মানসিক অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তা দূর করার চিকিৎসা হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলে দিয়েছেন। এ বিষয়ে হাদিস শরিফে কিছু দোয়া শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন হজরত মুহাম্মদ (সা.) দুশ্চিন্তা, পেরেশানির সময় এই দোয়া পড়তেন। (মুসলিম শরিফ ২০৯২)।
لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ الْعَظِیْمُ الْحَلِیْمُ، لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِیْمُ، لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَرَبُّ الْأَرْضِ وَرَبُّ الْعَرْشِ الْکَرِیْمُ
.png)
উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আযীমুল হালীম,লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু রব্বুল আরশিল আযীম, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু রব্বুস সামাওয়াতি ওয়া রব্বুল আরদ্বি ওয়া রব্বুল আরশিল কারিম।
অর্থ: ওই আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই যিনি মহান এবং সহনশীল। আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই যিনি আরশে আলিমের মালিক। আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই যিনি আসমান, জমিন এবং মহা আরশের মালিক।
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাযি. বর্ণনা করেন যে- তিনি বলেন, হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, যদি কেউ কখনো দুশ্চিন্তা বা বেদনায় আক্রান্ত হয় এবং সে যদি এ দোয়াটি পড়ে, তাহলে আল্লাহ তার দুশ্চিন্তা দূর ও বেদনা অপসারণ করে দেবেন। এর বদলে প্রশান্তি আনয়ন করে দেবেন। জিজ্ঞেস করা হলো, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমরা কি দোয়াটি শিখে নেব না? তিনি বললেন, অবশ্যই! যে ব্যক্তি দোয়াটি শুনেছে তার উচিত এটি শিখে নেয়া। (মুসনাদে আহমদ ৩৫২৮ সহিহ তারগীব: ১৮২২)
اللَّهُمَّ إِنِّي عَبْدُكَ ، وَابْنُ عَبْدِكَ ، وَابْنُ أَمَتِكَ ، نَاصِيَتِي بِيَدِكَ ، مَاضٍ فِيَّ حُكْمُكَ ، عَدْلٌ فِيَّ قَضَاؤُكَ ، أَسْأَلُكَ بِكُلِّ اسْمٍ هُوَ لَكَ سَمَّيْتَ بِهِ نَفْسَكَ ، أَوْ عَلَّمْتَهُ أَحَدًا مِنْ خَلْقِكَ ، أَوْ أَنْزَلْتَهُ فِي كِتَابِكَ ، أَوْ اسْتَأْثَرْتَ بِهِ فِي عِلْمِ الْغَيْبِ عِنْدَكَ ، أَنْ تَجْعَلَ الْقُرْآنَ رَبِيعَ قَلْبِي ، وَنُورَ صَدْرِي ، وَجِلاءَ حُزْنِي ، وَذَهَابَ هَمِّي
উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নী আব্দুকা অবনু আব্দিকা অবনু আমাতিকা, না-সিয়াতী বিয়য়াদিকা, মা-দ্বিন ফিইয়্যা হুকমুকা, আদলুন ফিইয়্যা ক্বাদ্বা-উকা, আসআলুকা বিকুল্লিস্মিন হুয়া লাকা সাম্মাইতা বিহী নাফসাকা আউ আনযালতাহূ ফী কিতাবিকা, আউ আল্লামতাহূ আহাদাম মিন খালক্বিকা, আও ইস্তা’সারতা বিহী ফী ইলমিল গাইবি ইন্দাক; আন তাজআলাল ক্বুরআনা রাবীআ ক্বালবী অনূরা সাদরী অজিলাআ হুযনী অযাহাবা হাম্মী।
অর্থ- হে আল্লাহ! আমি আপনার বান্দা, আপনার বান্দা ও বান্দীর সন্তান। আমার নসিব আপনার হাতে। আমার ওপর আপনার নির্দেশ কার্যকর, আমার প্রতি আপনার ফয়সালা ইনসাফের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
