ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

স্বপ্নের দেশ ইতালি যাওয়ার পথে দুই বন্ধুর মৃত্যু, প্রাণে বেঁচে ফেরা সামিউল দিলেন রোমহর্ষক বর্ণনা

ফরিদপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৬:৩৯, ১৬ মার্চ ২০২২
স্বপ্নের দেশ ইতালি যাওয়ার পথে দুই বন্ধুর মৃত্যু, প্রাণে বেঁচে ফেরা সামিউল দিলেন রোমহর্ষক বর্ণনা
ফয়সাল মাতুব্বর, নাজমুল মিয়া ও সামিউল শেখ- ফাইল ছবি

ফরিদপুরের নগরকান্দায় দালালের খপ্পরে পড়ে স্বপ্নের দেশ ইতালি যাওয়ার পথে তিন বন্ধুর মধ্যে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। সেই ঘটনার রোমহর্ষক বর্ণনা দিলেন বেঁচে ফেরা তৃতীয় বন্ধু সামিউল শেখ। ৩৭ জনের মধ্যে তিনিসহ মাত্র ছয়জন সেদিন বেঁচে ফিরেছেন।

সামিউল শেখ নগরকান্দা উপজেলার কাইচাইল গ্রামের ইউনুস শেখের ছেলে। নৌকাডুবিতে মারা যাওয়া দুই বন্ধু হলেন- একই গ্রামের ফারুক মাতুব্বরের ছেলে ফয়সাল মাতুব্বর ও মাজেদ মিয়ার ছেলে নাজমুল মিয়া।

সামিউল জানান, তিন বন্ধু ইতালি যাওয়ার জন্য ৩০ লাখ টাকায় পাশের গ্রামের দুই প্রবাসী দালালের সঙ্গে চুক্তি করেন। তাদের হাতে তুলেও দেন ২৪ লাখ টাকা। লিবিয়ায় নিয়ে একটি ঘরে বন্দি করে রাখা হয় তিন বন্ধুকেই। পরে নৌকায় সাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার পথে মৃত্যু হয় ফয়সাল ও নাজমুলের। সামিউল একাই প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন।

Advertisement

রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে সামিউল শেখ বলেন, গত বছরের ১৪ নভেম্বর আমরা তিন বন্ধু ইতালি যেতে প্রথমে ঢাকায় যাই। ঢাকার কাকরাইলে আল-হেলাল বোর্ডিংয়ে তিনদিন থাকি। সেখান থেকে ১৭ নভেম্বর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দুবাই যাই। সেখানে দালাল শওকতের ভাই জুয়েল মাতুব্বরের কাছে পৌঁছাই ১৮ নভেম্বর। ১ ডিসেম্বর লিবিয়ায় পৌঁছাই।

তিনি আরো বলেন, ২৭ জানুয়ারি লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে যেতে স্পিডবোটে রওনা দেই। এরপর আমাদের জাহাজে তোলার জন্য লিবিয়ার জোয়ারা ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন আমাদের সঙ্গে ছিলেন অলিদ নামে এক দালাল। ঘাটে নিয়ে আমাদের জাহাজের পরিবর্তে অস্ত্রের মুখে ২০ জন ধারণক্ষমতার একটি স্পিডবোটে তোলা হয়। স্পিডবোটে দুইজন চালকসহ ৩৭ জনকে তোলা হয়।

সামিউল বলেন, প্রায় আট ঘণ্টা চলার পর হঠাৎ ঝোড়ো বাতাসে স্পিডবোটটি উল্টে যায়। সাগরের ঢেউয়ের সঙ্গে আমার বন্ধু ফয়সাল মাতুব্বরসহ ২৯ জন ভেসে যায়। বাকি আটজনের মধ্যে আমি ও আরেক বন্ধু নাজমুল স্পিডবোটের একপাশ ধরে থাকি। প্রায় ঘণ্টা দুয়েক পর নাজমুল ঢেউয়ের তোড়ে ডুবে যায়। এরপর আমরা সাতজন বোটের অন্য পাশে ভাসতে ভাসতে তিউনিসিয়া সীমান্তে চলে যাই। তখন আমাদের শরীরে কোনো কাপড় ছিল না।

তিনি বলেন, আমরা প্রায় ১১ ঘণ্টা ভাসতে থাকি। এরপর কিছু দূরে একটি জাহাজ দেখে আমাদের মধ্যে ফারুক নামের একজন একটি লাল গেঞ্জি উঁচু করে ধরেন। জাহাজটির লোকেরা আমাদের দেখতে পেয়ে তিউনিসিয়া সীমান্ত থেকে উদ্ধার করেন। জাহাজে ওঠার পর রাশেদুল নামে আরেকজন মারা যান। ৩৭ জনের মধ্যে আমরা মাত্র মাত্র ৬ জন বেঁচে ফিরি।

সামিউল শেখ বলেন, ২৮ জানুয়ারি সন্ধ্যায় আমাদের ছয়জনকে লিবিয়ার জাউইয়া জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিনদিন থাকি। পরে খামছাখামছিন জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বন্দী থাকতে হয় ১ মাস ২৮ দিন। জেলে সকাল এগারোটার দিকে ১০০ গ্রামের একটা রুটি এবং রাত এগারোটায় আরেকটি রুটি দেওয়া হতো। ওখানে রুটি নাম খুবজু। খুবজুর সঙ্গে প্রতিদিন দুই বেলা পানির বোতলের ছিপি মেপে ২-৩ ছিপি পরিমাণ পানি দেওয়া হতো।

গত ১৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ দূতাবাস ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) থেকে যোগাযোগ করা হয়। আইওএম আমাদের দেশে ফিরে আসার ব্যবস্থা করে এবং ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে আসার পর বাড়িতে যাওয়ার জন্য প্রত্যেককে ৪ হাজার ৭৮০ টাকা দেয়। আমরা ২ মার্চ ঢাকায় ফিরে আসি। এক সপ্তাহ বিমানবন্দরের পাশে হজ ক্যাম্পে কোয়ারেন্টাইনে থাকার পর ১০ মার্চ বাড়িতে ফিরে আসি।

ডেইলি-বাংলাদেশ/ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!