বলছিলাম রবিচন্দ্রন অশ্বিনের কথা। তর্কাতীতভাবে তিনি সর্বকালের সেরা স্পিনারদের একজন হিসেবে বিশ্ব ক্রিকেটে সমাদৃত। ব্যাট হাতে সময় উপযোগী ভূমিকা রাখায় নিজের গায়ে জড়ান অলরাউন্ডারের তকমা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়ে তিনি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ক্যারিয়ারজুড়ে তার মায়ের প্রভাব ও পরামর্শ যেন হয়ে রইল সন্তানের বিশ্ব মাতানোর এক আদর্শ দৃষ্টান্ত।
পরিসংখ্যান তো বটেই, মাঠে অশ্বিনের একের পর এক পারফরম্যান্স তার সকল কীর্তি ও শ্রেষ্ঠত্বের সাক্ষী হয়ে থাকবে। টেস্টে দ্রুততম ৩০০ উইকেট শিকারি বোলার হিসেবে তার নামটা সবার উপরেই আছে। এই ফরম্যাটে তিনি ৩,০০০ রান এবং ৫০০ উইকেট নেয়া মাত্র তিনজন খেলোয়াড়ের মধ্যে একজন। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাদা পোশাকের ক্রিকেটের র্যাংকিংয়ে বোলারদের তালিকার ছিলেন শীর্ষস্থানে। একইসঙ্গে তিনি টেস্টে সর্বকালের সর্বোচ্চ রেটিং পয়েন্ট (৯০৪) পাওয়া ভারতীয় বোলার।
.png)
একজন ওপেনিং ব্যাটার হিসেবে অশ্বিন ক্রিকেটের যাত্রা শুরু করেন। তবে সীমিত সাফল্যের কারণে নিজের ব্যাটিং অর্ডার নামিয়ে দেন। পেস বোলিং ছেড়ে অফব্রেক বোলারে পরিণত হওয়ার পেছনে রয়েছে একটি গল্প। গণমাধ্যমকে ১০ মাস আগে সে গল্প শুনিয়েছিলেন তার বাবা রবিচন্দ্রন। ওই সময় তিনি সদ্য অবসরের ঘোষণা দেওয়া স্পিনারের মায়ের অবদানের কথা প্রকাশ্যে আনেন।
তিনি বলেন, ‘অশ্বিনের ক্যারিয়ারে অফ স্পিনার হওয়াই সবচেয়ে বড় বাঁকবদল ছিল। এই সিদ্ধান্তের জন্য আমার স্ত্রী চিত্রাকে (অশ্বিনের মা) ধন্যবাদ দিতেই হবে। একটা সময় অশ্বিনের শ্বাসকষ্ট ছিল এবং ওর হাঁটুতেও সমস্যা ছিল। দৌড়ে বল করা ওর জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তখন চিত্রাই বলল, ‘‘তোমাকে এত দৌড়াতে হবে কেন? শুধু কয়েক পা ফেলো এবং স্পিন বল করো’’।’
সন্তান যেন ক্রিকেটের প্রতি নিবেদন ও দেশের প্রতিনিধিত্ব করা থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত না হন, সেদিকেও সজাগ দৃষ্টি রেখে গিয়েছেন অশ্বিনের মা। হাসপাতালের বিছানায় মুমূর্ষু অবস্থায় শুয়ে থেকেও তাকে দেখে যা বলেছিলেন, সেটি অনেকের আবেগকে ছুঁয়ে যেতে বাধ্য। গণমাধ্যমকে অশ্বিন বলেছিলেন সেই হৃদয় স্পর্শ করা মুহূর্তের ঘটনা।
‘আমি বিমান থেকে নেমেই দ্রুত মায়ের কাছে চলে যাই। আমি যাওয়ার পর মায়ের জ্ঞানে ফেরে, আবার জ্ঞান হারান। আমাকে দেখেই মা বলেন, তুমি কেন এসেছ? টেস্টের মাঝখানে কেন এসেছ? এরপর আবার যখন তিনি জ্ঞান ফিরে পান তখন আমাকে বলেন, আমার মনে হয় তোমার ফিরে যাওয়া উচিৎ। কারণ টেস্ট ম্যাচ এখনো চলছে। ম্যাচ শেষ হয়নি।’
মায়ের বাধ্য ছেলে হয়ে অশ্বিন ফের রাজকোট এসে দলের সাথে যোগ দেন। তিনি মাঠে যতক্ষণ ছিলেন না, ততক্ষণ ১০ জন নিয়ে খেলেছে ভারতীয় দল। তিনি টেস্টের চতুর্থ দিন দলের সঙ্গে যোগ দেন এবং জয় নিয়ে মাঠ ছাড়েন।
২০১১ সালে অভিষেক টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ড্যারেন ব্রাভোকে বোল্ড করে অশ্বিনের উইকেট নেয়া শুরু। সপ্তম ভারতীয় বোলার হিসেবে অভিষেক টেস্টে ৫ উইকেট নেন। মায়ের অসুস্থতার খবর পাওয়ার আগে রাজকোটে ৫০০ উইকেটের মাইলফলকে পৌঁছান। ৫০০ উইকেট নিতে অশ্বিনকে করতে হয়েছে ২৫,৭১৪ বল। তার চেয়ে কম বল করে এই মাইলফলকের দেখা পেয়েছেন শুধুমাত্র অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তি গ্লেন ম্যাকগ্রা। তিনি করেছিলেন ২৫,৫২৮ বল।
