সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ শিকার, হুমকির মুখে মৎস্য ও জলজ প্রাণী
সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ শিকার করার কারণে নদী ও খালগুলো দিন দিন মাছ শূন্য হয়ে যাচ্ছে। মাছের সঙ্গে মরছে অন্যান্য জলজ প্রাণীও। হুমকির মুখে পড়েছে বনাঞ্চলে মৎস্য সম্পদের প্রজনন ও উৎপাদন। প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের সহযোগিতায় জেলেরা বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার করায় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। আর আমরা খাচ্ছি বিষাক্ত খাবার অনুপযোগী মাছ। এতে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার পাশাপাশি বাড়ছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে শুক্রবার র্যাব-৬ (সদর কোম্পানি) অভিযান চালিয়ে সুন্দরবন থেকে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার চক্রের মূল হোতাসহ ১২ জনকে গ্রেফতার করেছে। এ সময় তাদের কাছ থেকে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার কাজে ব্যবহৃত মাছ মামার বিষ ১০ বোতল, জাল ৪টি, ইঞ্জিন বিহীন কাঠের নৌকা ৪টি, বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে শিকার করা মাছ ৪০০ কেজি এবং ৫টি টর্চ লাইট উদ্ধার করা হয়। অভিযানে নেতৃত্বে ছিলেন র্যাব-৬ এর এসপি মাহফুজ রহমান।
র্যাবের অধিনায়ক লে. কর্নেল মুহাম্মদ মোসতাক আহমদ প্রেস বিফ্রিংয়ে বলেন, সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ ধরায় শুধু এক প্রকারের মাছের ক্ষতি হচ্ছে না, অন্য সব প্রজাতির মাছই ধ্বংস হচ্ছে, পাশাপাশি এর সঙ্গে বন ও পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। বিষ দিয়ে মাছ শিকারের প্রবণতা শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসতে কঠোর অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। একই সঙ্গে জেলেদের যেসব মহাজন অধিক লাভের আশায় বিষ দিয়ে বনের খালে পাঠাচ্ছে ওই সব প্রভাবশালী সিন্ডিকেটদের চিহ্নিত করে ধরা হবে বলে জানান এ কর্মকর্তা।

এ সময় উল্লেখ করা হয়, বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার জাপসি এলাকায় অভিযান চালিয়ে সুন্দরবনে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার চক্রদের গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতরা হলেন বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার চক্রের মূলহোতা মো. সাদ্দাম বৈদ্য, মো. শফিকুল ইসলাম বৈদ্য, মো. জাকির হোসেন, মো. খায়রুল মোড়ল, আবদুস সালাম গাজী, মো. বাচ্চু সানা, মো. আবু সাইদ সরদার, মো. নাজমুল সরদার, মো. আবুল হোসেন গাজী, শাহজাহান শেখ, মো. সালাম সানা ও ইকরামুল সরদার। তাদের বাড়ি খুলনার দাকোপ কালাবগী ও রূপসার ঘাটভোগ এলাকায়।
বাগেরহাট মোংলা উপজেলার জাপসি নদীর গোলের খালের মুখে র্যাবের অভিযানের সময় দেখা যায়, খালের পানিতে অসংখ্য মাছ মরে ভেসে আছে এবং কয়েকটি নৌকায় করে ভেসে থাকা মাছ গুলো তোলা হচ্ছে। এসময় র্যাব সদস্যরা ওই নৌকার কাছে যেতেই তারা পালাবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। পরে তাদের নৌকাসহ গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে মাছ শিকারের কাজে ব্যবহৃত মালামাল উদ্ধার করেন।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, বিষাক্ত পানির মাছ খেলে মানুষের পেটের পীড়াসহ কিডনি ও লিভারে জটিলতা দেখা দেয়। এতে স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি স্বরপ। বিষ মিশ্রিত মাছ না খাওয়ার জন্য জনসাধারণকে সজাগ থাকতে পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জয়দেব পাল বলেন, বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদে বড় অংশ জুড়ে রয়েছে জলাভূমি। জালের মতো ছড়িয়ে রয়েছে ৪৫০ নদ-নদী। আর এই নদ-নদীতে রয়েছে ৪৭৫ টি বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার মাছ বিষপ্রয়োগে মারা হচ্ছে। এতে শত শত মাছের প্রজাতি ধ্বংসের পাশাপাশি মৎস্য প্রজনন চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এ ছাড়া বিষ প্রয়োগকৃত পানি পান করে বাঘ, হরিণসহ বনের নানা প্রাণিও বিভিন্নভাবে রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েছে। আমাদের সুন্দরবনে সরাসরি অভিযানের অনুমতি না থাকায় নিজেরা অভিযানে যেতে পারছি না।

তিনি বলেন, সুন্দরবনের অভ্যন্তরে বিষ দিয়ে মাছ শিকার বন্ধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি এর ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। তিনি বিষ দিয়ে মাছ শিকার বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ স্থানীয় জনগণকে আরো সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান।
সুন্দরবন সংলগ্ন স্থানীয়রা জানান, সুন্দরবনের ঢাংমারী, মরাপশুর, জোংড়া, ঝাপসি, ভদ্রা, নীল কমল, হরিণ টানা, কোকিলমুনী, হারবাড়িয়াসহ আশপাশ এলাকায় বন সংলগ্ন স্থানীয় অসাধু কিছু জেলে নামধারী মৎস্য দস্যু বিষ দিয়ে মাছ ধরছে। বেশি মুনাফার আশায় সুন্দরবনের বিভিন্ন নিষিদ্ধ খালেও বিষ দিয়ে মাছ শিকার করা হয়। বিষাক্ত পানি সুন্দরবনের বিভিন্ন খাল থেকে ভাটার সময় নদীতে নেমে আসে। এ কারণে মাছ মরে যাওয়ায় এখন নদীতে আর ছোটো-বড়ো মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। বিষ প্রয়োগের ফলে জীববৈচিত্র্যসহ পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার পরও সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ শিকারের ধ্বংসযজ্ঞ থেমে নেই। বেশি মুনাফার আশায় সুন্দরবনের বিভিন্ন নিষিদ্ধ খালেও তারা বিষ দিয়ে মাছ শিকার করেন জেলেরা।