খুন্তির ছ্যাঁকা-গায়ে গরম পানি ঢেলে গৃহকর্মীকে নির্যাতন, স্বামী-স্ত্রী গ্রেফতার
ময়মনসিংহে চার বছর ধরে এক শিশু গৃহকর্মীর নৃশংস নির্যাতন চালাচ্ছিল এক দম্পতি। গত ছয় মাস ধরে নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়। পরিবারের সঙ্গে শিশুটিকে দেখা করতেও দিচ্ছিলেন না গৃহকর্তা। শনিবার বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর ওই গৃহকর্তা ও তার স্ত্রীকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে স্থানীয়রা।
জানা গেছে, জেলার নান্দাইল উপজেলার রাজাবাড়িয়া গ্রামের দরিদ্র প্রতিবন্ধী মজিবুর রহমানের মেয়ে নিশি আক্তারকে চার বছর আগে গৃহকর্মীর কাজে পাঠান বাবা। ঢাকার ধানমন্ডি এলাকায় বসবাস করা অগ্রণী ব্যাংকের কর্মকর্তা মিজানুর রহমানের বাসায় দেয়া হয় কাজে। মিজানের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জে।
নিশি ও তার বাবা মজিবুর রহমান জানান, নিশিকে কাজে দেয়ার পর থেকেই নানা অজুহাতে চলত নির্যাতন। খাবার বেশি খাওয়া, লুকিয়ে খাবার খাওয়া, ঠিকমতো কাজ না করা, ঘুম থেকে দেরি করে ওঠাসহ নানা কারণ দেখিয়ে গৃহকর্ত্রী মুন্নী তার ওপর নির্যাতন চালাতেন। গরম খুন্তির ছ্যাঁকার সঙ্গে লাঠিপেটাও বাদ যেত না। শেষে শরীরজুড়ে ঢেলে দেয়া হতো গরম পানি। চার বছর ধরে কাজ করলেও মেয়েটিকে তার পরিবারের লোকজনের সঙ্গে দেখা করতে দেয়া হতো না বললেই চলে। ছয় মাস ধরে কোনোভাবেই বাবার সঙ্গে দেখা করতে দেয়া হতো না নিশিকে। মোবাইল ফোনে কথা বলিয়ে দিলেও গৃহকর্ত্রী নানা ভয় দেখিয়ে নিজের ওপর চলা নির্যাতনের কথা বলতে মানা করে দেন শিশুটিকে। অন্যথায় নির্যাতন আরো বাড়িয়ে দেন।
.png)
গৃহকর্ত্রীর নির্যাতনে শিশুটির শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। ঝলসে দেয়া হয়েছে শরীরের বিভিন্ন অংশ। ছয় মাস ধরে মেয়েকে দেখতে না পেয়ে নিশির বাবা অনেক অনুনয়-বিনয় করে মেয়েকে দেখার জন্য সুযোগ চান। কিন্তু গৃহকর্তা জানান, ময়মনসিংহ পাটগুদাম সেতু এলাকায় মেয়েকে দিয়ে যাবে। সেখানে শনিবার সন্ধ্যায় থাকার জন্য। শনিবার রাত ৮টার দিকে গৃহকর্মী নিশিকে নিয়ে বাবা-মায়ের হাতে দেয়ার পর পরিবারের লোকজন শিশুটির শরীরজুড়ে নির্যাতনের চিহ্ন দেখে চিৎকার করে কান্না শুরু করেন। ওই সময় গৃহকর্তা ও গৃহকর্ত্রী পালানোর চেষ্টা করলে স্থানীয় লোকজন তাদের আটক করে ফেলে। পরে কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশকে খবর দিয়ে পুলিশের কাছে তাদের হস্তান্তর করা হয়।
নিশিকে নির্যাতনের ঘটনায় তার বাবা বাদী হয়ে শনিবার রাতেই থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। গৃহকর্তা ও গৃহকর্ত্রীকে আসামি করে দায়ের করা অভিযোগটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে বলে জানায় পুলিশ।
নৃশংস নির্যাতনে শিশুটি প্রায় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। শিশুটি জানায়, কাজে একটু ভুল করলেই তাকে প্রচুর মারধর করা হতো। জোরে কান্না করলে আরো বেশি মারত। শিশুটির বাবা বলেন, অভাবের তাড়নায় মেয়েকে কাজে দিয়েছিলাম, এভাবে মেয়েকে মেরে ফেলতে নয়। মেয়ের ওপর নির্যাতনের কঠোর বিচার চান তিনি।
ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি ফিরোজ তালুকদার বলেন, নানা অজুহাতে শিশুটির ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হতো। শিশুটির শরীরজুড়ে নির্যাতনের চিহ্ন রয়েছে। শিশুটিকে ফেলে পালানোর সময় গৃহকর্তা ও গৃহকর্ত্রীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
ওসি বলেন, গ্রেফতারদের রোববার আদালতে পাঠিয়ে রিমান্ডের আবেদন জানাবে পুলিশ। এছাড়াও জবানবন্দি গ্রহণের জন্য শিশুটিকেও আদালতে পাঠানো হবে।