অশ্বিন ১৯৮৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তামিলনাড়ু প্রদেশের মাদ্রাজে (বর্তমানে চেন্নাই) জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা রবিচন্দ্রন একজন ফাস্ট বোলার হিসেবে ক্লাব পর্যায়ে ক্রিকেট খেলতেন। নিজেকে সর্বকালের সেরা ক্রিকেটারদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেও লেখাপড়াতেও তিনি ছিলেন মেধাবী। চেন্নাইয়ের আন্না বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত শ্রী শিবাসুব্রামানিয়াম নাদার প্রকৌশল কলেজ থেকে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন।
অতীতের স্মৃতিচারণে অশ্বিনের বাবা বলেছিলেন, ‘একই সঙ্গে লেখাপড়া ও খেলাধুলায় মনোযোগ দেওয়া সহজ নয়। যখন সে ছোট ছিল, তখনই বুঝতে পেরেছিল যে আমি ওর জন্য কতটা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। অশ্বিন শুরু থেকেই কঠোর পরিশ্রমী আর ক্রিকেটপাগল ছিল। সে যখন নেটে ব্যস্ত ছিল, আমি তখন ওর বন্ধুদের কাছ থেকে নোট ধার করতাম। তারপর ফটোকপি করে ওর হাতে তুলে দিতাম।’
‘ক্রিকেট আমাদের জীবনের অংশ হয়ে গেলেও শিক্ষাকে উপেক্ষা করিনি। ওকে পড়ালেখায় মনোযোগী হতেই হতো। কারণ গণিত ও বিজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। তবে আমি যখন ওকে পড়াতে নিয়ে বসতাম, সে আমাকে একটা শর্ত দিতো। ওকে টিভিতে খেলা দেখতে দিতে হবে। আমি কখনোই ওকে খেলা দেখতে নিষেধ করিনি। কারণ যদি আমি সেটা করতাম, ওর মন বই থেকে সরে গিয়ে শুধু খেলা নিয়েই ভাবতো।’
ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ টেস্ট উইকেট সংগ্রাহক হিসেবে অশ্বিন বিদায় বলেছেন। ১০৬ টেস্টে নিয়েছেন ৫৩৭ উইকেট। তার আগে রয়েছেন অনিল কুম্বলে। ১৩২ টেস্টে কুম্বলের শিকার ৬১৯ টেস্ট।
সাদা বল অর্থাৎ সীমিত ওভারের ক্রিকেটেও অ্যাশের পারফরম্যান্স ছিল উজ্জ্বল। ১১৬টি ওয়ানডে ম্যাচে মাঠে নামেন। ১১৪টি ইনিংসে বল করে ১৫৬টি উইকেট নিয়েছেন। ইনিংসে ৪ উইকেট নিয়েছেন ১ বার। তার সেরা বোলিং ফিগার ২৫ রানে ৪ উইকেট।
মোট ৬৫টি আন্তর্জাতিক টি-২০ ম্যাচে মাঠে নামেন। ৬৫টি ইনিংসে বল করে ৭২টি উইকেট নিয়েছেন। এক ইনিংসে ৪ উইকেট নিয়েছেন দুই বার। সেরা বোলিং ফিগার মাত্র ৪ রান খরচায় ৪ উইকেট। ১৯টি ইনিংসে ব্যাট করে ১৮৪ রান সংগ্রহ করেন। সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস অপরাজিত ৩১ রানের।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে একটি সিরিজে ২৯ উইকেট পেয়েছিলেন। এটি ছিল চার ম্যাচ টেস্ট সিরিজে যেকোনো ভারতীয় বোলারের পাওয়া সর্বাধিক উইকেট। ২০১৫-১৬ মৌসুমে তিনি ৪৮ উইকেট নিয়েছিলেন। ঐ মৌসুমে আট টেস্টে ৩৩৬ রান করেন। পাশাপাশি ১৯ টি-২০তে ২৭ উইকেট পান।
এই নৈপুণ্য তাকে ২০১৬ সালে আইসিসি বর্ষসেরা ক্রিকেটার এবং পুরুষদের বর্ষসেরা টেস্ট ক্রিকেটারের পুরস্কার জিততে সক্ষম হন। পাঁচবার আইসিসি বর্ষসেরা টেস্ট দলে নাম লেখানোর পাশাপাশি এবং পুরুষদের ২০১১-২০২০ সালের দশকের টেস্ট দলেও স্থান পান। ২০১৫ সালে তিনি ভারত সরকার কর্তৃক অর্জুন পুরস্কারে ভূষিত হন।
