বইয়ের পাতায় ভবিষ্যতের স্বপ্ন, আর কৃষিজমিতে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের চেষ্টা। পড়াশোনার পাশাপাশি কৃষিকে কাজে লাগিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পথ খুঁজে নিয়েছেন দিনাজপুরের বোচাগঞ্জের তরুণ মিনহাজ উদ্দিন। মাদ্রাসায় ফাজিল (অনার্স) পড়ার পাশাপাশি ৫০ শতক জমিতে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ করছেন হলুদ ও কালো রঙের তরমুজ। দুই প্যাকেট বীজ দিয়ে শুরু করা সেই শখ এখন তাকে এগিয়ে নিচ্ছে সফল কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার পথে।
মিনহাজ উদ্দিন বোচাগঞ্জ উপজেলার ৬ নম্বর রণগাঁও ইউনিয়নের চন্ডিপুর গ্রামের গোলাম মোস্তফার ছোট ছেলে। ২০২৩ সালে চন্ডিপুর দাখিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল এবং ২০২৫ সালে ঢাকার তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা থেকে আলিম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। বর্তমানে ঢাকার তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসায় ফাজিল (অনার্স) অধ্যয়নরত।
.png)
আলিম পরীক্ষা শেষ করার পর শখের বসে দুই প্যাকেট তরমুজের বীজ সংগ্রহ করেন মিনহাজ। বাড়ির পাশে নিজের জমিতে শুরু করেন তরমুজ চাষ। প্রথমবার ভালো ফলন পাওয়ার পর কৃষির প্রতি তার আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। তখনই পড়াশোনার পাশাপাশি কৃষিকে বাণিজ্যিকভাবে করার চিন্তা শুরু করেন তিনি।
পরে উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করলে কৃষি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে আধুনিক পদ্ধতিতে তরমুজ চাষের বিষয়ে পরামর্শ পান মিনহাজ। সেই পরামর্শ কাজে লাগিয়ে এবার বড় পরিসরে রঙিন তরমুজ চাষের উদ্যোগ নেন তিনি।
নিজের অর্থায়নে মালচিং পদ্ধতিতে মাচা তৈরি করে দুই জাতের তরমুজ চাষ করছেন মিনহাজ। এর মধ্যে ‘সূর্য ডিম’ জাতের হলুদ রঙের তরমুজের বীজ বাইরে থেকে সংগ্রহ করে নিজ উদ্যোগে চাষ করেছেন তিনি। অন্যদিকে ‘মার্সেলো’ জাতের কালো তরমুজটি উপজেলা কৃষি অফিসের সরকারি একক ফল বাগান প্রদর্শনীর আওতায় চাষ করা হয়েছে।
৫০ শতক জমি লিজ নেওয়াসহ তরমুজ চাষে মিনহাজের মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৮০ হাজার টাকা। ইতোমধ্যে তরমুজ বিক্রি শুরু করেছেন তিনি। বর্তমানে প্রতি কেজি তরমুজ ৭০ থেকে ৮০ টাকা দরে বিক্রি করছেন।
৭০ থেকে ৮০ দিনের মধ্যে হারভেস্ট শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এরই মধ্যে তরমুজ সংগ্রহ প্রায় শেষ পর্যায়ে। ইতোমধ্যে প্রায় ১ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করেছেন মিনহাজ। বাজারদর অনুকূলে থাকলে পুরো মৌসুমে ২ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি হবে বলে আশা করছেন তিনি।
তরুন উদ্যোক্তা মিনহাজ উদ্দিন বলেন, আমি শখের বসে বাড়ীর পাশে নিজের অল্প জমিতে দুই প্যাকেট বীজ দিয়ে তরমুজ চাষ শুরু করেছিলাম।প্রথমবার ভালো ফলন পাওয়ার পর মনে হয়েছে পড়াশোনার পাশাপাশি এটিকে বাণিজ্যিকভাবে করা সম্ভব।আমার ৫০ শতক জমি লিজসহ মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৮০ হাজার টাকা। এর মধ্যে ১লাখ টাকার তরমুজ বিক্রয় করেছি। বাজারদর অনুকূলে থাকলে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রয় হবে বলে আশা করছি।
তিনি আরও বলেন, আমি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছি।লেখাপড়ার পাশাপাশি কৃষিকাজ করছি।যারা লেখাপড়া করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।তারা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করে আমার মতো উদ্যোক্তা হতে পারেন। কৃষিকে কাজে লাগিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
বোচাগঞ্জ উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দিনাজপুর অঞ্চলে টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ‘রণগাঁও টেকসই কৃষি উন্নয়ন কৃষক গ্রুপ’-এর মাধ্যমে সরকারি একক ফল বাগান প্রদর্শনী বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর আওতায় ‘মার্সেলো’ জাতের কালো তরমুজ চাষ করা হয়েছে।
বোচাগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নয়ন কুমার সাহা বলেন, ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরে দিনাজপুর অঞ্চলে টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় মিনহাজ উদ্দিনকে একক ফল বাগান প্রদর্শনীর মাচায় তরমুজ চাষ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বীজ, সারসহ অন্যান্য কৃষি উপকরণ উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে সরবরাহ করা হয়েছে। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মাহবুব আলম নিয়মিত মাচায় তরমুজ চাষে তাকে কারিগরি পরামর্শ দিয়েছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘মিনহাজ উদ্দিনের উদ্যোগটি সত্যিই প্রশংসনীয়। সে একজন মাদ্রাসার শিক্ষার্থী হয়েও পড়াশোনার পাশাপাশি আধুনিক পদ্ধতিতে তরমুজ চাষে যুক্ত হয়েছে। বিশেষ করে নিজের উদ্যোগে নতুন জাতের তরমুজ চাষের পাশাপাশি কৃষি অফিসের পরামর্শ ও প্রদর্শনীর আওতায় আরেকটি জাতের তরমুজ চাষ করছে।’
বোচাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মারুফ হাসান বলেন, ‘পড়াশোনার পাশাপাশি মিনহাজ উদ্দিনের কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার উদ্যোগটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। আধুনিক পদ্ধতিতে তরমুজ চাষের মাধ্যমে সে যেমন নিজের কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করছে, তেমনি অন্য তরুণদেরও কৃষিতে সম্পৃক্ত হওয়ার অনুপ্রেরণা দিচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তরুণরা চাকরির অপেক্ষায় না থেকে কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও আধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে কৃষিকে উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্র হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। মিনহাজের মতো শিক্ষিত তরুণদের এমন উদ্যোগ স্থানীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে।’