যেসব আমলে কাটতে পারে মুমিনের মাহে রমজান
আমলের স্বর্ণপ্রহর পবিত্র রমজানুল মোবারক। ইবাদতের বসন্ত মৌসুম। মুসলিম মাত্রই পবিত্র এই মাসের আগমনে আমল-ইবাদতের প্রতি আগ্রহী হন এবং বছরের অন্যান্য মাসের তুলনায় বেশি আমল-ইবাদতে মনোযোগী থাকেন। এর নেপথ্যে যৌক্তিক কারণও রয়েছে।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমান সহকারে ইখলাসের সঙ্গে রমজানের রোজা রাখে এবং ইবাদত করে, তার অতীতের পাপ ক্ষমা করে দেয়া হবে (বুখারী ও মুসলিম)। এ ছাড়া হাদিসে আরো বর্ণিত হয়েছে, যে ব্যক্তি এ মাসে কোনো ভালো কাজ করার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সান্নিধ্য কামনা করে, সে অন্য মাসে কোনো ফরজ কাজ করার সমান সওয়াব লাভ করবে। আর এ মাসে কোনো ব্যক্তি যদি একটি ফরজ কাজ করে, সে অন্য সময়ে ৭০টি ফরজ আদায়ের নেকি লাভ করবে (মিশকাত)।
সুতরাং প্রত্যেক মুমিন-মুসলমানের উচিত রমজান মাস এলে বেশি বেশি আমল-ইবাদতে মনোযোগী হওয়া। রমজান মাসে যেসব আমল বেশি করা যায় সেগুলো হলো- ১. সিয়াম পালন করা- ইসলামের পাঁচটি রুকনের অন্যতম একটি রুকন হলো সিয়াম। রমজান মাসে সিয়াম পালন করা ফরজ। ২. সময়মতো নামাজ আদায় করা- সিয়াম পালনের সঙ্গে সঙ্গে সময়মতো নামাজ আদায় করার মাধ্যমে জান্নাতে যাওয়ার পথ সুগম হয়। ৩. সহিহভাবে কোরআন শেখা ও তেলাওয়াত করা- রমজান মাসেই পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। এ মাসের অন্যতম আমল হলো সহিহভাবে কোরআন শেখা ও তেলাওয়াত করা। ৪. সেহরি খাওয়া- সেহরি খাওয়ার মধ্যে বরকত রয়েছে এবং সিয়াম পালনে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল-বিধান। ৫. ইফতার করা ও করানো- ইফতার করা ও করানো ফজিলতপূর্ণ আমল। ৬. সালাতুত তারাবি পড়া- সালাতুত তারাবি পড়া এ মাসের অন্যতম আমল। ৭. সালাতুত তাহাজ্জুদ পড়া- রমজান মাসে সালাতুত তাহাজ্জুদ পড়ার মধ্যে অনেক সওয়াব ও মর্যাদা রয়েছে। যেহেতু সেহরি খাওয়ার জন্য উঠতে হয়, সেজন্য রমজান মাসে সালাতুত তাহাজ্জুদ আদায় করার বিশেষ সুযোগও রয়েছে। ৮. বেশি বেশি দান-সদকাহ করা- এ মাসে বেশি বেশি দান-সদকাহ করার জন্য চেষ্টা করতে হবে। ৯. সামর্থ্য থাকলে ওমরা পালন করা- এ মাসে ওমরা করলে একটি হজ আদায়ের সমান সওয়াব পাওয়া যায়। ১০. তওবা ও ইস্তেগফার করা- পবিত্র এই মাস তওবা করার উত্তম সময়। ১১. ইতিকাফ করা- রমজানের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। ১২. লাইলাতুল কদরকে কদর করা- লাইলাতুল কদর তালাশ করা এবং এই রাতে ইবাদত করার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। ১৩. সাদকাতুল ফিতরা দেওয়া- রমজান মাসের সিয়ামের ত্রুটি-বিচ্যুতি পূরণার্থে ফিতরা দেয়া আবশ্যক। ১৪. আল্লাহর জিকির করা। ১৭. কল্যাণকর কাজ করা। ১৮. মিসওয়াক করা। ১৯. দাওয়াতে দ্বীনের কাজ করা। ২০. তাকওয়া অর্জন করা।
.png)
