ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ সাতরং ]

প্রথম আকাশে উড়েছিলেন এই মুসলিম বিজ্ঞানী

সাতরঙ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:৩৪, ২৮ জুলাই ২০২২
প্রথম আকাশে উড়েছিলেন এই মুসলিম বিজ্ঞানী
ফাইল ছবি

মানুষ যখন হাঁটতে শেখে তখন থেকেই তারা উড়ার স্বপ্ন দেখে। গ্রীক পুরাণের দেবতা ইকারুস সূর্যের দিকে উড়ে যাচ্ছিলেন কিন্তু তার পালক সূর্যের প্রখর তাপে পুড়ে গিয়েছিল। ইকারুস সমুদ্রে পড়ে ডুবে গিয়েছিলেন।

সর্বপ্রথম আকাশে কোনো বস্তু ওড়ানোর পদক্ষেপ নিয়েছিলেন দুই চীনা দার্শনিক মোজি ও লু বান। ঘুড়ি আবিষ্কারের নেপথ্যেও তারা দু’জন। আর বাতাসের চেয়ে ভারী কোনো যন্ত্র নিয়ে আকাশে ওড়া প্রথম মানুষ ইবনে ফিরনাস। তিনিই মানুষের আকাশে ওড়ার পথপ্রদর্শক।

ইবনে ফিরনাস মুসলিম শাসনাধীন স্পেনে জন্মগ্রহণ করেন

Advertisement

ইবনে ফিরনাস মুসলিম শাসনাধীন স্পেনে জন্মগ্রহণ করেন। পুরো নাম আব্বাস আবু আলকাসিম ইবনে ফিরনাস ইবনে ইরদাস আল তাকুরিনি (জন্ম ৮১০, মৃত্যু ৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দ)। ইবনে ফিরনাসের জন্মস্থান ছিল স্পেনের রোনদায়। রোনদা এখন স্পেনের একটি পর্যটন শহর। উল্লেখ্য যে, উমাইয়্যা খিলাফতের সময় স্পেন ইসলামী শাসনের অধীনে আসে এবং খৃষ্টানদের হাতে পতনের পূর্ব পর্যন্ত স্পেনই ছিল সমগ্র পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত দেশ, স্পেন হচ্ছে পৃথিবীর প্রথম দেশ, যার রাস্তায় স্ট্রীট ল্যাম্প জ্বলেছিল যখন সারা পৃথিবী ছিল অন্ধকারে এবং তা হয়েছিল ইসলামী খিলাফতের সুশীতল শাসনামলে ছায়াতলে। তাকে বলা হয় ফাদার অফ অ্যাভিয়েশন।

আব্বাস ইবনে ফিরনাস যদিও রোনদায় জন্মগ্রহণ করেন; কিন্তু জ্ঞানের প্রতি তার আসক্তি থেকে কর্ডোবায় চলে গিয়েছিলেন। তবে তার আগে তিনি কিছু সময় ইরাকে ছিলেন। তখন বাগদাদের দারুল হিকমাহ ছিল মুসলিম জ্ঞানপিপাসুদের তীর্থস্থান। তিনি সেখানে বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান আহরণ করে আবার কর্ডোবায় ফিরে আসেন। আব্বাস ইবনে ফিরনাস ছিলেন একাধারে একজন উদ্ভাবক, প্রকৌশলী, বিমানচালক, চিকিৎসক এবং আরবি কবি।

আরমেন ফিরমান নামের একজনের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন ইবনে ফিরনাসজানা যায়, ইবনে ফিরনাস ৮৫২খ্রিস্টাব্দে আরমেন ফিরমান নামের একজনের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। স্টান্ট করে জীবিকা নির্বাহ করতেন ঐ ব্যক্তি। তিনি কোনো বিজ্ঞানী ছিলেন না কিন্তু তার চারপাশের প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে এবং উড্ডয়নের মেকানিক্সের প্রাথমিক ধারণার ভিত্তিতে তিনি কাঠের চাঙ্গা রড দিয়ে সিল্কের একটি স্যুট তৈরি করেছিলেন। তার অপরিশোধিত মেশিনটি নিয়ে, আরমেন ফিরমান কুরতুবার গ্র্যান্ড মসজিদের একটি মিনারের শীর্ষে আরোহণ করেন এবং লাফ দেন। তিনি উড়ে যাননি, পড়ে গিয়েছিলেন কিন্তু সৌভাগ্যবশত তার ফ্লাইং কনট্রাপশনটি তার অবতরণকে ধীর করার জন্য যথেষ্ট স্ফীত হয়েছিল, তাই সে পুরো গতিতে নিচে পড়েনি। মাটিতে পড়ে অল্প আঘাত পেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি মৃত বা পঙ্গু হননি। এটি সম্ভবত বিশ্বের প্রথম প্যারাসুট জাম্প ছিল।

