ঢাকা,  রোববার   ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ স্পটলাইট ]

আমের ঐতিহ্য ভাঙছে কাটিমন: অফ-সিজনেও বাজিমাত

বায়েজীদ মুন্সী বায়েজীদ মুন্সী
প্রকাশিত: ১৬:৫৪, ৪ অক্টোবর ২০২৬
আমের ঐতিহ্য ভাঙছে কাটিমন: অফ-সিজনেও বাজিমাত
কাটিমন জাতের আম- ফাইল ছবি

আমের মৌসুম শেষ মানেই আবার এক বছরের দীর্ঘ অপেক্ষা— চিরাচরিত এই ধারণাকেই বদলে দিয়েছে দেশের কৃষি। জ্যৈষ্ঠের আম্রপালি বা ফজলির বিদায়ের পর যে শূন্যতা তৈরি হতো, তা এখন নিপুণভাবে পূরণ করছে থাইল্যান্ডের উচ্চফলনশীল বারোমাসি জাত ‘কাটিমন’। অসময়েও ফলের রাজা আমের এই রাজত্ব বাজারে যেমন সুবাস ছড়াচ্ছে, তেমনি তৃপ্ত করছে ভোজনরসিকদের।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, থাই জাতের বারোমাসি কাটিমন আম দেশের কৃষি অর্থনীতি ও ফল চাষে এনেছে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এটি কোনো হাইব্রিড জাত নয়। অমৌসুমে মিষ্টি আমের স্বাদ মেটানোর পাশাপাশি কাটিমন আম সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।

Advertisement

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, কাটিমন একটি থাই জাতের বারোমাসি আম। এ জাতের আমগুলো দেখতে বেশ আকর্ষণীয় হয়ে থাকে। রাজশাহী, চাপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, নওগাঁ এবং মেহেরপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর উৎপাদন হচ্ছে। এটি বছরে তিনবার ফলন দেয়—প্রথমবার স্বাভাবিক মৌসুমে (মে-জুন), দ্বিতীয়বার আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে এবং তৃতীয়বার নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে। এমনকি সঠিক পরিচর্যা পেলে শীতের শুরুতেও কাটিমন আম গাছের ডালপালায় মুকুল দেখা যায়।

সূত্র জানায়, প্রতি বিঘায় কাটিমন চাষে প্রথম দুই বছর কিছুটা বিনিয়োগ বেশি হলেও পরবর্তী বছরগুলোতে পরিচালন ব্যয় বেশ কম। ছোট আকারের গাছ হওয়ায় এক বিঘা জমিতে প্রথাগত আম গাছের চেয়ে দ্বিগুণ বা তিনগুণ বেশি কাটিমনের চারা রোপণ করা সম্ভব (হাই-ডেনসিটি প্ল্যান্টেশন পদ্ধতি)। দেশে এখন প্রায় সাত হাজার একর জমিতে কাটিমনের বাণিজ্যিক চাষ হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি নওগাঁয়—৭০০ থেকে ৮০০ একর। এরপর চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৫০০ একরের বেশি জমিতে এর চাষ হচ্ছে। সব মিলিয়ে দেশে এখন প্রায় এক লাখ মেট্রিক টন কাটিমন উৎপাদিত হয়, যা মোট আম উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ। 

রাজধানীর গুলিস্তান, পুরানা পল্টন (হাউজ বিল্ডিং এর সামনে), ফার্মগেট, কচুক্ষেত বাজার এবং মহাখালীসহ বিভিন্ন স্থানে ঘুরে দেখা গেছে, অভিজাত এলাকার ফলের দোকান থেকে পাড়া-মহল্লার মোড়, ফুটপাত ও ভ্যানগাড়ি—সবখানেই অন্যান্য মৌসুমি ফলের সঙ্গে এটি পাওয়া যাচ্ছে। কাটিমনের বাজার এখন বেশ ভালো। মৌসুম শেষ হওয়ায় আমের বাজারে রয়েছে এর একচেটিয়া আধিপত্য। ফলে রূপে ক্রেতার মন, স্বাদে রসনা এবং শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় বাজার—সবই জয় করেছে কাটিমন। অসময়ের আম বলে দাম কিছুটা বেশি, তবে নাগালের বাইরে নয়। মানভেদে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ৩০০ টাকায়। আর আকার ভেদে প্রতি কেজিতে ৩ থেকে ৬ টি আম পাওয়া যাচ্ছে। ফুটপাত, সুপারশপ ও অভিজাত এলাকার পাশাপাশি অনলাইনেও বিক্রি হচ্ছে কাটিমন। ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক চাষি ও ব্যবসায়ী সরাসরি ক্রেতাদের কাছে ভালো মানের আম পৌঁছে দিচ্ছেন।

