশ করি! ইসিয়াকে আমি ভালোবেসে ফেললাম।
ইসিয়ায় আমার পরের পাঁচটি মাস ছিলো স্বপ্নের মতো। অজস্র কর্মকাণ্ডে আমি ছোট পাহাড়ি শহরটির মানুষের হৃদয়ের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলাম। সেই গল্প আজকে বলবো না।
শুধু যখন কখনো আমার মন খুব বেশি খারাপ হতো, আমি একা একা ঐ দূরের কালো পাহাড়টির চূড়ায় হেঁটে হেঁটে উঠে যেতাম। আমার চোখের সামনে সন্ধ্যা নামতো শহরে। একটা একটা করে জ্বলে উঠতো আলো। ঘন অন্ধকার চারপাশ থেকে ঘিরে ধরত আমাকে। কিন্তু আমার আর কোথাও যেতে ইচ্ছে করতো না। সন্ধ্যা যত গভীর হতো, অন্ধকার আরো প্রগাঢ় হয়ে উঠতো। পাহাড়ের ঠিক নিচেই বনভূমির ভেতর শান্ত সমাহিত চার্চের প্রার্থনা সংগীত কি গভীর বেদনার মতো ভেসে বেড়াত শীতের বাতাসে। আমি অন্ধকারে ভিজতে ভিজতে সেই পাহাড় চূড়ায় সন্তের মতো বসে থাকতাম।
শেষের কথা:
পরবর্তী ৮ মাস আমি খুব সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন একটা ক্যাম্পে ছিলাম। সেখানে একটি সাজানো গোছানো শহর ছিল। চিত্তবিনোদনেরও অবকাশ ছিলো অনেক। কিন্তু কোনো এক বিচিত্র কারণে ইসিয়াকে আমি একদিনের জন্যও ভুলতে পারিনি।
মানুষের মন খুব বেশি রহস্যময়। মানুষ কী তার নিজের মনের মালিক? আমার তা মনে হয় না। আমার মনে হয়, প্রতিটি মানুষ আর তার মন আলাদা আলাদা সত্তা। হয়তো সেজন্যই, সারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড জয় করা মানুষ, একটা আস্ত জীবন পার করে দেওয়ার পরও, প্রায়শই তার নিজের মনের নাগালটুকুও পায় না। সে জানে না, কেন বিচ্ছেদে মৃত্যু হয় না সম্পর্কের। জানেনা, কখন কেন, কোন অজানা কারণে তার মন কেমন করে, অকারণে কথা বলে, কিংবা একদম নিশ্চুপ হয়ে যায়। যেমন আমি কোনদিনও জানতে পারিনি, পৃথিবীর এত এত দেশ মহাদেশ ঘুরে এসেও কেন শুধু ইসিয়ার জন্যই আমার মন এমন কাঁদে।
পাদটিকা:
ইসিয়া আমার আর্কেডিয়া নামটি আমার প্রিয় কবি রফিক আজাদের ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’ কবিতাটির ছায়া অবলম্বনে নেয়া। কৃতজ্ঞতা কবি।
লেখক- জিয়া মাহমুদ। তার ফেসবুক পোস্ট হতে।