আরমেন ফিরমানকে এভাবে জাম্প করতে দেখে উপস্থিত দর্শকেরা মুগ্ধ হয়েছিলেন। যদিও প্রচেষ্টাটি অশোধিত এবং খুব বৈজ্ঞানিক ছিল না। মানুষের উড্ডয়নের পথে চিন্তার আলো ফেলতে সক্ষম হয়েছিল। ৮৭৫ সালে, আরমেন ফিরমানের প্রায় ২৩ বছর পরে, ৭০ বছর বয়সী ইবনে ফিরনাস তার অন্যান্য গবেষণার মধ্যে আকাশে উড়ার কৌশল আবিষ্কারে করেছিলেন।

দীর্ঘ গবেষণার পর ইবনে ফিরনাস সিল্ক এবং কাঠ থেকে এক জোড়া ডানা তৈরি করেছিলেন

দীর্ঘ গবেষণার পর ইবনে ফিরনাস সিল্ক এবং কাঠ থেকে এক জোড়া ডানা তৈরি করেছিলেন। জাবাল আল-আরুস পাহাড় থেকে তিনি অন্য একটি পাহাড়ে উড়ে গিয়েছিলেন। ফিরনাসের উড়ার দৃশ্য অনেকে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন উপস্থিত দর্শকেরা।  ফিরনাম উড়ে ছিলেন প্রায় ১০মিনিট। কিন্তু তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে তার উড্ডয়ন যন্ত্রের ডিজাইনে সমস্যা রয়েছে। তিনি তার সমস্ত শক্তি টেক অফের মেকানিক্স অধ্যয়নে নিবদ্ধ করেছিলেন কিন্তু অবতরণের মেকানিক্সকে অবহেলা করেছিলেন। যখন তিনি পৃথিবীতে ফিরে আসতে চেষ্টা করেন,  যন্ত্রটির গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলেন না। ফলে তিনি খুব দ্রুত গতিতেই মাটিতে নামতে বাধ্য হয়েছিলেন। অবতরনের সময় গতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার কারণে গুরুতর আহত হয়েছিলেন ফিরনাস।

অবতরনের সময় গতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার কারণে গুরুতর আহত হয়েছিলেন ফিরনাস।

এর পর ফিরনাস আরো ১২বছর ধরে গবেষণা চালিয়েছেন নির্ভুলভাবে উড়ার কৌশল আবিষ্কার জন্য। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, একটি পাখি তার গতি কমানোর জন্য তার লেজ এবং ডানা একত্রে ব্যবহার করে।  সমতল স্পর্শ করার আগে মাটির ঠিক উপরে থেমে যায়। ইবনে ফিরনাস বুঝতে পারলেন যে তিনি লেজের নকশা করতে ভুলে গেছেন!

এই বিজ্ঞানীর সম্মানে একটি চাঁদের গর্তের নামকরণ করে `ইবন ফিরনাস`১৯৭৬ সালে, আব্বাস ইবনে ফিরনাসের কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ, প্ল্যানেটারি সিস্টেম নামকরণের জন্য ওয়ার্কিং গ্রুপ (IAU/WGPSN) তার সম্মানে একটি চাঁদের গর্তের নামকরণ করে 'ইবন ফিরনাস'। মুসলিম দেশগুলোতে এই বিখ্যাত বিজ্ঞানী ও দার্শনিকের নামে বিমানবন্দর, সেতু, পর্বতের চূড়া, পার্ক, সড়ক ও বিজ্ঞানবিষয়ক প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়েছে। ইরাকের বাগদাদ এয়ারপোর্টের কাছে রয়েছে তার একটি সুদৃশ্য ও বিশাল ভাস্কর্য। স্পেনের কর্ডোভায় গুয়াদেলকুইভার নদীর ওপর ব্রিজটির নামকরণ করা হয়েছে এই দার্শনিকের নামে। ৮৮০ থেকে ৮৯০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে আব্বাস ইবনে ফিরনাস ইন্তেকাল করেন।

অনেক ইতিহাসবিদ বলেন, ক্রাশ ল্যান্ডিংয়ের সেই আঘাতের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে ইবনে ফিরনাসের।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!