ঢাকা,  রোববার   ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩

[ ধর্ম ]

প্রকৃত সফলতা অর্জনে মুমিনের ৮টি গুণ

ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৫:০৯, ৮ নভেম্বর ২০২৬
প্রকৃত সফলতা অর্জনে মুমিনের ৮টি গুণ
ছবি: সংগৃহীত

মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা হলো সাফল্য অর্জন করা। কেউ সম্পদে সাফল্য খোঁজে, কেউ সম্মান ও প্রতিষ্ঠায়, কেউ ক্ষমতা ও প্রতিপত্তিতে, আবার কেউ নিজের স্বপ্ন ও প্রত্যাশা পূরণকেই জীবনের চূড়ান্ত সাফল্য মনে করে।

কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে সাফল্য হলো, দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ লাভ করা। তাই একজন মুমিনের জন্য প্রকৃত সাফল্য অর্জনে যেসব গুণগুলো থাকা জরুরি সেগুলো নিম্নে তুলে ধরা হলো, 

১. বিশুদ্ধ ঈমান প্রকৃত সাফল্যের প্রথম শর্ত

প্রকৃত সফলতার ভিত্তি হলো বিশুদ্ধ ঈমান। ঈমান শুধু মুখে স্বীকার করার কোনো বিষয় নয়; বরং তা মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস, চরিত্র, আচরণ, লেনদেন ও জীবনযাপনে ইতিবাচক পরিবর্তন সৃষ্টি করে। যার অন্তরে প্রকৃত ঈমান রয়েছে, তার জীবনে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, ভয়, আনুগত্য ও ভরসার প্রতিফলন ঘটবে।
 
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সুতরাং যারা তাঁর প্রতি ঈমান এনেছে, তাঁকে সম্মান করেছে, তাঁকে সাহায্য করেছে এবং তাঁর সঙ্গে অবতীর্ণ আলোর অনুসরণ করেছে, তারাই সফলকাম।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৫৭) 

২. শিরকমুক্ত জীবনযাপন করা 

প্রকৃত সফলতার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস স্থাপন করা এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর একচ্ছত্র আনুগত্য নিশ্চিত করা। ইবাদত, প্রার্থনা, ভরসা, ভালোবাসা ও আনুগত্যের ক্ষেত্রে আল্লাহকে এক ও অদ্বিতীয় হিসেবে মেনে নেওয়াই তাওহিদের মূল শিক্ষা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘জেনে রেখো, নিশ্চয়ই আল্লাহর দলই সফলকাম।

’ (সুরা : মুজাদালাহ, আয়াত : ২২) 

আল্লাহর দল বলতে সেই মুমিনদের বোঝানো হয়েছে, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি প্রকৃত ঈমান রাখে এবং আল্লাহর বিধানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়।

৩. জুলুম ও কৃপণতা থেকে বেঁচে থাকা

প্রকৃত ঈমান মানুষের অন্তরে ন্যায়বিচার, উদারতা ও মানবিকতার গুণ সৃষ্টি করে। একজন মুমিন কখনো অন্যের অধিকার নষ্ট করতে পারেন না, কারো প্রতি জুলুম করতে পারেন না এবং নিজের সম্পদ ও সামর্থ্য নিয়ে অহংকারী হতে পারেন না। কারণ জুলুম ও কৃপণতা মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক সম্পর্ক এবং পরকালীন পরিণতিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা জুলুম থেকে বেঁচে থাকো।

কেননা, কিয়ামতের দিন জুলুম হবে বহু অন্ধকারের কারণ। আর কৃপণতা থেকেও বেঁচে থাকো। কেননা, কৃপণতা তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ধ্বংস করেছে। তা তাদের পরস্পর রক্তপাত এবং নিষিদ্ধ বিষয়গুলোকে হালাল মনে করতে উদ্বুদ্ধ করেছে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৭৮) 