আবু বাকরা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘বিপদগ্রস্তের দোয়া হচ্ছে,
اللَّهُمَّ رَحْمَتَكَ أَرْجُو ، فَلَا تَكِلْنِي إِلَى نَفْسِي طَرْفَةَ عَيْن وَأَصْلِحْ لِي شَأْنِي كُلَّهُ ، لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ
অর্থ- হে আল্লাহ! আমি আপনার দয়া প্রত্যাশা করছি। সুতরাং চোখের পাতা ফেলার মতো সময়ের জন্যেও আপনি আমাকে আমার নিজের ওপর ছেড়ে দেবেন না। আমার যাবতীয় বিষয় আপনি ঠিক করে দিন। আপনি ছাড়া সত্য কোনো উপাস্য নেই। (ইমাম আবু দাউদ ‘সুনান’ গ্রন্থে ৫০৯০ ও ইমাম আহমাদ ‘মুসনাদ’ গ্রন্থে ২৭৮৯৮)
কোরআন ও হাদিসের আলোকে দুশ্চিন্তা ও বিপদাপদে ঈমানদারের ১০টি করণীয় সম্পর্কে বর্ণনা করা হলো—
১. ভালো-মন্দ তাকদিরের ওপর বিশ্বাস রাখা
তাকদিরের ওপর পূর্ণ আস্থাবান ব্যক্তিকে দুশ্চিন্তা কাবু করতে পারে না। এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘আল্লাহ তোমাদের ক্লেশ দিলে তিনি ছাড়া তা মোচনকারী আর কেউ নেই। আর আল্লাহ যদি তোমার মঙ্গল চান, তাহলে তার অনুগ্রহ রদ করার কেউ নেই...।’ (সুরা ইউনুস, আয়াত : ১০৭)
২. দুনিয়ার তুলনায় পরকালের বিপদের কথা স্মরণ করা
দুনিয়ার বিপদ-আপদ আপনার জন্য পরকালের বিপদ থেকে রেহাই পাওয়ার কারণ হতে পারে। আর পরকালের বিভীষিকাময় পরিস্থিতির তুলনায় দুনিয়ার বিপদ-আপদ খুবই নগণ্য। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘যেদিন তারা তা প্রত্যক্ষ করবে, সেদিন তাদের মনে হবে, যেন তারা পৃথিবীতে মাত্র এক সন্ধ্যা অথবা এক প্রভাত অবস্থান করেছে।’ (সুরা নাজিআত, আয়াত : ৪৬)
৩. চিন্তার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া
নিজের চেয়ে নিচের মানুষদের অবস্থার দিকে তাকান। ভাবুন, আল্লাহ আপনাকে তার থেকে ভালো রেখেছেন। মনোবিজ্ঞানীরাও ডিপ্রেশনের চিকিৎসা হিসেবে রোগীকে এভাবে চিন্তা করার উপদেশ দিয়ে থাকেন। মহানবী (সা.) দেড় হাজার বছর আগেই চিকিৎসার এই পদ্ধতি প্রয়োগ করেছিলেন।
৪. আল্লাহর ব্যাপারে সুধারণা পোষণ
তার ওপর ভরসা রাখুন। আশা রাখুন যে তিনি আপনাকে আপনার দুরবস্থা থেকে নাজাত দেবেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট।’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ৩)
হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, ‘আমি সেরূপ, যেরূপ বান্দা আমার প্রতি ধারণা রাখে।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৯০১)
৫. ধৈর্য ধারণ করা
বিশ্বাস করুন যে কষ্টের পর স্বাচ্ছন্দ্য আসে। কঠিন অবস্থার পর সচ্ছলতা আসে। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘...নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৫৩)
৬. সালাতুল হাজাত পড়া
হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন দুশ্চিন্তায় পড়তেন, নামাজে মগ্ন হতেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাও...।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৫৩)
৭. বেশি বেশি ইস্তেগফার করা
মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘অতঃপর আমি বলেছি, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও, তিনি তো মহাক্ষমাশীল। (ফলে) তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত করবেন, তোমাদের সমৃদ্ধ করবেন ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে।’ (সুরা : নুহ, আয়াত : ৭১)
হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তেগফার করবে আল্লাহ তার সব সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন, সব দুশ্চিন্তা মিটিয়ে দেবেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে তার রিজিকের সংস্থান করে দেবেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ১৫২০)
৮. অধিক হারে দরুদ পাঠ করা
হাদিসে এসেছে, উবাই ইবন কাব (রা.) বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমি আপনার ওপর অধিক হারে দরুদ পাঠ করে থাকি। আমার সময়ের কতটুকু আপনার প্রতি দরুদ পাঠে ব্যয় করবো? রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমার যতটুকু ইচ্ছা। আমি বললাম, এক-চতুর্থাংশ সময়? তিনি বলেন, তোমার ইচ্ছে। কিন্তু যদি আরো বাড়াও তবে ভালো। আমি বললাম, অর্ধেক সময়? তিনি বলেন, তোমার যা ইচ্ছে; তবে আরো বৃদ্ধি করলে তা-ও ভালো। আমি বললাম, দুই-তৃতীয়াংশ সময়? তিনি বলেন, তোমার ইচ্ছ; তবে আরো বাড়ালে তা-ও ভালো। আমি বললাম, আমার সবটুকু সময় আপনার ওপর দরুদ পাঠে লাগাব? তিনি বলেন, তাহলে তো তোমার চিন্তামুক্তির জন্য তা যথেষ্ট হয়ে যাবে আর তোমার গুনাহ মাফ করা হবে। (তিরমিজি, হাদিস : ২৪৫৭)
৯. সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করা
নির্ভরযোগ্য আলেমের সঙ্গে অভিমত গ্রহণ করুন। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি পরামর্শ কামনা করে সে অকৃতকার্য হয় না।’
১০. হাদিসে বর্ণিত দোয়াগুলো পাঠ করা
দুশ্চিন্তা ও মানসিক অস্থিরতা থেকে নাজাতের উদ্দেশ্যে হাদিসে বেশ কিছু দোয়া শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। ওই দোয়াগুলো বেশি বেশি পড়ুন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আমি এমন একটি দোয়া সম্পর্কে অবগত আছি, কোনো বিপদগ্রস্ত লোক তা পাঠ করলে আল্লাহ তাআলা তার সেই বিপদ দূর করে দেন। সেটি হচ্ছে আমার ভাই ইউনুস (আ.)-এর দোয়া। দোয়াটি হলো—‘লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জ্বলিমীন।’
অর্থ : হে আল্লাহ! তুমি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই; আমি তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করছি। নিঃসন্দেহে আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত। (তিরমিজি, হাদিস : ৩৫০৫)
দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হলে দোয়া পাঠের উপকারিতা
১. দুশ্চিন্তার কারণগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে;
২. আল্লাহর রহমত লাভের একমাত্র উপায় হলো দোয়া করা;
৩. হাদিসে এসেছে- দোয়ার মাধ্যমে কখনো কখনো নিয়তি বদলে যায়;
৪. দোয়ার মাধ্যমে সকল অনিশ্চয়তা দূর হয়ে যায় ও নির্দিষ্ট কাজে সফলতা আসে;
৫. দোয়ার মাধ্যমে হৃদয়ের অহমিকা ও পঙ্কিলতা দূর হয় এবং সহজেই বিনয়ী হওয়া যায়।
মনে রাখতে হবে, শারীরিক সুস্থতার মতো করে মানসিক সুস্থতাও অত্যন্ত জরুরি। আর মানসিকতাকে সুস্থ রাখতে মনের যত্ন নিতে হবে। সর্বাবস্থায় হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শেখানো মাসনুন দোয়াসমূহ পাঠ করার মাধ্যমে আমাদের আল্লাহ তাআলার কাছে সাহায্য কামনা করতে হবে।