ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ সাতরং ]

মস্তিষ্ক সংগ্রহই তাদের নেশা, ৩৭ বছরে হাতি‌য়ে নেন ১০ হাজার মগজ

সাতরং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৫:২০, ১৮ নভেম্বর ২০২২
মস্তিষ্ক সংগ্রহই তাদের নেশা, ৩৭ বছরে হাতি‌য়ে নেন ১০ হাজার মগজ
ফাইল ছবি

৩৭ বছর সময় ধরে প্রায় ১০ হাজার মানসিক রোগীর দেহ থেকে মস্তিষ্ক হাতিয়ে নিয়েছেন ডেনমার্কের চিকিৎসকেরা। এমনকি, এ বিষয়ে ঐ রোগীদের পরিবারের অনুমতি পর্যন্ত নেয়া হয়নি। এমনই দাবি করল আমেরিকার সংবাদমাধ্যম সিএনএন।

ডেনমার্কের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে মস্তিষ্কগুলো উদ্ধার করা হয়েছে। ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গোপন গুদামে সেগুলো বাক্সবন্দি করা রাখা ছিল বলে দাবি। ওয়ার্ল্ড’স আনটোল্ড স্টোরিজ: দ্য ব্রেন কালেক্টরস নামে ঐ তথ্যচিত্রটি সিএনএন-এ দেখানো হয়েছে ১২-১৩ নভেম্বর। যার বিষয়বস্তু প্রকাশ্যে আসতেই হইচই পড়ে গিয়েছে। দীর্ঘ দিন ধরেই মস্তিষ্ক সংগ্রহের বিষয়টি নিয়ে কানাঘুষো চলছিল। তবে তা নিয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। তথ্যচিত্রে পুরো বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

প্রায় ১০ হাজার মানসিক রোগীর দেহ থেকে মস্তিষ্ক হাতিয়ে নিয়েছেন ডেনমার্কের চিকিৎসকেরাসংবাদমাধ্যমের দাবি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ৩৭ বছর ধরে গোপনে এ হেন সংগ্রহে লিপ্ত ছিলেন ড্যানিশ চিকিৎসকেরা। মূলত স্কিৎজোফ্রেনিয়া, মানসিক অবসাদে ভোগা রোগীদের হাসপাতালে মৃত্যুর পর সেখান থেকে তাদের মস্তিষ্ক সরানো হতো বলে দাবি। ডেনমার্কের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ধার হয়েছে কার্স্টেন আবিলট্রাপ নামে এক কমবয়সি রোগীর মস্তিষ্কও। 

Advertisement

কার্স্টেনের জন্ম হয়েছিল ১৯২৭ সালে। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে স্কিৎজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। চিকিৎসার জন্য কার্স্টেনকে নেদারল্যান্ডসের একটি নবনির্মিত মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল। অভিযোগ, মানসিক হাসপাতালে ভর্তির পরে তার মৃত্যু হলে কার্স্টেনের মস্তিষ্ক বিনা অনুমতিতে সরানো হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে মানসিক রোগ বা সমস্যা নিয়ে বিশেষ ওয়াকিবহাল ছিল না চিকিৎসক মহল। অভিযোগ, সে সময় এরিক স্টর্মগ্রেন এবং লারুস আইনারসন নামে দুইজন তরুণ চিকিৎসক মানসিক রোগীদের মস্তিষ্ক হাতানোর ছক কষেছিলেন। ময়নাতদন্তের সময় তাদের মস্তিষ্ক সরিয়ে নিতেন তারা। এরপর তা গোপন জায়গায় জমা করে রাখতেন। যদিও কী উদ্দেশ্যে দুই চিকিৎসক এমন করতেন, তা জানা যায়নি।

কার্স্টেনকে নেদারল্যান্ডসের একটি নবনির্মিত মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল। অভিযোগ, মানসিক হাসপাতালে ভর্তির পরে তার মৃত্যু হলে কার্স্টেনের মস্তিষ্ক বিনা অনুমতিতে সরানো হয়ডেনমার্কের আর্থাস ইউনিভার্সিটির মেডিক্যাল সায়েন্সের ইতিহাসবিদ তথা পরামর্শদাতা টমাস আর্স্লেভ মনে করেন, ১৯৪৫ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত সে দেশে যতো মানসিক রোগী হাসপাতালে মারা গিয়েছেন, তাদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকের মস্তিষ্ক হাতিয়ে নেয়া হয়েছিল। এবং পুরো বিষয়টি অন্ধকারে রাখা হয়েছিল ঐ রোগীদের পরিবারের সদস্যদের থেকে।

