মঙ্গলের পাথুরে ভূদৃশ্য। তারই মধ্যে দূরে দেখা যাচ্ছে কালো, অদ্ভুত এক অবয়ব—দেখতে অনেকটা জেলিফিশের মতো। ছবি ছড়িয়ে পড়তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। কেউ বলছেন, এটি কি তবে মঙ্গলে কোনো অজানা প্রাণীর অস্তিত্বের ইঙ্গিত?
তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, রহস্যময় এই ‘জেলিফিশ’ মঙ্গলের কোনো প্রাণী হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বরং এটি নাসার কিউরিওসিটি রোভারের ক্যামেরায় তৈরি হওয়া একটি ইমেজিং আর্টিফ্যাক্ট হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
.png)
ছবিটি নতুন নয়। নাসার কিউরিওসিটি রোভার ২০২৩ সালে ২০ আগস্ট মঙ্গলের গেইল ক্রেটার এলাকায় ছবিটি তুলেছিল। সম্প্রতি ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
ছবিটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—কিউরিওসিটি একই ক্যামেরা দিয়ে একই দৃশ্যের একাধিক ছবি তুলেছিল। রহস্যময় অবয়বটি যে ছবিতে দেখা যায়, সেটি তোলা হয় ২০ আগস্ট ২০২৩ রাত ১০টা ২৭ মিনিট ৪৬ সেকেন্ডে।
কিন্তু এর ১৩ সেকেন্ড ও ২৫ সেকেন্ড আগের দুটি ছবিতে ওই জায়গায় এমন কোনো অবয়ব দেখা যায়নি।
বিজ্ঞানীদের কাছে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। কারণ মঙ্গলের কোনো পাথর বা স্থায়ী ভূতাত্ত্বিক গঠন হলে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে সেটি হঠাৎ করে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার কথা নয়।
বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণে সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো—কোনো মহাজাগতিক রশ্মি বা উচ্চশক্তির কণা কিউরিওসিটির ক্যামেরার সেন্সরে আঘাত করার কারণে ছবিতে সাময়িক একটি দাগ তৈরি হয়েছে।
মহাজাগতিক রশ্মি হলো অত্যন্ত উচ্চশক্তির কণা, যা মহাকাশ থেকে ক্রমাগত বিভিন্ন মহাজাগতিক বস্তুর দিকে ছুটে আসে। পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র ও ঘন বায়ুমণ্ডল এসব কণার বড় একটি অংশ থেকে আমাদের রক্ষা করে। কিন্তু মঙ্গলের কোনো বৈশ্বিক চৌম্বকক্ষেত্র নেই এবং তার বায়ুমণ্ডলও পৃথিবীর তুলনায় অত্যন্ত পাতলা। ফলে মঙ্গলের পৃষ্ঠে থাকা রোবটগুলো এমন কণার আঘাতের তুলনামূলকভাবে বেশি মুখোমুখি হয়।
নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির ইমেজিং বিজ্ঞানী ও সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার জাস্টিন মাকি ২০১৪ সালে কিউরিওটির ক্যামেরায় এমন অস্বাভাবিক দাগের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, কিউরিওটি থেকে পাওয়া হাজার হাজার ছবির মধ্যে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই এমন উজ্জ্বল দাগ দেখা যায়। এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে তিনি মহাজাগতিক রশ্মির আঘাত অথবা পাথরের ওপর সূর্যের আলোর প্রতিফলনের কথা উল্লেখ করেন।
গবেষকদের কাছে মহাজাগতিক রশ্মির প্রভাব নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিউরিওটির ক্যামেরায় আগে এমনকি কালো দাগের মতো আর্টিফ্যাক্টও দেখা গেছে, যা মহাজাগতিক রশ্মি সেন্সরে আঘাত করার কারণে তৈরি হয়েছিল বলে নাসার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ছবিটি দেখে মঙ্গলে প্রাণের অস্তিত্ব নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও বিজ্ঞানীরা এ ধরনের দাবি থেকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন।
কারণ, এই নির্দিষ্ট ছবির ‘জেলিফিশ’ আকৃতির দাগটি মহাজাগতিক রশ্মির কারণেই হয়েছে—এটি এখনো নাসার কিউরিওটি ইমেজিং দল আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। ক্যামেরা বা ছবি প্রক্রিয়াকরণের অন্য কোনো ত্রুটিও পুরোপুরি বাদ দেওয়া যায়নি।
তবে একই দৃশ্যের আগের ছবিতে অবয়বটি না থাকা এবং মাত্র একটি ফ্রেমে সেটি দেখা যাওয়ায় ক্যামেরার ভেতরে তৈরি কোনো আর্টিফ্যাক্টই সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা বলে বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
অর্থাৎ, মঙ্গলে সত্যিই কোনো ‘জেলিফিশ’ পাওয়া গেছে—এমনটা নয়। বরং ঘটনাটি দেখিয়ে দিল, অন্য গ্রহ থেকে পাওয়া একটি ছবির ছোট্ট একটি দাগও কীভাবে মানুষের কল্পনায় বড় রহস্য তৈরি করতে পারে।
আর মঙ্গলে প্রাণের সন্ধানে কিউরিওটির আসল বৈজ্ঞানিক কাজ কিন্তু থেমে নেই। রোভারটি মঙ্গলের প্রাচীন পরিবেশ, শিলা ও রাসায়নিক উপাদান বিশ্লেষণ করে চলেছে—যার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা জানতে চাইছেন, অতীতে লাল গ্রহটি কখনো জীবনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করেছিল কি না।