মাটির নিচে একটি সুতির অন্তর্বাস পুঁতে রেখে দুই মাস পর সেটি তুলে আনলে কী দেখা যাবে? শুনতে অদ্ভুত লাগলেও সুইজারল্যান্ডে প্রায় এক হাজার মানুষ ঠিক এমনই একটি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন।
তবে এটি কোনো কৌতুক বা নিছক মজার আয়োজন ছিল না। মাটির নিচে থাকা জীবাণু ও ক্ষুদ্র জীবের কার্যকলাপ এবং জৈব পদার্থ পচনের হার বোঝার জন্যই এমন অভিনব পদ্ধতি বেছে নেন গবেষকরা।
.png)
সুইজারল্যান্ডজুড়ে পরিচালিত এই নাগরিক বিজ্ঞান প্রকল্পে অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন স্থানে ২ হাজারের বেশি সুতির অন্তর্বাস এবং ১২ হাজার টি-ব্যাগ মাটির নিচে পুঁতে রাখেন। গবেষণার ফলাফল গত ২৬ আগস্ট বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও প্রকাশনা-সংশ্লিষ্ট সংস্থায় প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষকরা জানান, মাটিতে থাকা ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাকসহ নানা ধরনের ক্ষুদ্র জীব জৈব পদার্থ ভেঙে ফেলে। এই প্রক্রিয়া কতটা সক্রিয়, তা বোঝার জন্যই সুতির অন্তর্বাসকে সহজ একটি পরীক্ষার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
প্রতিটি স্থানে দুটি করে অন্তর্বাস পুঁতে রাখা হয়েছিল। এক মাস ও দুই মাস পর সেগুলো মাটি থেকে তুলে পরীক্ষা করা হয়।
ফলাফলে দেখা যায়, এক মাস পর অন্তর্বাসের গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ উপাদান পচে যায়। আর দুই মাস পর গড়ে ৫০ শতাংশের বেশি উপাদান ভেঙে যায়।
গবেষকরা এই পরিমাপের নাম দিয়েছেন ‘আন্ডারপ্যান্ট ইনডেক্স’। মাটিতে জৈব পদার্থ পচনের হার মাপার বহুল ব্যবহৃত ‘টি-ব্যাগ ইনডেক্স’-এর সঙ্গে এর ফলাফলও তুলনা করা হয়েছে।
অন্তর্বাস কোথায় পুঁতে রাখা হয়েছিল, তার ওপর পচনের হার অনেকটাই নির্ভর করেছে।
দুই মাস পর সবচেয়ে বেশি পচন দেখা গেছে ব্যক্তিগত বাগানের মাটিতে। সেখানে গড়ে প্রায় ৫৮ শতাংশ কাপড় ভেঙে গেছে।
অন্যদিকে ঘাসের লনে পচনের হার ছিল সবচেয়ে কম—প্রায় ৪০ শতাংশ। কৃষিজমি ও তৃণভূমিতে এর হার ছিল মাঝামাঝি।
গবেষকদের মতে, জমির ব্যবহারই পচনের হারে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে। মাটির পুষ্টি ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্যও এতে ভূমিকা রেখেছে।
মাটির পরীক্ষা সাধারণত বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু মাটির নিচে পুঁতে রাখা একটি সুতির অন্তর্বাসের মাধ্যমে সাধারণ মানুষও খুব সহজে বুঝতে পারেন—মাটিতে জৈব পদার্থ কত দ্রুত ভেঙে যাচ্ছে।
যত বেশি অন্তর্বাসের কাপড় পচে যাবে, তত বেশি সক্রিয় হতে পারে মাটির ভেতরের জীবজগত—এমন ধারণার ওপর ভিত্তি করেই পরীক্ষাটি করা হয়েছে।
তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, ‘আন্ডারপ্যান্ট ইনডেক্স’ মাটির সামগ্রিক স্বাস্থ্য নির্ধারণের পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতি নয়। বরং এটি মাটির জৈব পদার্থ পচনের কার্যক্রম ও সম্ভাব্য উর্বরতা সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা দিতে পারে।
এই প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মাটিবিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও সহজ ও আকর্ষণীয় করে তোলা।
প্রায় এক হাজার নাগরিক বিজ্ঞানীর অংশগ্রহণে সুইজারল্যান্ডের শত শত স্থান থেকে তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। ছোট একটি গবেষক দলের পক্ষে এত বিপুলসংখ্যক স্থান থেকে তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন হতো।
গবেষকদের মতে, এই অভিনব পরীক্ষা মানুষকে মনে করিয়ে দিয়েছে—মাটি শুধু ধুলা বা ময়লা নয়। এর নিচে রয়েছে ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও অসংখ্য ক্ষুদ্র জীবের এক বিশাল জগত, যারা পৃথিবীর জৈব পদার্থের চক্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।