ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ সাতরং ]

তেল আবিব: বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহর

সাত রঙ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৪:৫৪, ২৯ ডিসেম্বর ২০২১
তেল আবিব: বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহর
ইসরায়েলের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর তেল আবিব। ছবি সংগৃহীত

ইসরায়েলের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর তেল আবিব। ভূমধ্যসাগরের তটরেখায় তেল আবিব শহরটি গড়ে উঠেছে। ইসরায়েলের তেল আবিব বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহর। নৈশক্লাব, বারসহ সারারাত পার্টি করার মতো অনকে ব্যবস্থা আছে তেল আবিবে। সেই কারণে তেল আবিব ইসরায়েলের পাপের শহর হিসেবেও পরিচিত। 

প্রযুক্তি বিশ্বে আমেরিকার সিলিকন ভ্যালির পরেই তেল আবিবের অবস্থান। হাজারেরও বেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে এই শহরে। আধুনিক আবাসন ব্যবস্থা, রাস্তা, পার্ক, বাগান, কৃত্রিম বনসহ উন্নত নাগরিক জীবনের সকল সুযোগ সুবিধাই রয়েছে এখানে। আধুনিক পর্যটন ব্যবস্থা এবং ভরপুর বিনোদনের কারণে তেল আবিব শহরটি পর্যটকদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়। সেই কারণে সাগর তীরবর্তী এই শহরে প্রতিবছর ৩০ লাখেরও বেশি পর্যটক ঘুরতে আসে।

তেল আবিব শহরটি পর্যটকদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তেল আবিব শহর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯০৯ সালে। তখন এই অঞ্চল অটোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রথমদিকে তেল আবিব শহরকে 'আহুজাত বাইত' নামে ডাকা হতো। যার অর্থ হলো বসতবাড়ি বা ভিটেমাটি। পরবর্তীতে বাইবেল থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে শহরের নাম রাখা হয় তেল আবিব। বাংলা করলে যার অর্থ দাঁড়ায় বসন্তের বিলাপ। 

Advertisement

ইহুদি অধিবাসীরা আধুনিক আবাসন প্রকল্পের মতো করে এই শহরের গোড়াপত্তন করে। তবে তখন শহরটি গড়ে উঠেছিল ভূমধ্য সাগরের প্রাচীন বন্দর নগরী জাফাকে কেন্দ্র করে। এখনো পর্যন্ত জাফা এলাকাটি তেল আবিব শহরের সবচেয়ে পুরনো অংশ। তেল আবিব একটি জনপদ হিসেবে প্রথম স্বীকৃতি পায় ১৯২১ সালে। তখনও এটি জাফা পৌরশহরের অধীনে ছিল। পরবর্তীতে ১৯৩৪ সালে এটি একটি আলাদা শহরে পরিণত হয়। 

১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৪৯ সালের ফিলিস্তিন যুদ্ধের তেল আবিব শহরের মধ্যে বহু এলাকার নতুন করে অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৫০ সালের জাফা শহরকেও তেল আবিবের ভেতরে অন্তর্ভুক্ত করে এই শহরের নাম রাখা হয় 'তেল আবিব-ইয়াফো'। বর্তমানে এই শহরের আয়তন ৫২ বর্গ কিলোমিটার। ২০২১ সালের হিসেব অনুযায়ী, প্রায় চার লাখ ৬০ হাজার মানুষ শহরে বাস করে। বর্তমানে এটি ইসরায়েলের সবচেয়ে জনবহুল শহর। 

তেল আবিবের বড় বড় বিল্ডিং১৯৪৮ সালে এই শহর থেকেই ডেভিড বেন গুরিয়ন ইসরায়েলের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল। তারা পবিত্র শহর জেরুজালেমকে তাদের রাজধানী ঘোষণা করলেও তৎকালীন সময়ে জেরুজালেম শহর জর্ডানের নিয়ন্ত্রণে ছিল। সেই কারণে ইহুদিরা তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য তেল আবিব শহরকে বেছে নেয়। ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত তেল আবিব ইসরায়েলের রাজনৈতিক রাজধানী ছিল।

বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহর ইসরায়েলের তেল আবিব। ২০২১ সালেই প্রথমবারের মতো ১৭৩টি শহরের মধ্যে তেল আবিব ব্যয়বহুল শহরের তালিকায় শীর্ষে উঠে আসে। শহরগুলোর বিভিন্ন পণ্য ও সেবার মূল্যমান বিবেচনা করে এই তালিকা তৈরি করা হয়। ডলারের বিপরীতে ইসরায়েলি মুদ্রার সেকালের মূল্য কমে যাওয়ার কারণে তেল আবিবের জীবনযাপনের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। বিশেষ করে, শহরের পরিবহন খরচ এবং মুদি দোকানের পণ্যের দামে ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে।

                                                           আরো পড়ুন: পোভেগ্লিয়া আইল্যান্ড : অপরূপ একটি মৃত্যুপুরী 

তেল আবিবকে বলা হয় মধ্যপ্রাচ্যের মিয়ামি। এখানকার সমুদ্রসৈকতে ঘুরতে গেলে পার্থক্য করা মুশকিল। এটি আসলেও তেল আবিব নাকি মিয়ামি। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পার্টি করা শহরগুলোর মধ্যে তেল আবিব প্রথম দিকেই থাকবে। শুরুর দিকে ধর্মের উপর ভিত্তি করে এই শহর তথা সমগ্র দেশটি প্রতিষ্ঠিত হলেও তেল আবিবের জনগণ ধর্মচর্চার প্রতি খুব বেশি আগ্রহী নয়। বরং বেশিরভাগ মানুষই ধর্মনিরপেক্ষ। 

তেল আবিবের ইতালিয়ান রেস্টুরেন্ট২০১৩ সালে তেল আবিবের মেয়র সমকামী পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে ৮৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল। এই শহরের মানুষ আনন্দ ফুর্তিতে এমনভাবে মেতে থাকে যে তারা যেন এই অঞ্চলের রাজনৈতিক বাস্তবতা ভুলে গেছে। সন্ধ্যা থেকে তেল আবিবের নৈশক্লাব এবং বারগুলোতে বিরামহীন পার্টি চলতেই থাকে। সেই কারণে অনেকেই তেল আবিবকে বলে 'দ্য সিটি দ্যাট নেভার স্লিপ', যার অর্থ 'যে শহর কখনো ঘুমায় না'। রাতের এই উন্মাদ জীবনযাপনের কারণেই তেল আবিবকে ইসরায়েলের পাপের শহর বলা হয়।

বর্তমানে তেল আবিব ইসরায়েলের প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র। তেল আবিব ইসরায়েলের ব্যবসা এবং প্রযুক্তির রাজধানী হিসেবেও পরিচিত। এই শহরটি ইসরায়েলের প্রযুক্তি বিপ্লবেরও সূতিকাগার। তেল আবিব বিশ্বের সবচেয়ে উদ্ভাবনী শহরগুলোর মধ্যেও শীর্ষে রয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার সিলিকন ভ্যালির পরেই সবচেয়ে বেশি স্টার্টআপ কোম্পানি রয়েছে তেল আবিবে। সিলিকন ভ্যালির আদলে 'সিলিকন ওয়াদি' নামে এখানেও এক প্রযুক্তি শহর গড়ে উঠেছে। 

                                                          আরো পড়ুন: মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর : আজও জীবন্ত রেখেছে ৭১-এর ইতিহাস

