ঢাকা,  বুধবার   ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ পেশা ও জীবন ]
প্রেরণার গল্প-৫

মানব কল্যাণে নিবেদিত ‘আসলাম স্মৃতি ফাউন্ডেশন’

এস এম মুকুল এস এম মুকুল
প্রকাশিত: ১১:৩৫, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মানব কল্যাণে নিবেদিত ‘আসলাম স্মৃতি ফাউন্ডেশন’
ডা. হাসানের নেতৃত্বে তার এলাকায় মাঝে মধ্যে বসানো হয় মেডিকাল ক্যাম্প। এছাড়াও বছরে আসলাম ফাউন্ডেশন থেকে বছরে দেয়া হয় মশারি এবং আরো দেয়া হয় শীতবস্ত্র। এভাবেই স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, সুদমুক্ত ক্ষুদ্রঋণ এবং আর্তকে সাহায্যের মাধ্যমে দিন দিন বিস্তৃত হচ্ছে আস

শোক কীভাবে শক্তিতে পরিণত হয় এই গল্পটি তারই প্রমাণ দেবে। ১৯৯৫ সাল, ১৭ জুন একটি দুর্ঘটনার শোক অবশেষে মানব কল্যানের শক্তিতে রূপান্তরিত হলো। সেদিনের এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার নোয়াপাড়া গ্রামের সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্য মুহম্মদ আসলাম মৃত্যুবরণ করেন।

আসলামকে হারিয়ে পরিবারের সদস্যরা শোকে কাতর হয়েও ইতিবাচক ও মানব কল্যাণমূলক কিছু করে তার স্মৃতিকে ধরে রাখার উদ্যোগ নেয়। পারিবারিকভাবে আসলামের পরিবার সিদ্ধান্ত নেয় তাঁর নামে একটি ফাউন্ডেশন গড়ে তোলা হবে।

No photo description available.

Advertisement

আসলাম বেঁচে থাকলে সে পৈত্রিক সম্পত্তির ভাগ পেত, সুতরাং তার প্রাপ্য অংশীদারিত্বের অর্থ দিয়ে চালু হবে এই মানব কল্যাণমুখী ফাউন্ডেশনটি। সেসাথে যুক্ত হয় পারিবারিক যাকাত তহবিলের যাত্রাও। সৃজনশীল কল্যাণধর্মী চেতনা থেকে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘আসলাম স্মৃতি ফাউন্ডেশন’। এই ফাউন্ডেশনের নেপথ্য নায়ক আসলামের বড় ভাই ডা. এস এম এম হাসান।

ভাইয়ের স্মৃতি রক্ষায় পরিবারেরর সকল সদস্যকে নিয়ে মানবকল্যাণের নজিবিহীন অনন্য দৃষ্টান্ত দাঁড় করালেন তিনি। এখন এই ফাউন্ডেশনের বিশাল কর্মযজ্ঞে মানবসেবার অনন্য প্রতিষ্ঠান ‘আসলাম স্মৃতি ফাউন্ডেশন’। এই ফাউন্ডেশন ৮-৯ বছরের ৩০ জন শিশুকে বিনামূল্যে থাকা-খাওয়া, চিকিৎসা ও শিক্ষার দায়িত্ব নিয়ে শুরু হয় তাদের মানব কল্যাণের জয়যাত্রা। 

এই শিশুদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ, ছাত্রাবাস, পুষ্টিসম্মত পচ্ছিন্ন খাবার এবং আবাসিক শিক্ষকের সার্বক্ষণিক তত্ত¡াবধানে রাখা হয়েছে। আছে কম্পিউটার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও। এলাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিবছর যষ্ঠ শ্রেণী থেকে নবম শ্রেণী পর্যন্ত অধ্যয়নরত ১৫০ শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে বই বিতরণ করে এই ফাউন্ডেশনটি। 

এছাড়াও এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৪ শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে মেধা মূল্যায়নের ভিত্তিতে ৩৫ জনকে দেয়া হয় শিক্ষা বৃত্তি। আসলাম ফাউন্ডেশন যেহেতু মানবকল্যাণে নিয়োজিত তাই তাদের ভাবনায় আসে হতদরিদ্র শিশুদের পাশাপাশি তাদের পারিবারিক দারিদ্র্যদূরীকরণে বেশি গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। সে লক্ষ্য বাস্তবায়নে ২০০২ সাল থেকে সুদমুক্ত ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচিও হাতে নেয়া হয়। এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৪০০ জন দারিদ্র্যপীড়িত মানুষ সুদমুক্ত ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে ভাগ্য বদলের সংগ্রামে নেমেছেন। 

No photo description available.