রোজাদারের সুন্নত আমল : ফজিলতপূর্ণ আমল রোজা। রোজাদার আল্লাহর প্রিয় বান্দা। তাই একজন রোজাদার মানুষের কাছেও প্রিয় পাত্র। রোজা রেখে এমন কোন কাজ করা উচিত নয় যার ফলে মানুষ কষ্ট পেয়ে থাকে। রোজাদারের উচিত সব সুন্নত আমল স্বযত্নে অনুসরণ করা। রোজাদারের সুন্নত আমলগুলো হচ্ছে, রোজাদারকে কেউ গালি দিলে অথবা তার সঙ্গে ঝগড়া করলে এর বিনিময়ে তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে বলবে, ‘আমি রোজাদার’। রোজাদারের জন্য সেহেরি খাওয়া সুন্নত। সেহেরীর মধ্যে বরকত রয়েছে। অনতিবিলম্বে ইফতার করা সুন্নত; আর দেরিতে সেহরি খাওয়া সুন্নত। কাঁচা খেজুর দিয়ে ইফতার করা; কাঁচা খেজুর না পেলে শুকনো খেজুর দিয়ে; শুকনো খেজুরও না পেলে পানি দিয়ে ইফতার করা সুন্নত। রোজাদারের বেশি বেশি দোয়া করা মুস্তাহাব। দলিল হচ্ছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী : ‘তিন ব্যক্তির দোয়া ফিরিয়ে দেয়া হয় না। ন্যায়পরায়ণ শাসক। রোজাদার; ইফতার করার পূর্ব পর্যন্ত। মজলুমের দোয়া। মুসনাদে আহমাদ (৮০৪৩), মুসনাদ কিতাবের পাঠোদ্ধারকারী সম্পাদকরা হাদিসটিকে অন্যান্য সহায়ক সনদ ও হাদিসের ভিত্তিতে ‘সহিহ’ বলেছেন। ইমাম নববী (রহ.) বলেছেন, রোজাদারের জন্য রোজাপালনকালে নিজের জন্য, প্রিয় মানুষের জন্য এবং সব মুসলমানের দুনিয়া ও আখেরাতের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দোয়া করা মুস্তাহাব। (আল-মাজমু, ৬/৩৭৫)।
রোজাদারের মোস্তাহাব আমল : রোজার ফরজ ও সুন্নত আমলের পাশাপাশি বেশি বেশি মোস্তাহাব আমল করে রোজাকে আরো শক্তিশালী করা। অপছন্দনীয় কাজ থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি সর্বোত্তম কাজগুলো করা। রোজাদারের মোস্তাহাব আমল হচ্ছে, মসজিদে বসে বসে কোরআন তেলাওয়াত করা ও শেষ দশদিন ইতিকাফ করা। পরস্পর কোরআন অধ্যয়ন করা। সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিমে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন, ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন শ্রেষ্ঠ বদান্য মানুষ। তিনি সবচেয়ে বেশি বদান্য হতেন রমজান মাসে; যখন জিবরাইল (আ.) তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত করতেন। জিবরাইল (আ.) প্রতি রাতে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত করতেন এবং একে অপরকে কোরআন পাঠ করে শুনাতেন। নিশ্চয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুক্ত বাতাস চেয়ে অধিক বদান্য ছিলেন।’ অনর্থক কাজে সময় নষ্ট না করা; যা তার রোজার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে যেমন অতিরিক্ত ঘুম, অতিরিক্ত ঠাট্টা মশকরা ইত্যাদি। নানা রকম খাবারদাবার নিয়ে ব্যতিব্যস্ত না হওয়া। কারণ রোজা পালনকালে এগুলো তাকে অনেক নেকির কাজ করা থেকে বিরত রাখবে।
