বর্ষাকালে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার কথা থাকলেও চলতি বছরের শুরু থেকেই রোগটির বিস্তার ছিল উল্লেখযোগ্য। জানুয়ারির শুরু থেকে এখন পর্যন্ত দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে প্রায় পাঁচ হাজার ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। আক্রান্তের সংখ্যায় গত বছরের মতো এবারও শীর্ষে আছে বরিশাল বিভাগ। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে চট্টগ্রাম বিভাগ। তবে মৃত্যুর সংখ্যায় প্রথম স্থানে রয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত দেশে মোট ৪ হাজার ৬৮০ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১ হাজার ২৪৩ জন আক্রান্ত হয়েছেন বরিশাল বিভাগে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চট্টগ্রাম বিভাগে আক্রান্তের সংখ্যা ৯৫৬ জন।
.png)
এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৬৬০ জন, ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৫৯১ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ৩৫০ জন, খুলনা বিভাগে ৪৯০ জন, রাজশাহী বিভাগে ১৭০ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১৩৮ জন, সিলেট বিভাগে ৫৩ জন এবং রংপুর বিভাগে ২৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, আক্রান্তের সংখ্যায় শীর্ষে থাকা বরিশাল বিভাগে এ বছর এখনো কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। তবে ডেঙ্গুজনিত মৃত্যুর সংখ্যায় শীর্ষে রয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, যেখানে দুই জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম, ঢাকা, খুলনা, রাজশাহী এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে একজন করে মারা গেছেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কিটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, ডেঙ্গু এখন আর শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক রোগ নয়, এটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে।
তার মতে, গ্রাম থেকে শহর—প্রায় সর্বত্র অপরিকল্পিত নগরায়ন, দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের সমস্যার কারণে ডেঙ্গুর বিস্তার দ্রুত ঘটছে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি এডিস মশার বংশবৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। পাশাপাশি ঘনবসতিপূর্ণ নগর এলাকায় উঁচু ভবনের কারণে আলো-বাতাসের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় মশার সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ড. কবিরুল বাশার আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বেড়েছে, যা ডেঙ্গু সংক্রমণের জন্য অত্যন্ত সহায়ক পরিবেশ তৈরি করেছে। উষ্ণ আবহাওয়ায় ডিম থেকে পূর্ণবয়স্ক মশা হয়ে উঠতে কম সময় লাগে, ফলে মশার বংশবিস্তারও দ্রুত ঘটে। ডেঙ্গু এখন আর শুধু বর্ষাকালের রোগ নয়; সারা বছরই এর প্রকোপ কমবেশি অব্যাহত থাকছে।
এদিকে, বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডলকে ফোন করে না পাওয়া গেলেও বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ লোকমান হাকিম বলেন, কয়েক বছর ধরেই বরিশাল বিভাগে ডেঙ্গুর প্রকোপ উদ্বেগজনক। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভাগের সব হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড চালুর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গ্রামীণ পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে স্বাস্থ্যকর্মীদেরও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তিগত সচেতনতার বিকল্প নেই। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা গেলে আরও ভালো ফল পাওয়া সম্ভব।
বরিশালে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি হওয়ার কারণ সম্পর্কে ডা. লোকমান হাকিম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, মশা নিধন কার্যক্রমে ধীরগতি এবং জনসচেতনতার ঘাটতি এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী। এছাড়া দক্ষিণাঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট থাকায় অনেক মানুষ বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করেন। দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষিত এসব পানিতে এডিস মশা ডিম পাড়ে এবং লার্ভা জন্ম নেয়, ফলে মশার সংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল শাখার লাইন ডিরেক্টর মো. হালিমুর রশিদ বলেন, যে কোনো রোগের ক্ষেত্রে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই শ্রেয়। এই ব্যাপারে সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে সবার অংশগ্রহণে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে পারলেই ডেঙ্গু প্রতিরোধ করতে পারবো। ডেঙ্গু প্রতিরোধে ইতিমধ্যে সার্ভের কাজও করা হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় সরকার বিভাগ যার যার অবস্থান থেকে কাজ করছে। পুরো মৌসুমেই বিভিন্ন কর্মসূচি চলমান থাকবে।
উল্লেখ্য, বরিশাল বিভাগে প্রথম ডেঙ্গুর বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় ২০১৯ সালে। ওই বছর ডেঙ্গুতে ১৮ জনের মৃত্যু হয় এবং আক্রান্ত হন ১০ হাজারের বেশি মানুষ। পরবর্তীতে ২০২২ সালে আবারও ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেয়। ২০২৩ সালে বিভাগটিতে সর্বোচ্চসংখ্যক মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। এরপর থেকে সারা বছরই কমবেশি ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসছেন। ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে বরিশাল বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৯ হাজার ১১১ জন। একই সময়ে ডেঙ্গুতে ৪৪ জনের মৃত্যু হয়।