নারী নারীর শত্রু নয় - শত্রু হতে শেখানো হয়?
আমি একটা বই পড়েছিলাম bell hooks, এর বইটির নাম ছিল Feminist Theory। যে From Margin to Center, Chapter 4, “Sisterhood Political Solidarity Between Women” যদি বাংলায় লিখি তবে “আমাদের শেখানো হয় যে নারীরা নাকি স্বাভাবিকভাবেই একে অপরের শত্রু। আমরা সেই শিক্ষাটা খুব ভালোভাবেই শিখে এসেছি । এখন আমাদের সেই শেখানো ধারণাগুলো ভুলে নতুন করে শিখতে হবে ,কীভাবে একসঙ্গে বাঁচতে ও কাজ করতে হয়, কীভাবে সংহতি গড়ে তুলতে হয়, এবং বোনত্বের প্রকৃত অর্থ ও মূল্য কী।”
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যে hooks বলেছেন “Solidarity is not the same as support.অর্থাৎ “সংহতি আর সমর্থন এক জিনিস নয়।”তার ব্যাখ্যায়, সাময়িক সমর্থন প্রয়োজনে দেওয়া ও প্রত্যাহার করা গেলেও কিন্তু solidarity বা সংহতি হলো অভিন্ন স্বার্থ, বিশ্বাস ও লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে দীর্ঘস্থায়ীভাবে একসঙ্গে থাকার প্রতিশ্রুতি।
.png)
ভাবুন তো একবার ! যে নারী জানে নারীর কষ্ট, সেই নারীই কখনো কখনো নারীর সবচেয়ে নির্মম বিচারক হয়ে ওঠে কেন? সমস্যাটা কি সত্যিই নারীর মধ্যে, নাকি নারীর ভেতরে বহু প্রজন্ম ধরে এমন কিছু ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে, যার নাম আমরা খুব কমই উচ্চারণ করি?
একজন নারী আরেকজন নারীর সৌন্দর্য দেখে কেন অস্বস্তি বোধ করে? একজন নারী আরেকজন নারীর সাফল্য দেখে কেন ঈর্ষান্বিত হয়? একজন নারী অন্য আরেকজন নারীর সুন্দর স্বামী সংসার দেখে অসুস্থ বোধ করে। একজন নারী আরেকজন নারীর পোশাক দেখে কেন চরিত্রের বিচার শুরু করে? আর একজন নারী স্বাধীনভাবে বাঁচতে চাইলে আরেকজন নারী কেন তাকে থামাতে এগিয়ে আসে?
Sister Wound বোনত্বের ক্ষত। এটি কোনো স্বীকৃত একক রোগের নাম নয়, কিংবা সব নারীর অভিজ্ঞতার সার্বজনীন ব্যাখ্যাও নয়। বরং সমকালীন সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক আলোচনায় ব্যবহৃত একটি ধারণা যার মাধ্যমে নারীদের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে তুলনা, প্রতিযোগিতা, ঈর্ষা, প্রত্যাখ্যান, অবিশ্বাস এবং স্মৃতি কপচে আঘাতের অভিজ্ঞতাকে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়। মেয়েরা কেন একসময় পাশাপাশি চলতে চলতে একে অপরের শত্রু হয়ে যায়?
উন্নতি-অবনতির তুলনা, নিরাপত্তাহীনতা আর সামাজিক প্রতিযোগিতা কি ধীরে ধীরে বদলে দেয় আচরণ?
তাহলেই কি Sister Wound-এর ক্ষতটা আরও গভীরে ইনফেক্টেড হয়? এক নারী আরেক নারীর বন্ধু হয়েও কখনো তার প্রেমিক বা স্বামী কেড়ে নেয়, কখনো বিষমাখা ফিসফাসে একটি সংসারে প্রলয় নামায়। অন্যের সুখ টেনে নামিয়ে নিজের সুখ খোঁজা এ কি নারীর স্বভাব, নাকি সমাজের শেখানো এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা?
Sister Wound এর ক্ষত কি এখানেই জন্ম নেয়?
