ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ মতামত ]

নিষিদ্ধের প্যাঁচে পলিথিন: কতটুকু কার্যকর

সাজেদুর আবেদীন শান্ত
প্রকাশিত: ১৬:১৯, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪
নিষিদ্ধের প্যাঁচে পলিথিন: কতটুকু কার্যকর
গ্রাফিক্স: ডেইলি বাংলাদেশ

ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে বাজারে যাওয়ার সময় দেখতাম বাবা হাতে একটি চটের (পাটের) ব্যাগ নিতেন। বাজার ঘুরে ঘুরে কেনা জিনিসপত্র সেই ব্যাগে রাখতেন। শুধু যে বাবাকেই চটের ব্যাগ হাতে বাজারে যেতে দেখতাম তা নয়, বাজারে যারা আসতেন তারা সবাই চটের ব্যাগ সঙ্গে নিয়ে আসতেন এবং সে ব্যাগেই বাজার করে বাড়ি ফিরতেন। কিন্তু এখন আর সেই দৃশ্য দেখা যায় না বললেই চলে। কারণ, সর্বত্র এখন পলিথিনে ছেয়ে গেছে।

বাংলাদেশে পলিথিনের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু তাই নয়, পলিথিনের ব্যবহার দিনদিন যেন প্রতিযোগিতা মূলকভাবে বাড়ছে। ফলে দেশ ক্রমশই ভয়াবহ পরিবেশগত সমস্যার দিকে ধাবিত হচ্ছে। 

পলিথিনের কারণে শহর ও গ্রামাঞ্চলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি, নদী ও জলাশয় দূষণ, মাটির উর্বরতা হ্রাস, এমনকি জনস্বাস্থ্যেরও ক্ষতি হচ্ছে। পলিথিন সহজে পচে না। ফলে এটি মাটিতে ও পানিতে দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকে, যা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে। 

Advertisement

গবেষকরা জানান, প্লাস্টিক বা পলিথিন যেভাবেই রূপান্তর করা হয় না কেন, তা সহজে পচে না। পলিথিন-জাতীয় বস্তু যদি মাটির নিচে চাপা পড়ে তাহলেও ওখানে পচতে সময় লাগবে সাড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ বছর। এ কারণে পলিথিন মাটির নিচে গেলেও ধ্বংস করছে মাটির স্বাভাবিক স্তরকে। 

বাংলাদেশে পলিথিন সমস্যা খুবই প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিশ্বে প্রথম বাংলাদেশেই পলিথিন নিষিদ্ধ হয়। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ এর বিধান অনুসারে ২০০২ সালে দেশে প্রথম পলিথিন নিষিদ্ধ করে সরকার। সে সময় দেশের বেশকিছু জায়গায় পলিথিনবিরোধী অভিযানও চালানো হয়। 

২০০২ এর আইনে বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি নিষিদ্ধ পলিথিন সামগ্রী উৎপাদন, আমদানি বা বাজারজাত করে তাহলে ১০ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হবে। এমনকি উভয় দণ্ডও হতে পারে। কিন্তু বিকল্প পণ্যের অভাবে এবং আইনের কঠোর প্রয়োগের অভাবের কারণে এটি পুরোপুরি সফল হয়নি। পলিথিনের সহজলভ্যতা ও সস্তা মূল্য এই নিষেধাজ্ঞাকে আরো দুর্বল করে দেয়। শুধু তাই নয়, পলিথিন যে নিষিদ্ধ তা হয়তো অনেকে জানেই না। 

সম্প্রতি মিরপুরের কালশি বাজারে কথা হয় এক ব্যক্তির সঙ্গে। তাকে যখন জিজ্ঞাস করলাম, পলিথিন ব্যবহারতো নিষিদ্ধ! তারপরও ব্যবহার করছেন কেন? তিনি আমার এ কথা শুনে অবাক হয়ে গেলেন। বললেন, পলিথিন কি নেশাজাতীয় জিনিস যে নিষিদ্ধ হবে? এটাতে তো আমরা বাজার করি। পলিথিন ছাড়া বাজার করবো ক্যামনে? পাল্টা প্রশ্ন শুনে আমি আর কিছু না বলে চলে আসি। এ থেকেই বোঝা যায় বাংলাদেশে পলিথিন নিষিদ্ধের অবস্থা। 

২০০২ সাল থেকে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকবার সরকার পলিথিন বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু তা কখনই সফল হয়নি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের  আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান নতুন করে পলিথিন ব্যাগ ব্যবহারে নিষিদ্ধের ঘোষণা দেন। 

গত ২৪ আগস্ট রাজধানীর মোহাম্মদপুরের কাঁচা বাজার বণিক সমিতির অফিসে আয়োজিত এক সভায় সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, আগামী ১ অক্টোবর থেকে সুপারশপে এবং ১ নভেম্বর থেকে দেশের সব কাঁচাবাজারে পলিথিন ও পলিপ্রপাইলিনের তৈরি ব্যাগ ব্যবহার করা যা‌বে না। এ সময় তিনি পলিথিন যারা উৎপাদন করে সেখানে অভিযান পরিচালনার কথাও বলেন। 

বারবার পলিথিন নিষিদ্ধ করার পরও এর ব্যবহার বন্ধ না হওয়ার পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমত, পলিথিনের সহজলভ্যতা ও কম দামের কারণে বিকল্প পণ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ কম। দ্বিতীয়ত, বিকল্প পণ্যগুলোর সহজলভ্যতা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। তৃতীয়ত, আইন প্রয়োগেও দুর্বলতা রয়েছে। পলিথিন নিষিদ্ধ হলেও মাঠপর্যায়ে এর উৎপাদন ও ব্যবহার বন্ধ হয়নি। বিশেষ করে অপরিকল্পিত মনিটরিং এবং দুর্বল প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার কারণেও নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না। 

পলিথিন সমস্যার কার্যকরী সমাধান চাইলে এর বিকল্প হিসেবে পাট পণ্যের ববহার বৃদ্ধি করতে হবে। কারণ, এটাই সবচেয়ে বেশি কার্যকরী উপায়। কেননা, বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ও অর্থকরী ফসল পাট, যা পরিবেশবান্ধব এবং সহজে পচনশীল। শুধু তাই নয়, পাট পণ্যের ব্যবহার বাড়ানো হলে দেশের কৃষি খাতও উন্নত হবে। এছাড়াও পাট পণ্যের ব্যবহার পলিথিন সমস্যার একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে।

পাট পণ্য ছাড়াও কাপড়ের ব্যাগ, কাগজের ব্যাগ ইত্যাদি ব্যবহার করে পলিথিনের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা সম্ভব। এগুলো পরিবেশের ক্ষতি করে না এবং পুনরায় ব্যবহার করা যায়। তবে পলিথিনের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করতে হলে জনগণের সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। মানুষকে বোঝাতে হবে পলিথিনের ক্ষতিকর প্রভাব এবং পরিবেশবান্ধব পণ্য ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা। এ ব্যাপারে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও গণমাধ্যমগুলোতে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে। 

পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু কথায় নয়, নিষিদ্ধকরণের পরও যারা পলিথিন ব্যবহার করছে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে বাজারে পলিথিনের বিকল্প পণ্যের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশে পলিথিন নিষিদ্ধকরণে সরকার, সাধারণ মানুষ এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে একযোগে কাজ করতে হবে। তাহলেই আমরা একটি সবুজ ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারবো।

লেখক: সাজেদুর আবেদীন শান্ত, কবি ও গণমাধ্যমকর্মী

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমএস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!