এই ঋণ নিয়ে গরিব মানুষেরা হাস-মুরগি, পশু পালন, গরু মোটাতাজা করণ এবং সেলাই কাজের মাধ্যমে স্বচ্ছলতার মুখ দেখেছেন। আর্থিক অনটন কাটিয়ে ওঠার সুবাধে তারা সহজেই সন্তানদের পড়াশোনা করাতে পারছেন। আসলাম ফাউন্ডেশন এখন সমবায়ী ধারায় সদস্যদের সঞ্চয়মুখী করে গরিব মানুষদের কাছ থেকে সঞ্চয় সংগ্রহ করছে। 

এই সঞ্চয়ের অর্থ থেকে অর্ধেক আর বাকি অর্ধেক ফাউন্ডেশনের সহায়তায় সদস্যদের কিনে দেয়া হচ্ছে গাভী, রিকশা ও ভ্যানগাড়ি। এছাড়াও এলাকার বিদেশ গমনে ইচ্ছুক প্রার্থীদের দেয়া হচ্ছে সুদমুক্ত ঋণ সুবিধা। এই প্রকল্পের আওতায় ৪০ জন বিদেশগামীকে দেয়া হয়েছে বিমান টিকিটের টাকা। প্রার্থীরা বিদেশ থেকে টাকা উপার্জন করে আয় থেকে দায় শোধ করবেন। এভাবেই দারিদ্র্যবিমোচনে আসলাম ফাউন্ডেশন গরিব মানুষদের কাছে পরম নির্ভরতার অভয়াশ্রমে পরিণত হয়েছে।  

No photo description available.

আসলাম ফাউন্ডেশন স্বাস্থ্যসেবাতেও রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। আসলামের বড় ভাই ডা. এস এম এম হাসান চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের চর্ম ও যৌনরোগ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। গ্রামের দরিদ্র ও সামর্থ্যহীন মানুষের চিকিৎসার্থে নিজেই চিকিৎসাসেবা দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন।

গরীব অসহায়দের তিনি বিনামূল্যে ওষুধপত্রও দিয়ে যাচ্ছেন। বছরে অন্তত ২৫ জনের চোখের অস্ত্রোপাচারের ব্যবস্থাও করেন তিনি। রক্তদান, রক্তের গ্র“প নির্ণয়, প্রতিবছর গ্রামের শতাধিক ছেলের খতনা ও মেয়েদের কান ফোঁড়ানোর ব্যবস্থা করে যাচ্ছেন। 

ডা. হাসানের নেতৃত্বে তার এলাকায় মাঝে মধ্যে বসানো হয় মেডিকাল ক্যাম্প। এছাড়াও বছরে আসলাম ফাউন্ডেশন থেকে বছরে দেয়া হয় মশারি এবং আরো দেয়া হয় শীতবস্ত্র। এভাবেই স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, সুদমুক্ত ক্ষুদ্রঋণ এবং আর্তকে সাহায্যের মাধ্যমে দিন দিন বিস্তৃত হচ্ছে আসলাম ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম। ভাইয়ের স্মৃতি রক্ষায় মানবকল্যাণের এই অনন্য উদ্যোগ মানবিক মূল্যবোধের অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকুক।

সূত্র : এস এম মুকুল-এর আত্মোন্নয়ন সিরিজ : কর্মক্ষেত্রে সাফল্যের সোপান গ্রন্থ থেকে

ডেইলি-বাংলাদেশ/DB-F-01
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!