পুরো মহাবিশ্বে আপনার আঙুলের ছাপের জ্যামিতিক নকশার কোন কপি নেই, কথাটি সাধারণ মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে এক বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক সত্য। এই পৃথিবীতে বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষের একেকজনের আঙুলের ছাপ সম্পূর্ণ অনন্য এবং অদ্বিতীয়। এমনকি যেসব আইডেনটিকাল জমজ (Identical Twins) সন্তানের দেহের ডিএনএ প্রায় ৯৯.৯৯% এক, তাদের আঙুলের ছাপও কখনো এক হয় না!
মানুষের আঙুলের ছাপ মূলত গঠিত হয় মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায়। গর্ভধারণের ১০ম থেকে ১৩তম সপ্তাহের মধ্যে শিশুর আঙুলের ত্বকে প্রাথমিক রেখাগুলো তৈরি হতে শুরু করে এবং ১৬তম থেকে ১৯তম সপ্তাহের মধ্যে এই আঙুলের রেখার জ্যামিতিক নকশাটি স্থায়ী রূপ নেয়।
.png)
গর্ভাশয়ের ভেতরের অ্যামনিওটিক তরলের প্রবাহ ও চাপ, রক্তনালীর বিন্যাস এবং ভ্রূণের নড়াচড়ার মতো অজস্র পরিবর্তনশীল জৈবিক বিষয়ের ওপর নির্ভর করে এই নকশাটি গড়ে ওঠে। এই সূক্ষ্ম প্রক্রিয়াগুলো এতই ভিন্ন হয় যে একই গর্ভে পাশাপাশি বেড়ে ওঠা আইডেনটিক্যাল জমজ সন্তানের আঙুলের ছাপেও আলাদা জ্যামিতিক রূপ তৈরি হয়!
আঙুলের ছাপের এই অনন্যতা আবিষ্কার ও প্রমাণের পেছনে বেশ কয়েকজন গবেষকের ঐতিহাসিক অবদান রয়েছে। ১৮৮০ সালে স্কটিশ চিকিৎসক স্যার হেনরি ফোল্ডস প্রথম বিজ্ঞান সাময়িকী নেচারে প্রকাশিত নিবন্ধে আঙুলের ছাপ দিয়ে অপরাধী ও ব্যক্তি শনাক্তকরণের বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনার কথা জানান। পরবর্তীতে ১৮৯২ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী স্যার ফ্রান্সিস গাল্টন এ বিষয়ে গভীর গাণিতিক ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালনা করেন।
তিনি গাল্টন ডিটেইলস তত্ত্বের মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে দুটি ভিন্ন মানুষের আঙুলের ছাপ হুবহু এক হওয়ার সম্ভাবনা গাণিতিকভাবে প্রায় অসম্ভব।
এরপর ১৮৯৭ সালে তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশে এই আবিষ্কারকে বাস্তব প্রয়োগে রূপ দেওয়ার জন্য এক যুগান্তকারী গাণিতিক শ্রেণীবদ্ধকরণ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন দুই বাঙালি মেধাবী পুলিশ কর্মকর্তা কাজী আজিজুল হক এবং হেমচন্দ্র বসু। তাদের তৈরি করা এই গাণিতিক ফর্মুলার ওপর ভিত্তি করেই বিখ্যাত হেনরি ক্লাসিফিকেশন সিস্টেম গড়ে ওঠে, যা বিশ্বজুড়ে আধুনিক ফরেনসিক বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করে।
জ্যামিতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে আঙুলের ছাপে প্রধানত তিনটি মূল নকশা দেখা যায় - লুপ বা বাঁকানো রেখা, আর্চ বা ধনুকের মতো খিলান এবং ওয়ার্ল বা পেঁচানো ঘূর্ণি। আমাদের আঙুলের ত্বকে থাকা রেখাগুলো যেখানে দ্বিখণ্ডিত হয়, শেষ হয়ে যায় এবং বিন্দুর মতো রূপ নেয়, সেই সূক্ষ্ম স্থানগুলোকে বৈজ্ঞানিক ভাষায় 'মিনুশাই' বলা হয়।
একটি আঙুলে এমন বহু মিনুশাই পয়েন্ট থাকে। এই বিন্দুগুলোর অবস্থান, কোণ ও পারস্পরিক দূরত্বের যে জটিল জ্যামিতিক হিসাব তৈরি হয়, তা প্রতিটি মানুষের জন্য আলাদা।
একবার গর্ভাশয়ে এই জ্যামিতিক নকশা তৈরি হয়ে গেলে মানুষের মৃত্যুর আগে পর্যন্ত এটি আর কখনো পরিবর্তিত হয় না। যদি কখনো আঙুলের উপরিভাগ বা এপিডার্মিস কেটে বা পুড়েও যায়, তবে তা সুস্থ হওয়ার পর ঠিক আগের নকশাতেই ফিরে আসে! কেবল আঘাত যদি ত্বকের গভীরের ডার্মাল প্যাপিলা স্তর পর্যন্ত পৌঁছায়, তবেই কেবল স্থায়ী ক্ষত তৈরি হতে পারে, যা আবার নিজের জায়গায় আরেকটি অনন্য চিহ্ন বহন করে।
এই অপরিবর্তনশীল ও নিখুঁত জ্যামিতিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক বায়োমেট্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যন্ত সব জায়গায় আঙুলের ছাপকে মানুষের সবচেয়ে সত্য ও নির্ভুল পরিচয় হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
মহাজাগতিক স্কেলে চিন্তা করলে এটি আরও বেশি বিস্ময়কর।
একটি আঙুলের ছাপে থাকা ৫০ থেকে ১৫০টি মিনুশাই পয়েন্টের অবস্থান, দিক ও দূরত্বের সমন্বয়ে যে সম্ভাবনার বিন্যাস (Permutation) তৈরি হয়, তা গাণিতিকভাবে অসম্ভব এক সংখ্যা নির্দেশ করে।
ফলে এটি কেবল এই পৃথিবীতেই নয়, বরং পুরো মহাবিশ্বের বিশৃঙ্খলা ও অনিশ্চয়তার নিয়মেও মানুষের অনন্যতার এক অতুলনীয় গাণিতিক প্রমাণ।
লেখক : মইনুল রনি, * তথ্যসূত্র : Discover with Mainul