অপহরণের পর হত্যা, আটক হয়নি কেউ
সিরাজগঞ্জের যুবক মিঠু হোসেনকে (২৪) শাড়ি বিক্রির কথা বলে নরসিংদী এনে অপহরণের পর হত্যার ঘটনায় তিনদিনেও কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ।
মনোহরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আনিচুর রহমান শনিবার বিকেলে বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকে এখনো আটক করা যায়নি।
নিহত মিঠু সিরাজগঞ্জ সদরের রায়পুর রেলওয়ে কলোনি এলাকার মুসলিম উদ্দিনের ছেলে। তিনি সিরাজগঞ্জের ইসলামিয়া সরকারি কলেজের স্নাতক প্রথম বর্ষে পড়াশোনার পাশাপাশি অনলাইনে শাড়ির ব্যবসা করতেন। বাবুরহাটের শাড়ি সম্পর্কে ধারণা নিতে প্রথমবারের মতো নরসিংদী এসেছিলেন। ফেসবুকে পরিচয় হওয়া দুই বন্ধুর ভরসায় নরসিংদীতে আসার পর অপহরণের পর হত্যার শিকার হন তিনি।
.png)
গত বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে মনোহরদী উপজেলার একদুয়ারিয়া ইউনিয়নের হুগোলিয়াপাড়া এলাকার রূপচান মিয়ার খড়ের পালার পাশে অজ্ঞাত ওই যুবকের রক্তাক্ত মরদেহ দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেয় স্থানীয়রা। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল শেষে ময়নাতদন্তের জন্য নরসিংদী সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছে।
নিহতের গলাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
এ ঘটনায় মিঠু হোসেনের বড় বোন মিনু আক্তার বাদী হয়ে মনোহরদী থানায় অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন।
মিনু আক্তার জানান, তার বাবা ছয় মাস আগে মারা গেছেন। মা–ও দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারে আক্রান্ত। বাবার মৃত্যুর পর থেকে পড়াশোনার পাশাপাশি অনলাইনে শাড়ির ব্যবসা করে সংসার চালাতেন মিঠু। স্থানীয় বিভিন্ন হাট থেকে শাড়ি সংগ্রহ করে অনলাইনে বিক্রি করলেও নরসিংদীর বাবুরহাটের কাপড় বিক্রির ইচ্ছা ছিল তাঁর। এই জন্য গত বুধবার সকালে সিরাজগঞ্জ থেকে নরসিংদীর উদ্দেশে রওনা হন। ঢাকায় পৌঁছার পর সে এক আত্মীয়ের বাড়িতে দুপুরের খাবার খান। পরে সন্ধ্যা ৬টার দিকে নরসিংদী পৌঁছে আমাদের কাছে কল করে ঠিকঠাক পৌঁছানোর খবর জানান। তবে নরসিংদীতে ঠিক কাদের কাছে সে গিয়েছিল, তা আমরা জানতাম না।
বাদী মিনু আক্তার জানান, বুধবার রাত ৮ টার দিকে মিঠু ফোন দিয়ে জানান, কয়েকজন লোক তাকে অপহরণ করেছে এবং এক লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করছে। অপহরণকারীরা মিঠুকে মারধর করে তাদের দেওয়া মোবাইল ব্যাংকিং নাম্বারে দ্রুত টাকা পাঠাতে বলে। নইলে তারা মিঠুকে মেরে ফেলবে বলে হুমকি দেয়। তখন অপহরণকারীদের একজন ফোনটা ধরে বলেন, ‘আপনারা এই মুহূর্তে যদি এক লাখ টাকা পাঠান, তাহলে আপনার ভাইকে আমরা ছেড়ে দেব।’ মিনু আক্তার তাকে বলেন, ‘এখন তো রাত প্রায় ৮টা বাজে, এই সময় তো কারো কাছে টাকা চেয়ে পাব না, একটু সময় দিন, আমি টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা করছি।’ রাত ১২টা পর্যন্ত অন্তত ৫০ বার মিঠুর ফোনেই অপহরণকারীদের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। ফোনে কথা বলার পুরোটা সময় মারধর ও মিঠুর কান্নার শব্দ শুনেছি। এরপরই সিরাজগঞ্জ সদর থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়।
তিনি আরো জানান, ওই দিনই রাত ১১ টার দিকে মিঠু ফোন করে মাকে জানায়, ‘তোমরা তো টাকা দিতে পারলে না। অপহরণকারীরা মনে হয় আমাকে মেরে ফেলবে। কোন ভুল করে থাকলে ক্ষমা করে দিও।’ এ সময় অজ্ঞাত ব্যক্তি তার হাত থেকে মুঠোফোন নিয়ে আমাকে বলে ‘যেহেতু টাকা দিতে পারছনি তাই তোর ভাইকে বাঁচিয়ে রাখতে পারছি না। আগামীকাল তোর ভাইয়ের লাশ খোঁজে নিস।' একথা বলে মুঠোফোন বন্ধ করে দেয় অপহরণকারীরা। পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে মিঠুর খোঁজে মা এবং নানিকে নিয়ে নরসিংদীর উদ্দেশ্যে রওনা হই। সকাল ১০ টার দিকে অজ্ঞাত ব্যক্তি মিঠুর মুঠোফোন থেকে আবারো কল দিয়ে পুনরায় মুক্তিপণ দাবি করে। এসময় তিনি মিঠুর সঙ্গে কথা বলতে চাইলে অপহরণকারী বলেন, 'আগে টাকা দেন তারপর ভাইয়ের সাথে কথা বলেন।' একথা বলে আবারো মোবাইল বন্ধ করে দেওয়া হয়। রাত ৮টার দিকে সিরাজগঞ্জের পরিচিত এক সাংবাদিকের মাধ্যমে জানতে পারি মনোহরদী উপজেলায় অজ্ঞাত যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ খবর পেয়ে রাত ১২ টায় মনোহরদী থানায় উপস্থিত হয়ে পুলিশের মুঠোফোনে ছবি দেখে মিঠুর লাশ শনাক্ত করি।
মনোহরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আনিচুর রহমান বলেন, পুলিশের একাধিক টিম হত্যাকারীদের শনাক্তের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।