ঢাকা,  রোববার   ১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩

[ স্পটলাইট ]

আসল বইয়ের প্রচ্ছদে নকলের রমরমা বাণিজ্য

মো. শাহজাহান মো. শাহজাহান
প্রকাশিত: ২০:৪৪, ১১ অক্টোবর ২০২৬
আসল বইয়ের প্রচ্ছদে নকলের রমরমা বাণিজ্য
নীলক্ষেতের দোকান

ঢাকার নীলক্ষেত, বাংলাবাজার থেকে শুরু করে দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা শহরের বইয়ের দোকানে এখন একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। এনসিটিবি অনুমোদিত পাঠ্যবইয়ের নকল সংস্করণ এমনভাবে বাজার দখল করে নিয়েছে যে আসল বই খুঁজে পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে। নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগেই একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত বইগুলোর জাল কপি ছেয়ে গেছে বাজার। প্রচ্ছদ হুবহু নকল করে, ভেতরে ভুল তথ্য, পুরনো সিলেবাস এবং নিম্নমানের কাগজ দিয়ে তৈরি এসব বই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিচ্ছে একটি সংগঠিত চক্র। 

এ চক্রের কার্যক্রম এতটাই সুসংগঠিত যে আসল বই বাজারে আসার আগেই তারা তাদের নকল বই ছড়িয়ে দেয়। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রথমেই নকল বই কিনে ফেলেন। এসএসসি পাস করে কলেজে ওঠা শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ সমস্যা সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। নীলক্ষেতের দোকান থেকে কেনা বই নিয়ে ক্লাসে গিয়ে তারা আবিষ্কার করছেন যে ভেতরের বিষয়বস্তু ভুল, পুরনো সিলেবাস বা অসম্পূর্ণ। পরে আসল বই কিনতে গিয়ে পরিবারগুলোকে দ্বিগুণ খরচ করতে হচ্ছে।

সম্প্রতি রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকায় এ চক্রের একটি বড় ঘাঁটি ধরা পড়ে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর রাত ৯টার দিকে ঝাউচর গুদারাঘাটের কাছে পানির ফ্যাক্টরির গলিতে অবস্থিত একটি নামহীন ছাপাখানায় অভিযান চালায় স্থানীয় থানা পুলিশ ও প্রকাশনা সংস্থার প্রতিনিধিরা। মানিক মিয়া নামে পরিচিত ওই প্রেসের মালিকের কাছে অক্ষরপত্র প্রকাশনীর ‘বাংলা ব্যাকরণ ও নির্মিতি’ এবং হাসান বুক হাউজের পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানসহ একাধিক বইয়ের বিপুল পরিমাণ ফর্মা ও কভার বাঁধাইয়ের জন্য প্রস্তুত অবস্থায় পাওয়া যায়। প্রশ্ন করা হলে মানিক মিয়া কোনো স্পষ্ট জবাব দিতে পারেননি। প্রেসে রাখা ফর্মা ও কভারের পরিমাণ দেখে সহজেই বোঝা যায় যে বড় পরিসরে নকল বই তৈরির কাজ চলছিল।

অভিযানের সময় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। পুলিশ যখন জব্দ তালিকা তৈরির কাজ শুরু করে, তখন ফয়সাল ও মাসুদ রানার নেতৃত্বে প্রায় ২০-২৫ জনের একটি দল ঘটনাস্থলে এসে হামলা চালায়। তারা রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে পুলিশ ও প্রকাশকদের বাধা দেয় এবং হুমকি প্রদর্শন করে। হাসান বুক হাউজের দুই প্রতিনিধিকে ঘিরে ফেলা হয় এবং ভয় দেখানো হয়। শেষ পর্যন্ত জব্দ প্রক্রিয়া শেষ করা যায়নি। পুলিশ ‘সমঝোতা’র কথা বলে সরে যায়। মাসুদ রানা পরে দাবি করেন, বিষয়টি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। তবে প্রকাশক মহল বলছে, এরা আগেও একই ধরনের অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং এখন নতুন পরিচয়ে সক্রিয়। এ ধরনের প্রশাসনিক শিথিলতা নকল চক্রকে আরও সাহস জোগাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঢাকার একটি সরকারি কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক অধ্যাপক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ক্লাসে অনেক শিক্ষার্থী এমন বই নিয়ে আসে যাতে সূত্র ও চিত্র ভুল। আমি নিজে পরীক্ষা করে দেখেছি পুরনো সিলেবাসের বিষয় রয়েছে। এতে তারা বিভ্রান্ত হচ্ছে এবং পরীক্ষায় খারাপ করছে। বিশেষ করে পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের মতো বিষয়ে ভুল তথ্য তাদের ভিত্তি নষ্ট করে দিচ্ছে। বাংলা বিভাগের শিক্ষক নাজমা আক্তার বলেন, ব্যাকরণের নকল বইয়ে এত ভুল যে শিক্ষার্থীরা ভুল শিখছে। এটি তাদের ভিত্তি নষ্ট করছে এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি করবে। অনেক অভিভাবক পরে আসল বই কিনতে বাধ্য হচ্ছেন, যা তাদের জন্য অতিরিক্ত বোঝা।

