মার্সেলো: ব্রাজিলের রক্ষণভাগের এক অপ্রতিরোধ্য দুর্গ
আবেগ, ভালোবাসা ও অস্পর্শ মোহনীয়তায় বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ফুটবল। ৯০ মিনিটের খেলায় দু’দলের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে উপস্থিত সমর্থকদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে উত্তেজনার পারদ। ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলানো ম্যাচগুলোতে যেকোনো সময় যেকোনো অঘটন ঘটে যায়। অবশ্য এর পেছনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকেন দুর্দান্ত ও অপ্রতিরোধ্য ফুটবলাররা।
লাতিন আমেরিকার ছন্দ, নৈপুণ্য ও গোছানো ফুটবলে মুগ্ধ সারাবিশ্বের ফুটবলপ্রেমীরা। এ তালিকায় সবেচেয়ে উপরে থাকবে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের নাম। ফুটবলের মাঠে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী এ দু’দলের লড়াইয়ের কথা কারোই অজানা নয়।
সেলেসাওদের জার্সিতে ফুটবলের মাঠে নৈপুণ্যতা ছড়ানো এক কিংবদন্তী মার্সেলো ভিয়েরা দা সিলভা জুনিয়র। ক্যারিয়ারের শুরুটা অমলিন হলেও সময়ের ব্যবধানে পায়ের জাদুতে নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়।
.png)
ব্রাজিল কিংবদন্তী মার্সেলোর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার নিয়ে ডেইলি বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য লিখেছেন আশরাফুল ইসলাম আকাশ।

১৯৮৮ সালের ১২ মে ব্রাজিলের রিওডি জেনেইরোতে জন্মগ্রহণ করেন মার্সেলো। সেখানেই তার বেড়ে ওঠা। ২০০২ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে ব্রাজিলের স্থানীয় ক্লাব ‘ফ্লুমিনেন্স’ যুব দলের হয়ে ফুটবলে আত্মপ্রকাশ করেন। এরপর একই ক্লাবের হয়ে পেশাদারি ফুটবলে নাম লেখান তিনি।
ফ্লুমিনেন্সের মূল দলে মার্সেলোর সুযোগ হয় ২০০৫ সালে। এরপর ক্লাবটির হয়ে মাত্র এক মৌসুম অতিবাহিত করেন। যেখানে ৩০ ম্যাচে ৬টি গোল করেন এ ফুটবলার।
ঘরোয়া লিগে দুর্দান্ত পারফর্ম করা মার্সেলোর ব্রাজিলের জার্সিতে অভিষেক হতে সময় লাগেনি। নিজ দেশের ক্লাবে অপ্রতিরোধ্য মার্সেলো বয়সভিত্তিক দলের হয়ে বিশ্বকাপে অংশ নেন।

২০০৫ সালে ব্রাজিল অনূর্ধ্ব-১৭ দলে অভিষেক হয় মার্সেলোর। অবশ্য এ আসরে রানার্সআপ হন তারা। ফাইনালের মঞ্চে প্রতিপক্ষ মেক্সিকোর সঙ্গে ৩-০ গোলের ব্যবধানে হেরে যায় সেলেসাওদের যুবারা। এর পরের বছর অর্থাৎ ২০০৬ সালে ব্রাজিল জাতীয় দলের জার্সিতে অভিষেক হয় তার।
সে বছরের ৫ সেপ্টেম্বর ওয়েলসের বিপক্ষে মাঠে নামেন মার্সেলো। অভিষেক ম্যাচের ৬০তম মিনিটে জিলবের্তোর অ্যাসিস্টে নিজের প্রথম গোলটি করেন তিনি। ম্যাচটি ব্রাজিল ২–০ গোলের ব্যবধানে জয়লাভ করেছিল সেলেসাওরা।
এরপর ২০০৬-০৭ মৌসুমে সাড়ে ৬ মিলিয়ন ইউরোতে ব্রাজিল থেকে স্প্যানিশ ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন মার্সেলো। সেখানে প্রায় ১৬ মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৫৪৬ ম্যাচে ৩৮টি গোল করেন তিনি। একই সঙ্গে রিয়ালের জার্সিতে ২৫টি শিরোপা জয়লাভ করেন এ লেফ্ট ব্যাক।