তেল আবিব শহরে প্রায় ১৫০০ টিরও বেশি কোম্পানি রয়েছে। এসব কোম্পানির বেশিরভাগই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। আন্তর্জাতিক বহু প্রযুক্তি কোম্পানি তেল আবিবে গবেষণা ও উন্নয়ন অফিস স্থাপন করেছে। মাইক্রোসফট গুগল, অ্যাপল, ফেসবুক, অ্যামাজন, আলিবাবা, ইবে, ফিলিপস, সিমেন্স, অ্যালকাটেল, এইচপি, কোয়ালকম, ইন্টেল, মটোরোলা, আইবিএম এর মতো অসংখ্য আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান তেল আবিবে অফিস খুলেছে।

তেল আবিবের নৈশক্লাবএসব প্রযুক্তি কোম্পানিতে তেল আবিবের ৪৩ হাজার মানুষ কাজ করে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের স্টার্টআপ তেল আবিবে অফিস খোলার জন্য বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হয়। সম্ভাবনাময় উঠতি কোম্পানির উদ্যোক্তাদেরকে অস্থায়ী বাসস্থান এবং অফিস দেওয়া হয়। নতুন কোম্পানি গঠনের জন্য বিশেষ আইনি পরামর্শ এবং সহায়তাও প্রদান করা হয়। 

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ তেল আবিবে এসে নতুন কোম্পানি গড়ে তোলার কারণে শহরের জায়গা জমির দাম ৮৪ শতাংশ বেড়ে গেছে। এই শহরের লোকজন যেমন আমোদপ্রিয়, তারা তেমনি অধিক কাজ করতেও ভালোবাসে। তেল আবিবের শিক্ষা ব্যবস্থাও বেশ উন্নত। তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয় পৃথিবীর শীর্ষ ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অন্যতম। সম্প্রতি ব্লাড ক্যান্সার নিরাময়ের একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করা হয়েছে তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ে।

তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়একবিংশ শতাব্দীতে তেল আবিব গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। তেল আবিবের হোয়াইট সিটি ২০০৩ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এই হোয়াইট সিটি এলাকার ভেতরে প্রায় চার হাজার বিল্ডিং আছে। ১৯৩০ সালের পর থেকে ইহুদি স্থপতিরা এসব অনুপম ভবনের নকশা করেছিল। 

তেল আবিব আর্ট মিউজিয়ামে বহু মূল্যবান শিল্পকর্ম সংরক্ষিত আছে। আধুনিক আর্টের বহু শাখা যেমন জার্মান এক্সপ্রেশনিজম, কিউবিজম, ফিউচারিজম, রাশিয়ান কন্সট্রাকটিভিজম এবং সুরিয়ালিজমের মতো বহু  ঘরানার শিল্পকর্ম এখানে দেখতে পাওয়া যায়। সেই কারণে তেল আবিব শহর সাংস্কৃতিক দিক থেকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। 

তেল আবিব আর্ট মিউজিয়ামতেল আবিব শহরে ১৩টি প্রধান সমুদ্রসৈকত রয়েছে। প্রতিবছর প্রায় ৮৫ লাখ মানুষ এসব সৈকতে গোসল করে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক তেল আবিবকে বিশ্বের নবম সেরা বিচ সিটি বা সৈকতের শহর হিসেবে ঘোষণা করেছে। 

তেল আবিবের রেষ্টুরেন্টগুলো সুস্বাদু খাবারের জন্য খুবই বিখ্যাত। এই শহরে জাপানি খাবার সুশি বেশ জনপ্রিয়। তেল আবিবে ১০০টিরও বেশি সুশি রেস্তোরাঁ আছে এবং জাপানের পরে এখানেই সবচেয়ে বেশি সুশি রেস্তোরাঁ রয়েছে। তেল আবিবের খাবারের সুখ্যাতি এখানেই শেষ নয়। ইতালি সরকার তেল আবিবের প্রন্ট নামের একটি রেস্টুরেন্টকে ইতালির বাইরে সবচেয়ে সেরা ইতালিয়ান রেষ্টুরেন্ট হিসেবে পুরস্কার দিয়েছে। এছাড়া এই শহরের অলিতে গলিতে প্রচুর জুসের দোকান রয়েছে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!