আমাদের ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয় মেয়েদের ভালো মেয়ে হতে হয়। ভদ্র হতে হয়। শান্ত হতে হয়। সুন্দর হতে হয়।
সংসার করতে হয়। স্বামীর মন রাখতে হয়। সন্তান ভালোভাবে মানুষ করতে হয়। কিন্তু খুব কমই শেখানো হয় আরেকজন নারীকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে কীভাবে তার পাশে দাঁড়াতে হয়।
তাই একজন নারী একটু বেশি সুন্দর হলে তুলনা। একজন নারী একটু বেশি সফল হলে ঈর্ষা। একজন নারী নিজের শরীর নিয়ে স্বচ্ছন্দ হলে চরিত্রের বিচার।একজন নারী নিজের পছন্দের পোশাক পরলে নৈতিকতার পাঠ।
একজন নারী নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিলে অহংকারের অভিযোগ। একজন নারী অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে বদমেজাজি নারীর তকমা। আর আশ্চর্যের বিষয় হলো এই আদালতের বিচারক অনেক সময় একজন নারীই। কিন্তু কেন বলতে পারেন ? সমাজ যখন একজন নারীর মূল্য নির্ধারণ করে তার সৌন্দর্য, বৈবাহিক সম্পর্ক, মাতৃত্ব, আকর্ষণীয়তা কিংবা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার ওপর, তখন নারীর সামনে অদৃশ্য একটি প্রতিযোগিতা তৈরি হয়।
- কে বেশি সুন্দর? কে বেশি কাঙ্ক্ষিত? কার স্বামী বেশি ভালো? কার সংসার বেশি সুখের? কার শরীর বেশি আকর্ষণীয়? কার সন্তান বেশি সফল? কে বেশি জনপ্রিয়? অর্থাৎ নারীকে নিজের সঙ্গে লড়তে শেখানোর বদলে অন্য নারীর সঙ্গে লড়তে শেখানো হয়।
এখানেই পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর একটি গভীর সামাজিক প্রভাব দেখা যায়। কারণ দুই নারী যদি একে অপরের বিরুদ্ধে ব্যস্ত থাকে, তাহলে তারা একসঙ্গে দাঁড়ানোর সুযোগ কম পায়। একজন আরেকজনকে বিচার করে একজন আরেকজনকে ছোট করে।
একজন আরেকজনের চরিত্র নিয়ে কথা বলে। একজন আরেকজনের শরীর নিয়ে মন্তব্য করে। একজন আরেকজনের স্বাধীনতাকে প্রশ্ন করে। আর যে কাঠামো তাদের এই প্রতিযোগিতার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে
সেটা অদৃশ্যই থেকে যায়। তবে এখানে একটা কথা খুব পরিষ্কার হওয়া দরকার। সব পুরুষ নারীকে দমন করেন না। সব নারীও নারীর শত্রু নন। পুরুষতন্ত কোনো নির্দিষ্ট পুরুষের ব্যক্তিগত চরিত্রের নাম নয়। এটি একটি দীর্ঘ সামাজিক কাঠামো, যেখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম কিছু নির্দিষ্ট ক্ষমতার সম্পর্ক, ভূমিকা ও মূল্যবোধ শেখানো হয়েছে।
ফলে নারীও কখনো সেই একই নিয়মের বাহক হয়ে উঠতে পারেন, যে নিয়ম একদিন তাকে নিজেকেই আঘাত করেছিল। তাই একজন নারী যখন আরেক নারীকে আঘাত করেন, শুধু তাকে খলনায়ক বানিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হয় না। বরং প্রশ্ন করতে হয় কে তাকে শিখিয়েছিল যে অন্য নারীর সৌন্দর্য তার নিজের সৌন্দর্যের হুমকি?