মধ্যরাতে আল্লাহকে খুঁজুন : আল্লাহর নিকট অতি প্রিয় আমল তাহাজ্জুদের নামাজ। রমজান মাসেও এ আমলটির প্রতি গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। আল্লাহপ্রেমীদের কাছে এ আমল খুবই প্রিয়। প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর উম্মতদের প্রতি রাতের নামাজের তাগিদ দিয়ে গেছেন। নবীজী (সা.) রাতের আমলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ আমল হিসেবে তাহাজ্জুদ নামাজকে অ্যাখ্যায়িত করেছেন। তাই তো ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা প্রত্যহ গভীর রাতে মহান আল্লাহ তায়ালা সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষে রাতের বেলা তাহাজ্জদ সালাত আদায় করে থাকেন।
তাহাজ্জুদ নামাজের ফজিলত সব নফল ইবাদত অপেক্ষা অধিক এবং এটি আল্লাহর কাছে অতি প্রিয়। যারা তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করেন এবং অপরকে এ ব্যাপারে উৎসাহিত করেন, তারা আল্লাহর অপার রহমতের মধ্যে বিচরণ করেন। হাদিসে বলা হয়েছে, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ ওই ব্যক্তির ওপর রহমত নাজিল করেন, যিনি রাতে নিদ্রা থেকে জেগে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করেন এবং তার স্ত্রীকে নিদ্রা থেকে জাগিয়ে দেন। অতঃপর তিনি (তার স্ত্রী) তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করেন। এমনকি যদি তিনি (স্ত্রী) ঘুম থেকে জাগ্রত হতে না চান, তাহলে তার মুখে পানি ছিটিয়ে দেন।’ (আবু দাউদ ও নাসাঈ)। তাহাজ্জুদ নামাজ রাত দ্বিপ্রহরের পরে পড়তে হয়।
হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) তাহাজ্জুদ নামাজ কখনো ৪ রাকাত, কখনো ৮ রাকাত এবং কখনো ১২ রাকাত পড়েছিলেন। তবে দুই রাকাত-দুই রাকাত করে তাহাজ্জুদ নামাজ কমপক্ষে ৪ রাকাত আদায় করা উচিত। কিন্তু যদি কেউ এ নামাজ ২ রাকাত আদায় করেন, তাহলেও তার তাহাজ্জুদ আদায় হবে। এটাকে অবশ্য অনেক ইসলামি চিন্তাবিদ নিরুৎসাহিত করেছেন। আলেমরা তাহাজ্জুদের নামাজের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা রক্ষার কথাও বলেছেন। অর্থাৎ একদিন অনেক রাকাত, আরেকদিন কম কিংবা আরেকদিন পড়াই হলো না এমনটি নয়। যাই পড়া হোক সেটা যেনো নিয়মিত হয়। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এশার পর দুই বা ততোধিক রাকাত নামাজ পড়ে নেয়, সে হবে তাহাজ্জুদের ফজিলতের অধিকারী।’ তাহাজ্জুদ নামাজ আদায়কালে কেরাতের সময় কোরআনে কারিমের আয়াত যথাসম্ভব বেশি পরিমাণে তেলাওয়াত করা উত্তম। যদি বড় সূরা মুখস্থ থাকে, তাহলে তাহাজ্জুদ নামাজে বড় সূরা তেলাওয়াত করা। বড় সূরা মুখস্থ না থাকলে যেকোনো সূরা দিয়েই নামাজ আদায় করা যাবে। হাদিসে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায়কারী ব্যক্তি অধিক সম্মানের অধিকারী বলেও ঘোষণা করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে হাদিসে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুসলমানদের মধ্যে আল কোরআনে অভিজ্ঞ ও তাহাজ্জুদ নামাজ আদায়কারী ব্যক্তি সম্মানের অধিকারী হবেন।’ (বায়হাকি)।