২০০৮ সালে চীনে অনুষ্ঠিত গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে ব্রাজিলের হয়ে সুযোগ পান মার্সেলো। যেখানে ৬ ম্যাচে ১টি গোল করার পাশাপাশি দলকে ব্রোঞ্জ পদক জেতান এ ফুটবলার। এর চার বছর পর লন্ডনে অনুষ্ঠিত অলিম্পিকের জন্য ব্রাজিল স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত হন তিনি। ওই আসরের ফাইনালে মেক্সিকো অনূর্ধ্ব-২৩ দলের কাছে ২–১ গোলের ব্যবধানে পরাজিত হয়ে রৌপ্য পদক জয়লাভ করেছিল তার দল।
ব্রাজিলের হয়ে এখন পর্যন্ত ২টি বিশ্বকাপে (২০১৪ এবং ২০১৮) অংশ নিয়েছেন মার্সেলো। এর আগে ব্রাজিলের হয়ে ২০১৩ ফিফা কনফেডারেশন্স কাপের শিরোপা জেতেন তিনি। সেলেসাওদের ৫৮টি ম্যাচ খেলে ৬ গোল করেছেন তিনি।
২০১৪ সালে লুইজ ফেলিপে স্কলারির অধীনে ব্রাজিল দলে প্রথমবারের মতো ফিফা বিশ্বকাপে সুযোগ পান মার্সেলো। এ টুর্নামেন্টে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই অভিষেক হয় তার। এ ম্যাচের ১১তম মিনিটে একটি আত্মঘাতী গোল করেছিলেন মার্সেলো; যা ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার একমাত্র গোল ছিল।

২০১৭ সালের ১৪ নভেম্বরে লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ব্রাজিলের জার্সি গায়ে ৫০তম ম্যাচ খেলেন মার্সেলো। যেখানে তিনি পূর্ণ ৯০ মিনিট খেলেছেন তিনি। এ ম্যাচটি গোল শূন্যে ড্র হয়েছিল।
এরপর ২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপের জন্য ২৩ সদস্যের দল ঘোষণা করে ব্রাজিল। এ স্কোয়াডে সুযোগ পান মার্সেলোও। এ আসরের গ্রুপ পর্বে নিজেদের প্রথম ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ব্রাজিলের অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
বর্তমানে গ্রিসের পেশাদার ফুটবলের সুপার লিগ গ্রিসের ক্লাব অলিম্পিয়াকোসের হয়ে লেফ্ট ব্যাক পজিশনে খেলছেন মার্সেলো। চলতি মৌসুমেই ক্লাবটিতে পাড়ি জমিয়েছেন তিনি। এর আগে ২০২১–২২ মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন। যার মধ্য দিয়ে ১৯০৪ সালের পর রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাসে প্রথম বিদেশি অধিনায়কত্ব সামলান এ ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তী।

ব্যক্তিগত জীবনে ২০০৮ সালে দীর্ঘদিনের বান্ধবী ক্লারিস আলভেসের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন মার্সেলো। এ দম্পতির এনজো গাত্তুসো আলভেস ভিয়েরা এবং লিয়াম নামে দুটি পুত্রসন্তান রয়েছে।
রিয়াল মাদ্রিদ টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্সেলো বলেছিলেন, ‘পেদ্রো (মার্সেলোর দাদা) না থাকলে তিনি ফ্লুমিনেন্সের হয়ে কখনো ফুটবল খেলতে পারতেন না।’ এজন্য তার প্রতি শ্রদ্ধার সঙ্গে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তিনি।