বৈধ প্রকাশকদের অবস্থা আরও নাজুক। এনসিটিবির অনুমোদন নিয়ে বই প্রকাশ করতে তাদের বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে হয়। রয়্যালিটি দিতে হয়, লেখক-সম্পাদকদের সম্মানী দিতে হয় এবং মানসম্মত কাগজ ও প্রেস ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু নকল চক্র এসব খরচ এড়িয়ে সস্তায় বই তৈরি করে বাজারে কম দামে ছাড়ছে। ফলে বৈধ প্রকাশকরা অসম প্রতিযোগিতায় পড়ে গুনছেন লোকসান। হাসান বুক হাউজের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, আমাদের বই বাজারে আসার আগেই নকল ছেয়ে যায়। বিনিয়োগ ও রয়্যালিটির টাকা ডুবে যাচ্ছে। এভাবে চললে অনেক প্রকাশক ব্যবসা গুটিয়ে নেবে। আমরা প্রতিবছর কোটি টাকা খরচ করে মানসম্মত বই তৈরি করি কিন্তু নকল চক্র সেই বাজার দখল করে নিচ্ছে। অক্ষরপত্র প্রকাশনীর এক প্রতিনিধি বলেন, প্রচ্ছদ হুবহু কপি করে শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। আমাদের বিক্রি কমে যাচ্ছে এবং বাজার নষ্ট হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে প্রকাশনা শিল্পই সংকটে পড়বে।

শিক্ষা বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সালমা বেগম বলেন, নকল পাঠ্যবই শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, এটি জাতীয় শিক্ষার মানের ওপর আঘাত। ভুল তথ্য দিয়ে প্রজন্মকে বিপথে চালিত করা হচ্ছে। সরকারকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষার্থীরা যদি ভুল শেখে তাহলে দেশের ভবিষ্যৎ কর্মীবাহিনী দুর্বল হবে। 

অর্থনীতিবিদ ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, এ ধরনের ছায়া ব্যবসা রাজস্ব ক্ষতি করে এবং বৈধ শিল্পকে ধ্বংস করে। এনসিটিবি ও রাজস্ব বোর্ডের যৌথ নজরদারি ছাড়া এ সমস্যা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি যাচ্ছে, যা শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের জন্য ব্যবহার হতে পারত।

আরেক শিক্ষাবিদ ও সাবেক কলেজ অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. শামসুল হক বলেন, নকল বইয়ের কারণে শিক্ষার্থীরা শুধু অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, তাদের শেখার প্রক্রিয়াই ব্যাহত হচ্ছে। বিজ্ঞান ও ব্যাকরণের মতো বিষয়ে ভুল তথ্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর। সরকারকে এখনই হলোগ্রাম বা কিউআর কোড চালু করতে হবে যাতে সহজে আসল বই চেনা যায়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তদারকির অভাব ও প্রশাসনিক উদাসীনতাই এ চক্রকে শক্তিশালী করেছে। শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা, প্রকাশনা শিল্প রক্ষা এবং রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করতে এখনই যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন। এনসিটিবি, এনবিআর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে টাস্কফোর্স গঠন করে নিয়মিত অভিযান চললে এই চক্রকে নির্মুল সম্ভব। 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমএস/এসআই
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!