কে তাকে শিখিয়েছিল যে অন্য নারীর স্বাধীনতা তার নিজের মূল্য কমিয়ে দেয়? কে তাকে শিখিয়েছিল যে নারীর পৃথিবীতে জায়গা সীমিত? কে তাকে শিখিয়েছিল অন্য নারীকে নিচে নামাতে পারলেই তুমি ওপরে উঠবে? এখানেই আসে মাতৃতন্ত্রের স্মৃতি নিয়ে ভাবার একটি ভিন্ন দরজা।
প্রাচীন বহু আদিবাসী ও উপজাতীয় সমাজে নারীর জ্ঞান, প্রবীণ নারীর অভিজ্ঞতা, মাতৃরেখা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমষ্টিগত যত্নের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
অবশ্যই পৃথিবীর সব প্রাচীন সমাজ মাতৃতান্ত্রিক ছিল না। তবু ইতিহাস আমাদের এমন বহু সামাজিক বাস্তবতার কথা জানায়, যেখানে নারীর অভিজ্ঞতা ছিল জ্ঞান ও সামাজিক অস্তিত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই মাতৃতন্ত্রকে পুরুষতন্ত্রের উল্টো কোনো ক্ষমতার সিংহাসন হিসেবে ভাবার দরকার নেই।
- সুস্থ মাতৃতান্ত্রিক চেতনা মানে পুরুষকে সরিয়ে নারীকে ক্ষমতার কেন্দ্রে বসানো নয়। বরং এমন একটি সম্পর্কের সংস্কৃতি কল্পনা করা যেখানে শক্তি মানে আধিপত্য নয়, ধারণ করার ক্ষমতা।
জ্ঞান মানে অস্ত্র নয়, উত্তরাধিকার। প্রবীণ নারী মানে বোঝা নয়, অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার। আর বোন মানে প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বোন মানে আশ্রয়। আমাদের হয়তো আবার শিখতে হবে, একজন নারী সুন্দর হলে আমার সৌন্দর্য কমে যায় না। একজন নারী সফল হলে আমার ব্যর্থতা প্রমাণ হয় না একজন নারী স্বাধীন হলে আমার স্বাধীনতা ছোট হয় না।
একজন নারী নিজের শরীরকে ভালোবাসলে ,তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন করার অধিকার আমার নেই। একজন নারী নিজের জীবন নিজের মতো করে বাঁচলে তাকে আমার মাপকাঠিতে মাপার দরকার নেই। আর একজন নারী যখন পড়ে যায় তার ওপর দিয়ে উঠে দাঁড়ানোর বদলে হাত বাড়িয়ে তাকে তোলা যায়।
হয়তো নারীমুক্তির সবচেয়ে কঠিন লড়াই শুধু পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে নয়। নিজের ভেতরে ঢুকে পড়া সেই পুরোনো শিক্ষার বিরুদ্ধেও যে শিক্ষা বলে,অন্য নারী তোমার প্রতিদ্বন্দ্বী। অন্য নারী তোমার হুমকি।
অন্য নারীর আলো মানেই তোমার অন্ধকার। না। অন্য নারীর আলো তোমার আলো নিভিয়ে দেয় না। বরং কখনো কখনো একজন নারীর জ্বলে ওঠা আরেকজন নারীর জন্য পথ দেখায়। কারণ যে নারী নিজের ক্ষত চিনতে শেখে, সে আর অন্য নারীর ক্ষতকে অস্ত্র বানায় না।
আর যেদিন একজন নারী আরেকজন নারীকে নিচে নামানোর বদলে হাত ধরে ওপরে তুলবে সেদিন হয়তো নারীমুক্তি শুধু একটি রাজনৈতিক বা সামাজিক দাবি থাকবে না। তা হয়ে উঠবে একটি সম্পর্কের সংস্কৃতি। একটি নতুন বোনত্ব।
একটি নতুন উত্তরাধিকার। একটি নতুন পৃথিবী যেখানে নারীকে বড় হতে হলে আরেক নারীকে ছোট হতে হবে না। কারণ নারী নারীর শত্রু নয়। নারীকে নারীর শত্রু বানানোর যে দীর্ঘ ইতিহাস সেই ইতিহাসটাই আমাদের প্রশ্ন করতে হবে।