গুলিস্তানের আম বিক্রেতা শরিফুল ইসলাম জানান, রাজধানীর বাদামতলী এলাকার পাইকারি বাজার থেকে আম সংগ্রহ করেন তিনি। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সেখানে কাটিমন আসে। প্রতিদিন প্রায় ২ মণ আম বিক্রি করেন তিনি। সবচেয়ে ভালো মানের তিনটি আমে এক কেজি হয়। আবার আকার একটু ছোট হলে চার থেকে ছয়টিও ধরে। তবে আকার ভেদে দামের তারতম্য রয়েছে। বড়গুলো কেজি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। আর মাঝারি সাইজের ২০০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা। এছাড়া বড় দোকানের বাইরে ভ্যান বা ফুটপাতে ১৬০ টাকা কেজির আমগুলো কিছুটা নিম্নমানের—আকারে ছোট ও কম মিষ্টি, তবে টক নয়।

ক্রেতারা বলছেন, আষাঢ়-শ্রাবণ পেরিয়ে শরৎ কিংবা হেমন্তের মিষ্টি রোদেও পাড়ার ফলের দোকানে থরে থরে সাজানো তাজা ও মিষ্টি আম পাওয়া যাচ্ছে এ দেখেই ভালো লাগছে। মৌসুমী ফলের সীমা ছাড়িয়ে বারোমাসি এই আম এখন কেবল মানুষের রসনাই তৃপ্ত করছে না, এদেশের বহু কৃষকের জীবনে আনছে আর্থিক স্বচ্ছলতাও। বৈচিত্র্যময় এই ফলের হাত ধরে বাংলাদেশের কৃষি খাত ভবিষ্যতে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে বলেই প্রত্যাশা করেন তারা।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের পরিচালক ড. মো. মাহফুজ আলমের মতে, থাই জাতের বারোমাসি কাটিমন আম দেশের কৃষি অর্থনীতি ও ফল চাষে এনেছে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এটি কোনো হাইব্রিড জাত নয়। প্রতিটি ২০০-৩৫০ গ্রাম ওজনের এই আম পাকার পর গাঢ় হলুদ ও হালকা সবুজ আভা ছড়ায়। তিনি বলেন, অ-মৌসুমী ফলের স্বাদে ঘাটতি থাকলেও কাটিমন ব্যতিক্রম। আঁশহীন, দারুণ রসালো এবং পাতলা আঁটির কারণে এর ভোজ্য শাঁসের পরিমাণ অনেক বেশি। মিষ্টতার মাত্রা ২০-২২% হওয়ায় এটি অত্যন্ত সুস্বাদু। সাধারণ তাপমাত্রায় ৭-১০ দিন সতেজ থাকায় দূর-দূরান্তে পরিবহন করাও খুব সহজ। অমৌসুমে মিষ্টি আমের স্বাদ মেটানোর পাশাপাশি কাটিমন আম সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।

অফ-সিজনে আন্তর্জাতিক বাজারে বছরজুড়ে আম সরবরাহ করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ দেখাচ্ছে ‘কাটিমন’ জাত। রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক আরিফুর রহমান জানান, মানসম্মত উৎপাদন নিশ্চিত করতে পারলে এ জাতের মাধ্যমে বৈশ্বিক বাজারে স্থায়ী অবস্থান তৈরি সম্ভব। তবে এই বিরাট সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে কিছু প্রাকৃতিক ও কারিগরি চ্যালেঞ্জ। অফ-সিজনের অতিবৃষ্টি ও তীব্র ঠান্ডায় মুকুল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের কোল্ড চেইন বা নিয়ন্ত্রিত পরিবহন ব্যবস্থার অভাবকে অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি।

ডেইলি-বাংলাদেশ/বিএম/এসআই
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!