দীর্ঘ ২৮ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ২০১১ সালে ওয়ানডে বিশ্বকাপের শিরোপা জিতেছিল ভারত। টিম ইন্ডিয়ার সেই স্কোয়াডের ১৫ সদস্যের একজন ছিলেন অশ্বিন। সেবার দুটির বেশি ম্যাচ খেলতে না পারলেও ফাইনালে মূল একাদশে ছিলেন। এছাড়া ২০১০ সালে এশিয়া কাপ ও ২০১৩ সালে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয়ী দলেও সদস্যও ছিলেন।
অশ্বিন ঘরোয়া ক্রিকেটে তামিলনাড়ু রাজ্যের প্রতিনিধিত্ব করেন। ২০ বছর বয়সে ২০০৬ সালে হরিয়ানার বিপক্ষে রঞ্জি ট্রফি ম্যাচে তার প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয়। সেই খেলায় ৬ উইকেট নিয়েছিলেন।
২০০৭ সালে অন্ধ্রের বিপক্ষে লিস্ট এ ক্রিকেটে তার অভিষেক হয়েছিল। পরের মাসে আন্তঃরাজ্য টি-২০ টুর্নামেন্টে অন্ধ্রের বিপক্ষে তার স্বীকৃত কোনো টুর্নামেন্টে টি-২০ অভিষেক হয়েছিল। রঞ্জি ট্রফিতে একাধিক মৌসুমে দলের প্রতিনিধিত্ব করেন। ২০০৮-০৯ মৌসুমে বিজয় হাজারে ট্রফি জয়ী তামিলনাড়ু দলের অধিনায়ক ছিলেন। আইপিএল ক্যারিয়ারটা ছিল বেশ বর্ণিল। চেন্নাই সুপার কিংসের জার্সিতে চারবার জিতেছিলেন শিরোপা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছাড়লেও আইপিএলে খেলবেন অশ্বিন।
ব্রিসবেন টেস্ট ড্রয়ের পরই আকস্মিক অধিনায়ক রোহিত শর্মার সঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে চলে আসেন অশ্বিন। এরপরই নিজের অবসরের কথা জানিয়ে দেন। তিনি বলেন, ‘এটাই আমার ক্রিকেটার জীবনের শেষ দিন ছিল। আমি আর ক্রিকেটার হিসেবে কোনোদিন মাঠে নামব না। সব ধরণের ফরম্যাট থেকেই অবসর নিচ্ছি। দুর্দান্ত একটা সফর ছিল আমার কাছে। রোহিত-বিরাটদের পাশে পেয়েছি। ক্রিকেট আমাকে সবকিছু দিয়েছে। তাই ক্রিকেটার হিসেবে না হলেও ক্রিকেটের সঙ্গে জড়িয়ে থাকার চেষ্টা করবো।’
ইতিহাস বলছে মোট ৫৫টি টেস্টে বিরাট কোহলির নেতৃত্বে খেলেছিলেন অশ্বিন। ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই দুজনে একসঙ্গে জাতীয় দলে। বিদায়বেলায় কোহলিকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন টিম ইন্ডিয়ার সর্বকালের অন্যতম সেরা স্পিনার। ব্রিসবেন টেস্ট ড্র হওয়ার পর ম্যাচের ফলাফলের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে অশ্বিনের অবসর। প্রিয় সতীর্থকে তার বিদায়বেলায় আবেগঘন পোস্টে শুভেচ্ছা জানান বিরাট কোহলি।
ভারতের সাবেক অধিনায়ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে দু’জনের ছবির সঙ্গে লিখেছেন, ‘প্রায় ১৪ বছর আমি আর তুমি একসঙ্গে খেলেছি। যখন তুমি আমাকে আজ অবসরের কথা জানিয়েছিলে, তখন আমি কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে গিয়েছিলাম। চোখের সামনে ভেসে আসছিল একসঙ্গে খেলা নানা মুহূর্তের ছবি। তোমার সঙ্গে খেলা প্রতিটা মুহূর্ত আমি উপভোগ করেছি। তোমার স্কিল ও ম্যাচ উইনিং পারফরম্য়ান্সের সঙ্গে কোনো কিছুর তুলনা হবে না। ভারতীয় ক্রিকেট সবসময় তোমাকে কিংবদন্তি হিসেবেই মনে রাখবে। পরিবারের সঙ্গে এবার ভালো করে সময় কাটাও। আগামীর জন্য অনেক অনেক শুভেচ্ছা রইল অ্য়াশ।’