ঢাকা,  সোমবার   ১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩

[ স্পটলাইট ]

ভর্তুকিতে চলছে রাষ্ট্রায়ত্ত ২৩০ প্রতিষ্ঠান

মো. শাহজাহান মো. শাহজাহান
প্রকাশিত: ১৬:১০, ১২ অক্টোবর ২০২৬
ভর্তুকিতে চলছে রাষ্ট্রায়ত্ত ২৩০ প্রতিষ্ঠান
বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি

দেশের অ-আর্থিক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের বাজেটের ওপর বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন বা ব্যবসায়িক কার্যক্রম না থাকলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও পরিচালন ব্যয় মেটাতে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি ও অনুদান দিতে হচ্ছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য ভর্তুকি বাবদ ৮৯ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থ বিভাগের তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো থেকে এ চিত্র উঠে এসেছে।

অর্থ বিভাগের একাধিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে অ-আর্থিক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৩০টি। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত জনবলের সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ১১ হাজার ৩৮৭ জন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পরিচালন ব্যয়ের জন্য অনুদান পাওয়া ১৭৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৮৮টিরই নিজস্ব কোনো আয় ছিল না। বাকি ৮৬টি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত আয় ছিল মাত্র ২ হাজার ৫২ কোটি টাকা। অর্থাৎ, প্রায় অর্ধেক প্রতিষ্ঠানই পুরোপুরি সরকারি অর্থের ওপর নির্ভরশীল।

ঋণঝুঁকির চিত্রও উদ্বেগজনক। ১২২টি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়নে দেখা গেছে, ১৯টি রয়েছে অতি উচ্চ ঋণঝুঁকিতে। এসব প্রতিষ্ঠানের মোট দায়ের পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ২২ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। একই সঙ্গে আর্থিকভাবে দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে ২৪টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ১২টি অতি উচ্চ ঋণঝুঁকির তালিকায়ও রয়েছে। সব মিলিয়ে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ও আর্থিকভাবে দুর্দশাগ্রস্ত ৩১টি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত জনবলের সংখ্যা প্রায় ২৭ হাজার।

অতি উচ্চ ঋণঝুঁকিতে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকায় রয়েছে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি), ছাতক সিমেন্ট, ইস্টার্ন টিউবস, গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি, মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং, জয়পুরহাট সুগার মিলস, খুলনা ওয়াসা, কুষ্টিয়া সুগার মিলস, মোবারকগঞ্জ সুগার মিলস, নাটোর সুগার মিলস, পাবনা সুগার মিলস, রাজশাহী সুগার মিলস, রেনউইক যজ্ঞেশ্বর, শ্যামপুর সুগার মিলস, ঠাকুরগাঁও সুগার মিলস, জিল বাংলা সুগার মিলস এবং টেলিটক বাংলাদেশ।

অন্যদিকে, আর্থিকভাবে দুর্দশাগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন, বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন, কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি, ঢাকা লেদার, ফরিদপুর সুগার মিলস, গাজী ওয়্যারস, পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ, রংপুর সুগার মিলস, সেতাবগঞ্জ সুগার মিলস, ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ফর কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ, উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরি এবং বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ।

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে চিনিকলগুলোর অবস্থা বিশেষভাবে করুণ। অনেক চিনিকল বছরের পর বছর লোকসান দিয়ে চলছে, আবার কোনো কোনো মিলের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। ছাতক সিমেন্ট কারখানার উৎপাদন পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ। কারখানাটি সংস্কারে গত এক দশকে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও এখনো উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হয়নি।

ঢাকা লেদার কোম্পানির অবস্থাও একই রকম। ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটি মাত্র ছয় দিন উৎপাদন চালানোর পর বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৯৮ সাল থেকে পুরোপুরি বন্ধ থাকলেও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এখনো সরকারি অর্থ থেকে দেওয়া হচ্ছে।

টেলিটক বাংলাদেশও আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ১৫৫ কোটি টাকা লোকসান করেছে। গ্রাহকসংখ্যা ও আয়ের দিক থেকেও প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত এই মোবাইল ফোন অপারেটর।

বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষও আর্থিক চাপের মধ্যে রয়েছে। সরকার বিপুল অর্থ ব্যয়ে কয়েক ডজন হাই-টেক ও সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক নির্মাণ করেছে। কিন্তু এসব পার্ক থেকে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আসেনি।

কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুর রহমান বলেন, ‘বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের পরও অনেক পার্ক এখনো বিনিয়োগ উপযোগী হয়নি। যশোর, চট্টগ্রাম ও নাটোরের কয়েকটি ছাড়া বাকিগুলোতে কাঙ্ক্ষিত সাড়া মেলেনি। এখন সেগুলোকে আকর্ষণীয় করার চেষ্টা চলছে। এ কারণেই আর্থিক লোকসান হচ্ছে।’

২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের লোকসানের পরিমাণ ছিল ১১৮ কোটি টাকা।

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে অ-আর্থিক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৪ হাজার ১০০ কোটি টাকা। একই সময়ে ভর্তুকি, উন্নয়ন সহায়তাসহ এসব প্রতিষ্ঠানে সরকারের মোট নিট আর্থিক সহায়তা বেড়ে প্রায় ৮৮ হাজার ২০০ কোটি টাকায় পৌঁছায়। এ লোকসানের সিংহভাগের জন্য দায়ী বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত।

এদিকে, নবম জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের বেতন-ভাতা খাতে ব্যয় আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলোর পেছনে সরকারি অর্থের জোগান অব্যাহত রাখার চাপও বাড়তে পারে।

অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করেন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সারের মতো কৌশলগত খাতের কিছু প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন। তবে যেসব প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর লোকসান দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও লাভজনক হওয়ার সম্ভাবনা নেই, সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া বা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তাদের মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রশাসনিক উদ্যোগের পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছাও জরুরি।

শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সংসদে জানিয়েছেন, শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন ৩১টি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প ইউনিট বর্তমানে লোকসানে চলছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের পাঁচটি, বাংলাদেশ সুগার অ্যান্ড ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের ১৪টি এবং বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের ১২টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

শিল্পমন্ত্রী বলেন, সার কারখানাগুলোর বাণিজ্যিক ঘাটতি পূরণে ভর্তুকি দেওয়া হয়। তবে চিনি ও ইস্পাত খাতের লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু চলতি মূলধন হিসেবে ঋণসহায়তা দেওয়া হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের লোকসান কমাতে সরকার আধুনিকায়ন, জনবল যৌক্তিকীকরণ এবং বেসরকারি বিনিয়োগ আনার উদ্যোগ নিয়েছে। অলস ও লোকসানি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এক থেকে দুই বছরের মধ্যে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের কেন্দ্রে রূপান্তরের পরিকল্পনাও রয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন অর্থনীতিবিদেরা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘অনেক প্রতিষ্ঠানই সরকারের জন্য আর্থিক রক্তক্ষরণের উৎস হয়ে উঠেছে। সামগ্রিক সংস্কার পরিকল্পনা জরুরি। কোনো প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে হস্তান্তর, কোনোটির ব্যবস্থাপনা বেসরকারি খাতে দেওয়া কিংবা শেয়ার অফলোড করা যেতে পারে। যেগুলোর বিপুল জমি ও সম্পদ রয়েছে, সেগুলোর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।’

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বল কাঠামো পুনর্গঠনের ওপর জোর দিয়ে আসছেন। তিনি বলেছেন, প্রতিষ্ঠানগুলোতে পেশাদারত্ব, স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করা না গেলে বড় কোনো অর্থনৈতিক কর্মসূচিও সফল হবে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, সরকারি ব্যয়ের চাপ কমানো এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার স্বার্থে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক রক্তক্ষরণ বন্ধ করা জরুরি। এ জন্য প্রতিষ্ঠানভিত্তিক আর্থিক মূল্যায়ন, জবাবদিহি নিশ্চিত করা, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং বাস্তবসম্মত সংস্কার পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েও কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমএস/একেকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!