বুড়িগঙ্গার বুকে দীর্ঘ বছর ধরে জমে থাকা বেদনা আমাদের যেন প্রতিনিয়ত ধিক্কার দিয়ে যায়। দখল-দূষণে বিধ্বস্ত বুড়িগঙ্গার নীরব কান্না অনেক ক্ষেতে আমাদের কানে পৌঁছে না।
সরেজমিন দেখা যায়, রাজধানীর শ্যামবাজারে পাইকারি কাঁচামালের আড়তের বিপরীতে বুড়িগঙ্গাপাড়ে নিয়মিতই ফেলা হয় ময়লা-আবর্জনা। আশপাশের হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে নদীতে ফেলা হয় উচ্ছিষ্ট।
.png)
একটি শিশুকে বুড়িগঙ্গা পাড়ে ময়লা ফেলতে দেখা যায়। কথা প্রসঙ্গে শিশুটি জানায়, এভাবে প্রতিদিনই হোটেলের উচ্ছিষ্ট তাকে দিয়ে নদীতে ফেলতে দেয় হোটেল মালিক।
প্রতি বছর বর্ষা আসে। বর্ষার শুরুতে বুড়িগঙ্গা কিছুটা প্রাণ ফিরে পায়। পরে বর্ষা-বৃষ্টি কমার সঙ্গে সঙ্গে বুড়িগঙ্গাও সেই রূপ হারিয়ে ফেলে। প্রতিদিন ফেলা বর্জে্য বুড়িগঙ্গার পানি দূষণের পাশাপাশি তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ায়। দুর্গন্ধে টিকতে পারেন না সেখানে বাজার করতে বা হাঁটতে আসা মানুষ। শ্যামবাজারের আড়তদারদের দাবি, লঞ্চের বর্জ্যেই বাড়ছে নদীর দূষণ।
সম্প্রতি শ্যামবাজার, ফরাশগঞ্জ এবং বাদামতলী এলাকা ঘুরে চোখে পড়ে সারি সারি ফল ও সবজির আড়ত। এসব আড়তে জমা হওয়া বর্জ্যের দেখা মেলে নদীর পাড়েই। নদীর পানিতে দেখা যায়, পচা টমেটো, পেঁয়াজ-রসুনের খোসা, মৃত প্রাণীর দেহ, কলাপাতা ও পচা শাকসবজি ইত্যাদি ভাসছে।
সূত্রাপুর থেকে বাজার করতে আসা সাকিব হাসান বলেন, এখানে দাম একটু কম এবং টাটকা জিনিস পাওয়া যায়। কিন্তু ময়লার দুর্গন্ধে দাঁড়ানোই যায় না। নদীর পাশ থেকে ময়লা-আবর্জনার পচা গন্ধ বাজারে ঢুকছে। সংশ্লিষ্টদের এ বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত।
নদীর পাড়ে ঘুরতে আসা তরুণ আবু সিনা বলেন, ছুটির দিন হওয়ায় ঘুরতে এসেছিলাম। বর্ষার শুরুতে নদীর পানি পরিষ্কার হওয়ার কথা। কিন্তু ময়লার দুর্গন্ধে দাঁড়াতে পারছি না। মূলত নদীপাড়ের ময়লা আবর্জনা নদীতে মিশে এখানকার বাতাসে দুর্গন্ধ সৃষ্টি করেছে।
সদরঘাটের ব্যবসায়ী আফজাল বলেন, আড়তের ময়লা যাদের ফেলার দায়িত্ব থাকে, তারা কষ্ট করতে চায় না। দূরে ময়লা ফেলতে যেতে চায় না। সহজেই নদীর পাড়ে ফেলে চলে যায়। তাছাড়া আশপাশের হোটেল ও বাসাবাড়ির অনেকেই এখানে ময়লা ফেলে। মাঝে মাঝে ময়লা পরিষ্কার করা হয়। কিন্তু পুরোটা পরিষ্কার হয় না।
এ বিষয়ে আড়ত মালিকদের কাছে জানতে চাওয়া হলে তারা দাবি করেন, তাদের কেউ নদীতে ময়লা ফেলেন না। শ্যামবাজার আড়ত মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সেলিম বলেন, আড়তের নয়, লঞ্চের বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে বুড়িগঙ্গা। আমাদের আড়তের ময়লা আমরা ঘরে জমা করি। সিটি কর্পোরেশনের লোক এসে ময়লা নিয়ে যায়। এখানে প্রতিটি দোকানই নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বর্জ্য রাখবে এবং সঠিক স্থানে বর্জ্য ফেলবে এমন নির্দেশনা দেওয়া আছে।
স্থানীয় এক আড়ত মালিক বলেন, আমরা নদীতে ময়লা ফেলি না। রাস্তার পাশে যেসব ভাসমান দোকানি কাঁচামালের ব্যবসা করে, তারা হয়তো আবর্জনা নদীতে ফেলে থাকতে পারে।
এ বিষয়ে ঢাকা জেলা প্রশাসক মো. মমিনুর রহমান ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, বুড়িগঙ্গা পাড়ে একটি অবৈধ স্থাপনাও থাকবে না। বুড়িগঙ্গা পাড়ে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণকারীদের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেন, পর্যায়ক্রমে বুড়িগঙ্গা পাড়ের সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে। একটি অবৈধ স্থাপনাও থাকবে না। এখনো যারা এসব অবৈধ স্থাপনা তৈরি করছেন, তারা ভুল করছেন।
তিনি আরো বলেন, ২০২৫-২৬ সালের মধ্যেই আপনারা বুড়িগঙ্গা পাড় মুক্ত দেখতে পাবেন। এতে বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেলের প্রবাহ নির্বিঘ্ন হবে। বুড়িগঙ্গা পাড়ের অবৈধ স্থাপনা যত বড় বা বহুতলই হোক না কেন আমরা তা উচ্ছেদ করব।