৪. পাপ ও অশ্লীলতা থেকে নিজেকে রক্ষা করা

ঈমানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফল হলো মানুষের চরিত্র ও আচরণে পবিত্রতা সৃষ্টি হওয়া। প্রকৃত মুমিন অন্যায়, অশ্লীলতা, প্রতারণা, মিথ্যাচার ও যাবতীয় পাপাচার থেকে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন। তিনি জানেন, আল্লাহ সবকিছু দেখছেন এবং তাঁর প্রতিটি কাজের হিসাব দিতে হবে। আল্লাহ তাআলা সফল মুমিনদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনরা সফলকাম হয়েছে। যারা নিজেদের নামাজে বিনয়ী থাকে, যারা অনর্থক কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকে, যারা জাকাত আদায় করে এবং যারা নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ১-৫)

৫. বিপদ-আপদে ধৈর্য ও অবিচলতা বজায় রাখা

দুনিয়ার জীবন পরীক্ষা ও প্রতিকূলতায় পরিপূর্ণ। কখনো অসুস্থতা, কখনো অভাব-অনটন, কখনো প্রিয়জন হারানোর বেদনা, আবার কখনো শত্রুর ষড়যন্ত্র ও নানা সংকট মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। এসব পরিস্থিতিতে একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ঈমান, ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, ধৈর্যে দৃঢ়তা অবলম্বন করো, সদা প্রস্তুত থাকো এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ২০০)

৬. তাওবা ও ইস্তিগফারে অভ্যস্ত হওয়া

মানুষ মাত্রই ভুল ও পাপের ঊর্ধ্বে নয়। কখনো প্রবৃত্তির তাড়নায়, কখনো শয়তানের প্ররোচনায়, আবার কখনো অসতর্কতার কারণে মানুষ পাপ করে বসে। কিন্তু প্রকৃত সফল ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি পাপের ওপর অবিচল থাকেন না; বরং ভুল বুঝতে পারলে দ্রুত আল্লাহর কাছে ফিরে আসেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে তাওবা করো। আশা করা যায়, তোমাদের রব তোমাদের পাপসমূহ মোচন করে দেবেন এবং তোমাদের প্রবেশ করাবেন এমন জান্নাতে, যার পাদদেশে নহর প্রবাহিত।’ (সুরা : তাহরিম, আয়াত : ৮)

তাওবা ও ইস্তিগফারের গুরুত্ব বোঝাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘হে মানুষ! তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা করো। কেননা, আমি প্রতিদিন তাঁর কাছে একশবার তাওবা করি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৭০২)

সুবহানাল্লাহ! যিনি নিষ্পাপ নবী, যাঁর অতীত ও ভবিষ্যতের সব ভুল আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন, তিনিও প্রতিদিন একশবার তাওবা করতেন। তাহলে আমাদের মতো পাপী মানুষের কত বেশি তাওবা ও ইস্তিগফার করা প্রয়োজন!

৭. সব পরিস্থিতিতে আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করা

আল্লাহর স্মরণ মানুষের অন্তরকে প্রশান্ত করে, মনোবল বাড়ায় এবং বিপদ-আপদে অবিচল থাকতে সাহায্য করে। বিশেষ করে ভয়, সংকট, দুশ্চিন্তা ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আল্লাহর জিকির মুমিনের জন্য এক অনন্য শক্তি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! যখন তোমরা কোনো দলের মুখোমুখি হবে, তখন অবিচল থাকবে এবং আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করবে, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।’ (সুরা : আনফাল, আয়াত : ৪৫)

৮. ঐক্যবদ্ধ থাকা ও সৎকাজে পরস্পরকে সহযোগিতা করা

প্রকৃত সফলতা শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে অর্জিত হয় না; বরং সমাজের কল্যাণে ভূমিকা রাখা এবং মানুষকে সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করাও মুমিনের দায়িত্ব। একজন মুসলিম শুধু নিজে ভালো থাকবেন, অথচ তাঁর চারপাশের মানুষ অন্যায় ও পাপাচারে নিমজ্জিত থাকবে—এমন মানসিকতা ইসলামের শিক্ষা নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে। আর তারাই সফলকাম।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১০৪)

আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রকৃত সফলতা এবং দুনিয়া ও আখিরাতে কামিয়াবি অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!