অর্থনীতি ও মানুষের স্বার্থে শান্তি ও স্থায়িত্ব আসুক পোশাক শিল্পে
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি এবং জাতীয় রপ্তানি আয়ের ৮০ ভাগের বেশি এই খাত থেকে আসে। সাম্প্রতিক পোশাক শিল্পের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষ, সড়ক অবরোধ, কারখানা ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১ থেকে ৩ নভেম্বর তিন দিনে তৈরি পোশাক খাতে প্রায় ১ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকার উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে বিজিএমইএ-এর হিসাবে রপ্তানি মূল্য বাবদ ক্ষতি ৮৫৯ কোটি টাকা এবং বিকেএমইএ-এর হিসাবে নিট পোশাক খাতে উৎপাদন ক্ষতি প্রায় ৭০০ কোটি টাকা (দৈ. যুগান্তর)। এ বিপুল আর্থিক ক্ষতি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।
বর্তমানে মজুরি ও অন্যান্য দাবিকে কেন্দ্র করে পোশাক শিল্পে যে অস্থিরতা চলছে, তা শ্রমিক ও মালিক উভয় পক্ষের জন্যই ক্ষতিকর এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
আর্থিক ক্ষতির চেয়েও বড় আশঙ্কার জায়গা হলো আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়া। দেশের কারখানাগুলোয় বারবার অস্থিরতা সৃষ্টি হলে ক্রেতারা বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকবেন, এটাই স্বাভাবিক। ইতোমধ্যে কোনো কোনো বিদেশি ক্রেতা আগামী দুই মাসের ক্রয়াদেশ কমানোর চিন্তা করছেন এবং বাংলাদেশের কিছু ক্রয়াদেশ ভারত, পাকিস্তানসহ প্রতিযোগী দেশগুলোয় স্থানান্তরের তথ্যও রয়েছে। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দেশের রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থানে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বর্তমানে শ্রমিকরা ন্যূনতম মজুরি ১২,৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০,০০০ টাকা করার দাবি জানাচ্ছেন। শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়, খাদ্য, বাসস্থান ও সন্তানের শিক্ষার কথা বিবেচনা করে একটি বাস্তবসম্মত ও গ্রহণযোগ্য মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
পোশাক শিল্পে শান্তি ও স্থায়িত্ব: দেশের অর্থনীতি রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের সময় এখনই!
১. বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো আমাদের তৈরি পোশাক বা আরএমজি খাত।
২. গত কয়েকদিন ধরে ন্যূনতম মজুরির দাবিতে শ্রমিক ভাই-বোনদের আন্দোলন আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে।
৩. আশুলিয়া ও গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত নিরসন করা জরুরি।
৪. সাধারণ শ্রমিকদের দাবি—ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে সংগতিপূর্ণ একটি ন্যায্য মজুরি কাঠামো।
৫. অন্যদিকে, বিশ্ববাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছেন মালিকপক্ষ।
৬. এই দুই পক্ষের মধ্যে একটি বৈষম্যহীন ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান খুঁজে বের করা সময়ের দাবি।
৭. কোনো ধরনের সহিংসতা বা ভাঙচুর কখনোই কোনো স্থায়ী ও সুন্দর সমাধান এনে দিতে পারে না।
৮. উৎপাদন ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা অন্য দেশের দিকে ঝুঁকবেন, যা আমাদের জন্য হবে এক বিরাট ক্ষতি।
৯. বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট নীতি-নির্ধারকদের এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে বিশেষ প্রণোদনা নিয়ে ভাবা উচিত।
১০. শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং কারখানার উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি—দুটিই সমান্তরালভাবে সচল রাখতে হবে।
১১. আলোচনার টেবিলে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও বিশ্বাসের মাধ্যমেই কেবল এই সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব।
১২. আমাদের মনে রাখতে হবে, লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান এবং রেমিট্যান্সের ভিত এই পোশাক শিল্পের ওপর দাঁড়িয়ে।
১৩. কানাডাসহ বিশ্বজুড়ে প্রবাসী বাংলাদেশিরাও চান দেশের এই গৌরবময় খাতটি সর্বদা সুরক্ষিত ও স্থিতিশীল থাকুক।
১৪. আসুন, সবাই মিলে দেশের অর্থনীতি ও মেহনতি মানুষের স্বার্থে একটি শান্ত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলি।
শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং অধিকার নিশ্চিত করা মালিক ও সরকারের দায়িত্ব। শ্রমিকদের দাবিদাওয়া থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। এজন্য সরকার ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। বোর্ডকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদেরও বুঝতে হবে, শিল্পের ক্ষতি করে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব নয়। শিল্প টিকে থাকলেই কর্মসংস্থান ও জীবিকার নিশ্চয়তা থাকবে।
লেখক : গোলাম কবীর, কানাডা বিজনেস কনসালটেন্ট ও মর্টগেজ এজেন্ট, টরন্টো