ঢাকা,  বুধবার   ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩

[ বিজ্ঞান বিস্ময় ]
ঘোড়া, সাপের বিষ ও অ্যান্টিভেনম

বিষ থেকে প্রতিষেধক, বিপদ থেকে সম্ভাবনা

ডাঃ এম আর করিম রেজা
প্রকাশিত: ১১:১৩, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
বিষ থেকে প্রতিষেধক, বিপদ থেকে সম্ভাবনা
বিষ থেকে প্রতিষেধক, বিপদ থেকে সম্ভাবনা—এই গল্প মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির জটিল প্রক্রিয়াকে বিজ্ঞান বুঝতে পারলে সেখান থেকেই জন্ম নিতে পারে জীবন রক্ষার নতুন পথ

ঘোড়া এক নিরীহ প্রাণী, অথচ অমূল্য জীবনরক্ষক! জানেন কি-পৃথিবীর সবচেয়ে বিষধর সাপ—even কিং কোবরা’র মতো মারাত্মক সাপের কামড়েও—ঘোড়া সহজে মারা যায় না! হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন! সাপের বিষ শরীরে ঢোকার পর ঘোড়া কিছুটা অসুস্থ থাকে, মাত্র ২-৩ দিন।

তারপর আবার আগের মতো সুস্থ হয়ে ওঠে — যেন কিছুই হয়নি।  কিন্তু কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই তথ্য? ঘোড়ার শরীরেই লুকিয়ে আছে Anti-venom বা সাপের বিষের প্রতিষেধক তৈরির এক অনন্য রহস্য!

রহস্যে ঘেরা প্রকৃতিতে কখনো কোনো উপাদান প্রাণঘাতী, আবার সেই উপাদানকেই কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞান তৈরি করে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ। সাপের বিষ তার এক বিস্ময়কর উদাহরণ। এই বিষ মানুষের জীবন কেড়ে নিতে পারে, অথচ বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় সেই বিষ ব্যবহার করেই তৈরি হয় সাপের কামড়ের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ— অ্যান্টিভেনম (Antivenom)। আর এই জীবনরক্ষাকারী ওষুধ তৈরিতে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে ঘোড়া।

সাপের বিষ ও ঘোড়ার রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা

  • সাপের বিষে বিভিন্ন ধরনের প্রোটিন, এনজাইম ও বিষাক্ত উপাদান থাকে। এগুলো স্নায়ুতন্ত্র, রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়া, পেশি কিংবা শরীরের বিভিন্ন টিস্যুর ক্ষতি করতে পারে। তবে সব সাপের বিষ এক রকম নয়; বিষের প্রকৃতি ও তার প্রভাব সাপের প্রজাতিভেদে আলাদা হয়।

ঘোড়ার শরীরেও অন্য প্রাণীর মতো কার্যকর রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা রয়েছে। নির্দিষ্ট সাপের বিষের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করার জন্য ঘোড়াকে বিশেষভাবে প্রস্তুত করা যায়। তবে এর অর্থ এই নয় যে ঘোড়া স্বাভাবিকভাবেই সব ধরনের সাপের বিষ সহ্য করতে পারে। 

বিষের সংস্পর্শে ঘোড়াও অসুস্থ হতে পারে, তাই অ্যান্টিভেনম উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়াটি বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সম্পন্ন করা হয়।

কীভাবে তৈরি হয় অ্যান্টিভেনম?

  • অ্যান্টিভেনম তৈরির প্রক্রিয়ায় জীববিজ্ঞান, রোগপ্রতিরোধবিদ্যা ও ওষুধ উৎপাদন প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটে। এর প্রধান ধাপগুলো হলো—

বিষ সংগ্রহ: প্রশিক্ষিত কর্মীরা বিশেষ ব্যবস্থায় বিষধর সাপ থেকে বিষ সংগ্রহ করেন। পরে বিষের গুণমান ও প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে তা উৎপাদনের উপযোগী করা হয়।

ঘোড়ার রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে উদ্দীপিত করা:

  • নির্দিষ্ট বিষ অতি নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় এবং পরিকল্পিত ব্যবধানে ঘোড়ার শরীরে প্রয়োগ করা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী এই প্রক্রিয়া একাধিকবার সম্পন্ন হয়। এর ফলে ঘোড়ার রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা বিষের নির্দিষ্ট উপাদানের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে শুরু করে।

রক্তরস সংগ্রহ: পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি তৈরি হলে পশুচিকিৎসা ও নির্ধারিত নিরাপত্তাবিধি মেনে ঘোড়ার রক্তরস বা প্লাজমা সংগ্রহ করা হয়। অনেক উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় রক্তের কোষগুলো আলাদা করে ঘোড়ার শরীরে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, যাতে রক্তক্ষরণের প্রভাব কমানো যায়।

অ্যান্টিবডি পৃথক ও পরিশোধন: সংগৃহীত প্লাজমা থেকে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি বা ইমিউনোগ্লোবুলিন পৃথক করা হয়। এরপর বিভিন্ন পরিশোধন, বিশুদ্ধতা যাচাই, জীবাণু-নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং কার্যকারিতা ও মান নিয়ন্ত্রণের ধাপ সম্পন্ন হয়।