সিএনএন-এর দাবি, ডেনমার্কের ইনস্টিটিউট অফ ব্রেন প্যাথোলজিতে এই কাণ্ডকারখানা চলত। ঐ ইনস্টিটিউটটি আর্থাস শহরের রিসকভ সাইকিয়াট্রিক হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত ছিল। প্রায় পাঁচ বছর ধরে দুই চিকিৎসক এই ‘কুকীর্তি’ চালিয়ে যাওয়ার পর নাড এ লোরেনৎজেন নামে এক প্যাথোলজিস্ট ঐ ইনস্টিউটের দায়িত্ব নেন। এর পরের ৩ দশক ধরে ঐ চিকিৎসকদের অসমাপ্ত কাজ চালিয়ে যান নাড।

সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, দীর্ঘ ৩৭ বছর ধরে নয় হাজার ৪৭৬টি মস্তিষ্ক গোপনে সংগ্রহ করা হয়েছিল। বিশ্বের কোথাও নাকি মস্তিষ্কের এতো বড় সংগ্রহ নেই। এই কাজের জন্য অর্থসাহায্যও পেতেন চিকিৎসকেরা। তবে তাতে ড্যানিশ প্রশাসন জড়িত কিনা, তা জানা যায়নি।

২০১৮ সালে অর্থাভাবে ঐ সংগ্রহটি অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে দাবি। সে সময় ঐ ইনস্টিটিউটের প্যাথোলজিস্ট মার্টিন ডব্লিউ নিয়েলসন পুরো ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমের দাবি। অনেকের কাছেই মার্টিনের পরিচিতি হয়ে যায় ব্রেন কালেক্টর নামে।

মস্তিষ্কগুলো অন্যত্র সরানোর সময় একটি নতুন পাত্রে সেগুলো ফর্মালডিহাইডে চুবিয়ে নিয়ে যাওয়া হতো, যাতে তা অক্ষত থাকে। প্রতিটি পাত্রে গায়ে কালো কালিতে একটি নম্বর লিখে রাখা হত, যাতে ঐ মস্তিষ্কগুলোর কার, তা বোঝা যায়। এ ভাবেই ঐ মস্তিষ্কগুলো কোন কোন রোগীর, তা জানা গিয়েছে। যদিও ১ নম্বর মস্তিষ্কটি কার, সে সম্পর্কে এখনও অন্ধকারে চিকিৎসক মহল। ইনস্টিটিউট থেকে দক্ষিণ ডেনমার্কের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঐ মস্তিষ্কগুলো নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। যদিও ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম প্রকাশ্যে আনেনি আমেরিকার সংবাদমাধ্যমটি।

মস্তিষ্কগুলো অন্যত্র সরানোর সময় একটি নতুন পাত্রে সেগুলো ফর্মালডিহাইডে চুবিয়ে নিয়ে যাওয়া হতো, যাতে তা অক্ষত থাকেসিএনএন জানিয়েছে, ডেনমার্কের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১০ হাজার পাত্র উদ্ধার করা হয়েছে, যাতে অন্তত সাড়ে পাঁচ হাজার ডিমেনশিয়া রোগীর মস্তিষ্ক ছিল। এ ছাড়া বাকিগুলোর মধ্যে বাই-পোলার রোগীর ৪০০টি এবং অবসাদে ভোগা ৩০০ জনের মস্তিষ্কও মিলেছে। মস্তিষ্ক সংগ্রহের কাণ্ডকারখানা প্রকাশ্যে আসা মাত্রই বিশ্ব জুড়ে বিতর্কও শুরু হয়েছে। এ হেন কর্মকাণ্ডের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। অনেকের দাবি, ঐ মস্তিষ্কগুলো রোগীর পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হোক। এমনকি মৃতদের পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবিও তুলেছেন অনেকে। যদিও এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

ডেনিশ অ্যাসোসিয়েশন ফর মেন্টাল হেল্‌থ-এর ডিরেক্টর নাড কার্স্টেনসেন বলেন, এই বিপুল সংখ্যক মস্তিষ্ক নিয়ে কী করা হবে, সে বিষয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। অনেকের দাবি, মস্তিষ্কগুলো হয় কবর দেওয়া হোক বা অন্য কোনো নৈতিক উপায়ে এই সংগ্রহকে নষ্ট করে দেওয়া হোক।

কার্স্টেনসেন আরো বলেন, অনেকের দাবি, এরই মধ্যে বহু রোগীর ক্ষতি করা হয়ে গিয়েছে। ঐ মস্তিষ্কগুলো যাতে গবেষণার কাজে লাগানো যেতে পারে, এবার অন্তত তা দেখা উচিত!

সূত্র: আনন্দবাজার 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!