 চিকিৎসার উপযোগী ওষুধ: সব পরীক্ষা ও মান নিয়ন্ত্রণে উত্তীর্ণ হওয়ার পর অ্যান্টিভেনম নির্দিষ্ট মাত্রায় ওষুধ হিসেবে প্রস্তুত করা হয়। এই অ্যান্টিবডি সাপের বিষের নির্দিষ্ট উপাদানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সেগুলোর ক্ষতিকর কার্যক্রম নিষ্ক্রিয় করতে সাহায্য করে।

সব অ্যান্টিভেনম সব সাপের বিষের বিরুদ্ধে সমান কার্যকর নয়। কোন সাপের বিষের বিরুদ্ধে ওষুধটি তৈরি হয়েছে, তার ওপর কার্যকারিতা নির্ভর করে। কোনো কোনো অ্যান্টিভেনম একটি প্রজাতির বিষের বিরুদ্ধে তৈরি হয়, আবার কোনোটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সাপের বিষের বিরুদ্ধে কার্যকর করার জন্য প্রস্তুত করা হয়।

অ্যান্টিভেনম গ্রহণে রোগীর অনীহা

বিষ থেকে জীবনরক্ষা

  • সাপের কামড়ে বিষ শরীরে প্রবেশ করলে তার প্রভাব নির্ভর করে সাপের প্রজাতি, বিষের পরিমাণ, কামড়ের স্থান এবং আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার ওপর।

কোনো কোনো বিষ শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুর কার্যক্রম ব্যাহত করতে পারে; অন্য বিষ রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়া নষ্ট করতে, রক্তক্ষরণ ঘটাতে কিংবা পেশি ও টিস্যুর ক্ষতি করতে পারে।

উপযুক্ত অ্যান্টিভেনম বিষের নির্দিষ্ট উপাদানকে নিষ্ক্রিয় করে আরও ক্ষতি কমাতে সাহায্য করে। তবে ইতিমধ্যে ঘটে যাওয়া সব ক্ষতি তাৎক্ষণিকভাবে ফিরিয়ে আনতে পারে না। তাই সাপের কামড়ের পর দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। অ্যান্টিভেনম প্রয়োজন কি না এবং কোন ধরনের অ্যান্টিভেনম ব্যবহার করা হবে, তা চিকিৎসক রোগীর লক্ষণ ও প্রাসঙ্গিক তথ্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করেন।

ঘোড়ার কল্যাণ ও ভবিষ্যতের প্রযুক্তি

  • অ্যান্টিভেনম উৎপাদনে ঘোড়ার অবদান গুরুত্বপূর্ণ হলেও এই প্রক্রিয়ায় প্রাণীর স্বাস্থ্য ও কল্যাণ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। বিষ প্রয়োগ, রক্তরস সংগ্রহ এবং অন্যান্য ধাপ ঘোড়ার শারীরিক অবস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই উপযুক্ত পুষ্টি, পশুচিকিৎসা, পর্যবেক্ষণ, বিশ্রাম এবং নিরাপদ পদ্ধতিতে রক্তরস সংগ্রহের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

এদিকে বিজ্ঞানীরা ঘোড়ার ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং আরও নির্দিষ্ট ও কার্যকর চিকিৎসা তৈরি করতে নতুন পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করছেন। এর মধ্যে রয়েছে মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি ও রিকম্বিন্যান্ট অ্যান্টিবডি প্রযুক্তি। 

এসব পদ্ধতিতে পরীক্ষাগারে নির্দিষ্ট বিষাক্ত উপাদানকে লক্ষ্য করে অ্যান্টিবডি তৈরি করা সম্ভব। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি অ্যান্টিভেনমের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা উন্নত করতে পারে। তবে প্রচলিত প্রাণী-উৎপন্ন অ্যান্টিভেনমের বিকল্প হিসেবে এসব প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার এখনো গবেষণা ও উন্নয়নের বিষয়।

সাপের বিষের প্রতিষেধক দেশে উৎপাদনের উদ্যোগ

প্রকৃতি, বিজ্ঞান ও জীবনের পারস্পরিক সম্পর্ক

  • সাপ, ঘোড়া ও মানুষের এই সম্পর্ক বিজ্ঞানের এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত। সাপের বিষের ক্ষতিকর উপাদানকে শনাক্ত করে তার বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করা এবং সেই অ্যান্টিবডিকে জীবনরক্ষাকারী ওষুধে রূপান্তরিত করা মানুষের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির এক গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।

ঘোড়া এখানে কেবল শক্তি ও সৌন্দর্যের প্রতীক নয়; অ্যান্টিভেনম উৎপাদনের ক্ষেত্রে এটি মানবস্বাস্থ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাণী। তার শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার সহায়তায় তৈরি অ্যান্টিবডি বহু মানুষের চিকিৎসায় ভূমিকা রাখতে পারে।

বিষ থেকে প্রতিষেধক, বিপদ থেকে সম্ভাবনা—এই গল্প মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির জটিল প্রক্রিয়াকে বিজ্ঞান বুঝতে পারলে সেখান থেকেই জন্ম নিতে পারে জীবন রক্ষার নতুন পথ।

লেখক : ডাঃ এম আর করিম রেজা 
চিকিৎসক ও সমাজকর্মী 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!